নোয়াখালীর হাতিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর বা বাংলা ঘর। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় একসময় অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত পরিবারে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল কাচারি ঘর বা গ্রামের বাংলা ঘর।
বাড়ির বাইরের আঙিনায় অতিথি, মুসাফির, ছাত্র ও জায়গিরদের থাকার ঘরটি কাচারি ঘর বা বাংলা ঘর নামে বেশি পরিচিত ছিল। এ ঘরকে অনেক জায়গায় আবার বৈঠকখানাও বলা হতো। সেটি আর এখন চোখে পড়ে না। এই বাংলা ঘরের চৌকির ওপর থাকত বাড়ির অবিবাহিত ছেলে বা ছাত্ররা। আবার মেহমান এলেও থাকতে দেওয়া হতো। মাটিতে এক ঢালা হোগলা পাতার বা বাঁশের চাটাই বিছিয়ে বিছানা করে থাকতেন বারোমাসি কামলারা (কাজের লোক)। গড় গড় শব্দে তারা হুক্কা টানতেন আর ধোঁয়া ছাড়তেন।
প্রতি রাতেই পাড়ার সব কামলা বড় কোনো কাচারি ঘরে মিলিত হয়ে গানের আসর বসাতেন। গান করতেন পল্লিগীতি, ভাটিয়ালী, রূপবান, গুনাই বিবি, আলোমতি, সাগরভাসা, বেহুলা লখিন্দরের পালা। মাঝে মাঝে গভীর রাত পর্যন্ত বসত সালিশ বৈঠক। গৃহ অভ্যন্তরে যারা থাকতেন, তাদের চোখেও ঘুম ছিল না। চা আর পানের ফরমায়েশ রক্ষা করতে হতো তাদের।
প্রায় প্রতিটি রাতে কাচারি ঘরওয়ালা বাড়িতে আসতেন অনাত্মীয়-অচেনা কোনো মুসাফির। ভেতর বাড়ি থেকে শোনা যেত কোনো অচেনা মুসাফিরদের কণ্ঠ: ‘বাড়িতে কেডা আছেন?’ কাছে এলে বলতেন: ‘থাকবার জাগা হবে? অনেক রাইত অইছে, বাড়িতে যাওয়া যাইব না’ আর এ কারণেই বাঙালিরা হয়ে উঠেছিল অতিথিপরায়ণ। আরবের মানুষও অতিথিপরায়ণ হয়েছিল শুধু মরুভূমির কারণে।
যত রাতেই অতিথি আসুক, তাদের না খেয়ে ঘুমাতে দিতেন না বাড়িওয়ালারা। মজার ব্যাপার হলো, এসব অতিথি রাতের অন্ধকার থাকতেই উঠে চলে যেতেন। তবে কোনো দিনও বাড়ির কোনো কিছু চুরি হয়নি বা হারায়নি। কাচারি ঘরের সামনে ছিল বারান্দা। বারান্দায় সব সময় একটি হেলনা বেঞ্চ থাকত। ক্লান্ত পথিকরা এখানে বসে একটু জিড়িয়ে নিতেন। কখনো কখনো পান-তামাক (হুক্কা) খেয়ে যেতেন।
উপজেলার পশ্চিম চর কৈলাশের মরহুম খবির মেম্বারের ছেলে আলতাফ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দুটি কাচারি ঘর ছিল, যেগুলো আজ পরিত্যক্ত। এই ঘর দুটি ছিল আমাদের ঐতিহ্য। একসময় এই ঘরের বারান্দার একপ্রান্তে ছোট কক্ষে থাকতেন মসজিদের মৌলভী ও মক্তবের শিক্ষক। এখন আর কোনো বাড়িতে বাংলা ঘর নেই। যে কয়টি আছে, তা ব্যবহৃত না হওয়ায় অবহেলা, অযত্নে ধ্বংসপ্রায়। বারোমাসি রাখালের প্রচলন নেই। নেই রাখালি গান। বাড়ির ছেলেদের রাতে বাইরে থাকার অনুমতি নেই। অবকাঠামো উন্নতির ফলে মাঠেঘাটে যারা কাজ করেন তারা দিন শেষে নিজ বাড়িতে চলে যান। পরিবারগুলো ছোট ও খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। তাই বিলুপ্ত হচ্ছে শতবর্ষের ঐতিহ্য কাচারি ঘর নামে খ্যাত বাহির বাড়ির বাংলা ঘরটি।’
হাতিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কেফায়েত উল্যাহ বলেন, ‘বর্তমানে ড্রয়িংরুমের সাজসজ্জার মাধ্যমে কোনো অভিজাত পরিবারের আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ঝাড়বাতি, সোফা সেট, অ্যাকিউরিয়াম, ইন্টেরিয়র, রুচিশীল কোনো ছবি দিয়ে মনোমুগ্ধকরভাবে সাজানো হয় অতিথিশালা বা ড্রয়িংরুম। তবে একসময় এ কাচারি ঘর ছিল অভিজাত্যের প্রতীক।’
নূরউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘এখন সবাই শহরকেন্দ্রিক। নিজেদের পরিবার নিয়েই সবাই ব্যস্ত। বাবা-দাদার ঐতিহ্য নিয়ে মোটেও মাথাব্যথা নেই। তবে সবাই বাবা-দাদার সম্পদ ঠিকই বিক্রি করে নিয়ে যান। এসব কারণে এ ঐতিহ্যটি এখন বিলুপ্তপ্রায়।’