বর্তমান সময়ে তরুণদের দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে রাত জেগে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার এখন একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়াশোনার চাপ ও আড্ডার কারণেও অনেকে দেরিতে ঘুমাতে যান। এর ফলে তাদের রুটিনে ঘুমের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত ঘুমাচ্ছে না। এই নিয়মিত ঘুমের অভাব তাদের মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের প্রধান নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র। সারা দিন কাজ করার পর ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়। এই সময়ে মস্তিষ্ক সারা দিনের গ্রহণ করা তথ্যগুলো সঠিকভাবে সাজিয়ে রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে তরুণদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন বিষয় শেখার বা মনে রাখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। ক্লাসে ও কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের এই অংশটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই নিয়মিত ঘুম কম হলে তরুণরা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ছোটখাটো সমস্যাতেও তারা সহজে ঘাবড়ে যান এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
ঘুমের অভাব কেবল কাজের স্বাভাবিক ক্ষমতা কমায় না। এটি তরুণদের সার্বিক মানসিক অবস্থার ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা এবং উদ্বেগ বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পায়। তারা খুব অল্পতে রেগে যান বা অকারণে বিরক্ত হন। মেজাজ সারাক্ষণ খিটখিটে হয়ে থাকার কারণে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি বড় ধরনের মানসিক অবসাদের ঝুঁকি তৈরি করে। তরুণদের সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। গঠনমূলক কাজের প্রতি তাদের স্বাভাবিক আগ্রহ কমে গিয়ে একঘেয়েমি ও বিরক্তি তৈরি হয়।
মস্তিষ্কের সুস্থতার সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাতে ঘুম কম হলে পরদিন শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি ভর করে। হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এটি তরুণদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশে বড় ধরনের বাধা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। দিনের বেলায় কাজের সময় অতিরিক্ত ঘুম ভাব তরুণদের কাজের গতি কমিয়ে দেয়। ক্লান্ত মস্তিষ্ক শরীরকে সঠিক নির্দেশ দিতে বারবার ব্যর্থ হয়। এর ফলে রাস্তায় বা কর্মস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের বুঝতে হবে যে, ঘুম কোনো সময় নষ্ট করার বিষয় নয়। এটি শরীর ও মস্তিষ্ককে পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুত করার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার একটি সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বন্ধ রাখা প্রয়োজন। ঘুমের পরিবেশ শান্ত এবং অন্ধকার রাখা হলে দ্রুত ঘুম আসে। সুষম খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তরুণরা যদি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করেন তবে তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তারা আরও বেশি উদ্যমী হয়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন। একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তরুণদের অবশ্যই ঘুমের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে।