পার্বত্য চট্টগ্রামের পরতে পরতে অসংখ্য ঝিরি রয়েছে। ঝিরি হলো পাহাড় বেয়ে নেমে আসা অগভীর জলপ্রবাহ। স্থানীয়রা কেউ কেউ একে ছড়াও বলে থাকেন। এসব ঝিরিতে রয়েছে ছোট-বড় অজস্র পাথর। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এসব পাথরের কোটরেই সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ জলজ পোকামাকড়ের বসবাস। এ ছাড়া এসব পাথরের কারণে প্রাকৃতিকভাবেই পরিশোধন হয় ঝিরির পানি। আর পাহাড়ের দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা জন্মান্তর ধরে রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করে আসছেন এসব পানি। তবে প্রভাবশালী চক্রের কারণে দিনে দিনে পাথরশূন্য হয়ে পড়ছে পাহাড়ের ঝিরিগুলো। তীব্র হচ্ছে পানির সংকট।
সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ১ নম্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আনুমং মারমার বিরুদ্ধে স্থানীয় বেশ কয়েকটি ঝিরি থেকে পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুগড়াছড়ি, মঙ্গারামপাড়া, ভুবন কার্বারীপাড়া, থলিপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকার ঝিরির পাথর বিক্রি করছেন জেলার বড় একজন ঠিকাদারের কাছে। গত এক মাসে ওই সব এলাকা থেকে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট্রাক পাথর বিক্রির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের সূত্র ধরে গুগড়াছড়ির মঙ্গারামপাড়া গিরিকন্দর অরণ্য কুঠিরসংলগ্ন (বৌদ্ধ বিহার) ঝিরিতে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। গুগড়াছড়ি থেকে মঙ্গারামপাড়া যাওয়ার পথে ইট-সলিং সড়কের পাশে বেশ কিছু স্থানে ভাঙা পাথরের স্তূপ চোখে পড়েছে। মঙ্গারামপাড়া ঝিরিতে গিয়েও পাওয়া গেছে বড় পাথরের ভাঙা বেশ কয়েকটি স্তূপ।
স্থানীয়রা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আনুমং মারমা নিজেই শ্রমিক দিয়ে এসব পাথর উত্তোলন করাচ্ছেন। তাই ভয়ে কেউ এর প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। তবে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে অগভীর ওই জলপ্রবাহের জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি পানির প্রাকৃতিক পরিশোধনব্যবস্থা নষ্ট করার ফলে সেখানকার বাসিন্দাদের পানিবাহিত রোগবালাই বাড়ছে। পাথরশূন্য ঝিরি শুকিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ব্যবহার করার মতো পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে পাথর উত্তোলনের কথা স্বীকারও করেছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আনুমং মারমা। তবে এর জন্য ধর্মের দোহাই দিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘এ পাথর আমি বিক্রির উদ্দেশ্যে তুলছি না। পার্শ্ববর্তী গিরিকন্দর অরণ্য কুঠিরের (বৌদ্ধ বিহার) উন্নয়নকাজের জন্য ঝিরি থেকে পাথর তোলা হয়েছে।’
তবে গিরিকন্দর অরণ্য কুঠির (বৌদ্ধ বিহার) পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব অলক চৌধুরী খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, ‘কুঠিরের জন্য বহু আগে অল্প কিছু পাথর তোলা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিহারের (বৌদ্ধ বিহার) কাজে কোনো পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে না। কেউ যদি বিহারের কাজের জন্য পাথর তোলার কথা বলে থাকেন তা সত্যি নয়।’
মঙ্গারামপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেনু মারমা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘পাহাড়ি ও পাথুরে এলাকা হওয়ায় এখানে নলকূপ স্থাপন করা যায় না। ফলে পানির বিকল্প কোনো উৎস না থাকায় ঝিরি বা ছড়াগুলোই আমাদের একমাত্র ভরসা। তবে এগুলো শুকিয়ে এখন মরা ঝিরিতে পরিণত হয়েছে। আগের মতো পানি নেই তাতে।’
ষাটোর্ধ্ব স্থানীয় বাসিন্দা খগেন ত্রিপুরা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ঝিরিগুলোতে পানির তীব্র সংকট। সামান্য কিছু পানি পাওয়া যায় ঝিরিতে, তবে তা-ও দূষিত। পরিবারের শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা এসব পানি পান করার ফলে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খাগড়াছড়ি জেলার সভাপতি শেফালিকা ত্রিপুরা খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিন দশক ধরে দেখছি এখানকার পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো থেকে নির্বিচারে প্রভাবশালীরা পাথর তুলছে। বলা চলে এসব এখন একেবারেই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপও চোখে পড়ে না।’
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, ‘পাহাড়ের ঝিরি বা ছড়া থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমতি নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’