লক্ষ্মীপুরের পাঁচ উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও বিদ্যালয়ে ৭৪৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, ৪৯১টি প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক, মনিটরিং কর্মকর্তা, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী ও ২৩৮ দপ্তরির পদ রয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৩৭টি পদের মধ্যে ১৬টি পদই শূন্য রয়েছে। অপরদিকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ৪৯১টি পদ শূন্য রয়েছে। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেই সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ ১১টি পদের মধ্যে ৬টি পদই শূন্য। দুটি সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ১টি সহকারী মনিটরিং কর্মকর্তার পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই তিনটি পদ খালি পড়ে আছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৭টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী ও নৈশপ্রহরীসহ কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। শূন্য পড়ে আছে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, গাড়িচালক, অফিস সহায়কসহ তিনটি পদ। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাসিক সমন্বয় সভাসহ জেলা অফিসের সব কার্যক্রম দায়িত্বরত একজন কম্পিউটার অপারেটরের সহযোগিতায় একাই পরিচালনা করেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। জনবলের অভাবে প্রতিদিনই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলা ও ৫ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং ৭৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও দপ্তরি কাম-প্রহরীসহ মোট ৫ হাজার ৬২৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ৮৭৯জন। তবে শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকসহ গুরুত্বপূর্ণ ৭৪৫টি পদই দীর্ঘদিন থেকে খালি পড়ে আছে।
লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ ৬৩টি পদের মধ্যে ৩৭টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর মধ্যে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় খালি পড়ে আছে দুটি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ। সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৪ জন, বাকি ১৯টি পদ দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য হয়ে আছে। লক্ষ্মীপুর সদরে ১৩টি পদের মধ্যে ১০টি, রামগঞ্জে ৭টির মধ্যে ৪টি, রামগতিতে ৬টির মধ্যে ২টি, রায়পুরে ৫টির মধ্যে ২টি এবং কমলনগরে ২টি পদের মধ্যে ১টি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়াও ৫ উপজেলায় উচ্চমান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক ৫টি, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ১০টি, হিসাব সহকারী ৫টি ও অফিস সহায়ক ৫টিসহ অনুমোদিত ২৫টি পদের মধ্যে ১৬টি পদই শূন্য পড়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মরত দুজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, শিক্ষা কর্মকর্তার অধিকাংশ পদ খালি থাকায় তাদের ওপরে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেও শেষ করতে পারছেন না।
কমলনগর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় ৬৯টি বিদ্যালয় রয়েছে। সব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তদারকিসহ উন্নয়ন কাজের পরিদর্শনে ৬ থেকে ৭ মাস লেগে যায়। এতে অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ করতে গিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবুও উপকূলে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।’
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে সব কাজেই ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। ১৩জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে মাত্র তিনজনকে। সদর উপজেলায় ২৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ১৩টি ক্লাস্টারের আওতায় এসব বিদ্যালয়ে শুধু মনিটরিং করতেই তিনজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার সময় লেগে যায় ৯ থেকে ১০ মাস। কর্মকর্তার অভাবে বর্তমানে ভিডিওকলের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
রামগতি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার মো. ইউসুফ জানান, উপজেলা শিক্ষা অফিসে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৬টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪জন, দুটি খালি, একজন হিসাব সহকারীর দায়িত্বে থাকলেও উচ্চমান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও অফিস সহায়কসহ তিনটি পদ শূন্য। তা ছাড়া মেঘনার তীরবর্তী এ উপজেলায় ৯৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ৬৭২টি পদ থাকলেও খালি পড়ে আছে ৩৩টি প্রধান শিক্ষক ও ৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ। উপকূলে শিক্ষার গতি বাড়াতে শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণের দাবি করেন তিনিও।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি গোলাম মাওলা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ জনবল সংকটের ফলে একদিকে নিয়মিত বিদ্যালয় তদারকি হয় না, অপরদিকে দাপ্তরিক কাজ সারতে গ্রাম থেকে শিক্ষকদের শিক্ষা অফিসে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তা ছাড়া শিক্ষক সংকটের ফলে চরম আকারে ব্যাহত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম। শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকসহ শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি।