১ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটা। গভীর ঘুমে ছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড পূর্ব সৈয়দপুর গ্রামের আশু টেন্ডলের বাড়ির বাসিন্দা আব্দুল মন্নান। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রেহেনা আক্তার। পাশের রুমে ঘুমাচ্ছিলেন পুত্রবধূ মুক্তা বেগম। এমন সময় দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। আব্দুল মন্নান পরিচয় জানতে চাইলে ওই আওয়াজ আরও বাড়ল। ভীতি কাটিয়ে মন্নান দরজার কাছে গেলেও স্ত্রী ততক্ষণে ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপছেন। বাইরে কে আছে তা দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন তিনি। এরমধ্যেই বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে দরজাটির লক কেটে ফেলা হলো। মুহূর্তেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল হাফপ্যান্ট পরা ৯-১০ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাতদল।
সবার গায়ে জ্যাকেট, মুখে মাঙ্কি টুপি, হাতে বড় ধারালো রামদা। আঁকাবাঁকা এসব অস্ত্র দেখে কালেমা পড়তে লাগলেন মন্নানের স্ত্রী রেহেনা বেগম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মন্নানের হাত-পা বেঁধে ফেলা হলো। সেই সঙ্গে স্ত্রী রেহেনা বেগম ও পুত্রবধূ মুক্তাকেও। মন্নান ভালো করে ডাকাতদের অবয়ব দেখে নিচ্ছিলেন। ডাকাত সর্দার তা বুঝতে পেরে মন্নানের চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলেন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি এভাবেই খবরের কাগজের কাছে দুর্ধর্ষ ডাকাতির বর্ণনা দেন বিদেশ ফেরত আব্দুল মন্নান। তিনি বলেন, ডাকাতরা আমার স্ত্রীর কাঁধে রামদা বসিয়ে তার কাছে জানতে চাইলেন আলমিরার চাবি কোথায় রেখেছেন? দেখিয়ে দেওয়ার পর চাবি নিয়ে তারা আলমিরা খুলে তিন ভরি সোনা, নগদ ২০ হাজার টাকা ডাকাত সর্দারকে দিল। তিনি সেগুলো তার কোমরে ঝুলানো ব্যাগে পুরে নেয়। এরপর তারা বাড়ির পেছন দিয়ে সোজা পূর্বে চলে যান।
তবে ১ ফেব্রুয়ারি রাতে আব্দুল মন্নানের পাশাপাশি ডাকাতির ঘটনা ঘটে একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর কেদারখীল গ্রামের বোরহান উদ্দিনের বাড়িতেও। তবে সেখানে জিনিসপত্র লুট করতে না পেরে বোরহান উদ্দিন ও তার শ্বশুর নুরুল আবছারকে কুপিয়ে জখম করে ডাকাতরা। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তারা এখন বাড়িতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। বোরহান বলেন, ‘আমার বাড়িতে ২ মাসের মধ্যে মোট ৩ বার ডাকাত পড়েছে। বাড়িতে গরুর খামার আছে। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’
সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, ওই ইউনিয়নের উত্তর কেদারখীল, পূর্ব সৈয়দপুর ও সীতাকুণ্ড পৌরসভার শিবপুর সেনের পুকুরপাড় সংলগ্ন এলাকার মানুষ ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ একদল ডাকাতদলের আতঙ্কে আছেন। গত ২ মাসে ৪টি বাড়িতে ৬ বার ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তাহীনতায় রাতভর পাহারা দিয়ে রাত কাটাচ্ছেন অনেকে।
পূর্ব সৈয়দপুরের আশু টেন্ডলের বাড়ির স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন জানান, ৬ মাস আগে এমিলিয়া কনভেনশন সেন্টারের সামনের সড়কে রামদা হাতে ৭-৮ জনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। ওই সময় তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়িতে আসছিলেন। তার সঙ্গে ছিল ছোট ভাই। ডাকাতরা তাদের ধরার জন্য এগিয়ে এলে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ইকবাল কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন। যদিও ডাকাতদলের এক সদস্য রামদা দিয়ে পেছনের জনকে কোপ মারলে তার শার্টে লেগে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
উত্তর কেদারখীল গ্রামের ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাড়িতে আসা ডাকাত সদস্যরা ছিল ফুলপ্যান্ট পরা। তাদের হাতে বড় ধারালো রামদা ও মুখে মাঙ্কি টুপি ছিল। ভাষা ছিল উত্তরাঞ্চলের। বার বার ডাকাতির ঘটনায় আমরা খুব চিন্তিত। রাতে ঘুম আসে না। চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’
সীতাকুণ্ডের ১ নম্বর সৈয়দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম নিজামী বলেন, ‘আমরা ডাকাতির ঘটনায় উদ্বিগ্ন। ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশসহ সবাইকে নিয়ে ডাকাতি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর পদক্ষেপের নেব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি কে এম রফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সাম্প্রতি ডাকাতির ঘটনা শুনেছি। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয় ভুক্তভোগীদের কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। তবে ১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা দুটি পুলিশ তদন্ত করেছে। ভিকটিমদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে এলাকাবাসী ডাকাতি বললেও ওই দুই ঘটনাকে চুরি বলে দাবি করেছেন সীতাকুণ্ডের ওসি কামাল উদ্দিন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ওসি বলেন, ‘উত্তর কেদারখীলের ঘটনায় ঘরের তালা ভেঙে দুজনকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে ঘর থেকে কিছু নেয়নি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে পূর্ব শক্রতার জেরে ওই হামলা চালানো হয়েছে। আর পূর্ব সৈয়দপুরের ঘটনায় ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যায়। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছিলেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সীতাকুণ্ড একটি শিল্প এলাকা। আমরা সব সময় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৎপর আছি।’
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এসব ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ছাড় দেওয়া না। বেশির ভাগ ঘটনার মালামাল আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছি।’