ঝিনাইদহে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
২০১৯ সালে ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পৌরসভা। দীর্ঘদিন অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকলেও ভাস্কর্যটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে চত্বরটি হলেও গত কয়েকদিন ধরে ভাস্কর্যটি ভাঙা হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসন বা পৌরসভা ভাস্কর্যটি ভাঙার বিষয়ে কিছুই বলতে পারছেন না। ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
তবে একটি সূত্র জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভা এই ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের সংযোগস্থলে সড়কের মাঝখানে এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নামে এটির নামকরণ করা হয়। সেখানে বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য বা শৈল্পিক অবয়ব দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
সরেজমিনে শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা ভাস্কর্যের চত্বরটি ভেঙে ফেলছেন। ভাঙার বিষয়ে শ্রমিকদের কাছে জানতে চাইলে তারা পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাশেদ আলী খান খবরের কাগজকে বলেন, ভাস্কর্যটি কেন ভাঙা হচ্ছে তা আমি জানিনা। জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ ও তৎকালীন পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু এটি উদ্বোধন করেন। ভাস্কর্য নির্মাণ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৩২ লাখ টাকা। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু করা হলেও পরে কি হয়েছে তা আমার জানা নেই। বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মাণের সেই ফাইলটি পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ খুঁজে পাচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, জেলা প্রশাসন এই ভাস্কর্য ভাঙার কাজ করছে না। আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই ভাস্কর্যটি ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে তিনি জানান।
ঝিনাইদহ পৌরসভা ও সড়ক বিভাগ সম্ভবত আগের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন কছে।
তিনি বলেন, ঝিনাইদহ পুলিশ লাইন্সের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি করার পরিকল্পনা আছে জেলা প্রশাসনের। ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে তিনি সড়ক ও জনপদ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে কারা বা কোন দপ্তর বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ও চত্বরটি অপসারণ করছে বিষয়টি আমার জানা নেই।
ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ জানান, জনদুর্ভোগ লাঘব ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চত্বরটি অপসারণ করার সিদ্ধান্ত হয়। যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হাওয়ায় সে সময় আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন হয়তো সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে জেলা প্রশাসন।
ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ বলেন, শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোন ভাস্কর্য ছিল বলে আমার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই।
সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান জানান, সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোন ভাস্কর্য ছিল না বা তৈরিও হয়নি, যদি ভাস্কর্য তৈরি হতো তবে আমরা জানতে পারতাম।
ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. এমএ মজিদ বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় একটি ভাস্কর্য ছিল। ভাস্কর্যটি আসলে কি বোঝাতে চেয়েছিল তা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দু দফায় ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করেছিল। মহাসড়কের সংযোগস্থলে সড়কের মাঝখানে হওয়ায় ভাস্কর্যটি দুর্ঘটনার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জেলা প্রশাসনের কয়েকটি সভায় ওই ভাস্কর্যটি সরানোর সিদ্ধান্ত হয়। ভাস্কর্যটি ভাঙার বিষয়ে কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলেন না। ভাস্কর্যটি ভাঙার কাজ কে বা কারা করছে তা আমার জানা নেই।
ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছে গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
ওই এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, দেশের প্রত্যেকটি জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ঝিনাইদহের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে অনেকদিন ধরে এই চত্বরটি ছিল। কদিন ধরে দেখছি এটি ভাঙা হচ্ছে। কেন যে ভেঙে ফেলা হচ্ছে তা জানি না।
ঝিনাইদহের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সারা দেশের গর্ব। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। জীবন দিয়ে হামিদুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত ওই চত্বর না ভাঙলে নতুন প্রজন্ম তার অবদান সম্পর্কে জানতে পারত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহি হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশ নেন।
মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্ত ঘাঁটি দখলের লড়াইয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি শহিদ হন।
হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ লাভ করেন। সারা দেশের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে হামিদুর রহমান একজন।
ঝিনাইদহ-২ (সদর-হরিণাকুন্ডু) আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর বলেন, আমি গত কয়েকদিন ধরে ঢাকাতে অবস্থান করছি। ভাস্কর্য ভাঙ্গার বিষয়ে আমি জানিনা।
মাহফুজুর রহমান/এসএন