চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ও সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় সংরক্ষিত বনের প্রায় আড়াই একর বনভূমি ও গাছপালা কেটে মাছ চাষের জন্য হ্রদ তৈরির ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ব্যক্তিগত সহকারীসহ বন আদালতে চার দিনে ১৮ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়েছে।
গত ২৯ জানুয়ারি এবং ২, ৩, ৪, ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৬ আদালতের বিচারক নুরুল হারুনের আদালতে বাদী হয়ে মামলাগুলো করেছেন চুনতী অভয়ারণ্য রেঞ্জের বড়হাতিয়া বিট কর্মকর্তা মো. সামশুল হক। আদালত পিওআর গ্রহণের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. শাহেদ।
জানা যায়, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ও সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায় আছে সংরক্ষিত ও রক্ষিত বিশাল বন। সেখানে সোনাকানিয়া ছড়ায় ২০০ ফুট দৈর্ঘ্যের বাঁধ তৈরি করে হ্রদ বানানো হয়েছে। যার প্রস্থ ২০ ফুট ও উচ্চতা ১০০ ফুট।
বন বিভাগ জানিয়েছে, এই হ্রদের কারণে গামারি, সেগুন, চিকরাশি, অর্জুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ লাখ গাছ কেটে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। যে জায়গায় হ্রদ করা হয়েছে সেখানে ছিল গাছগুলো। এখানেই ছিল হাতির পালের চলার পথ। বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও সেটি।
লোহাগাড়া বন বিভাগ ও উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মাটির বাঁধটি নির্মাণ শুরু হয়। শেষ হয় ওই বছরের মার্চে। এরপর থেকেই চলছে মাছের চাষ। কৃষকরা বলছেন, বাঁধ দেওয়ার ফলে ছড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লোহাগড়া ও সাতকানিয়ার ৪ হাজার ২৫৫ একর জমির চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কৃষকরা শুরু থেকেই সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করে এলেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি।
অবশ্য বন বিভাগের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করলেও সদ্য সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্যের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।
এবার গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আদালতে পাঁচটি মামলা করেন বিট কর্মকর্তা সামশুল হক। গত ৩ ফেব্রুয়ারির মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয় সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সাবেক এমপির ব্যক্তিগত সহকারী এবং ওই এলাকার মৃত আব্দুল আলীমের ছেলে এরফানুল করিমকে।
অন্য আসামিরা হলেন- বড়হাতিয়া ইউনিয়নের করিম আহমদের ছেলে নজির আহমদ (৫০), একই এলাকার আবুল খায়েরের ছেলে লিটন (৩২), আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুল মতলব, আলী আহমদের ছেলে আবুল কালাম।
এ মামলায় বলা হয়েছে- আসামিরা বনের জায়গায় অনুপ্রবেশ করে সাতকানিয়া মৌজার আরএস ৬০০৫ দাগ ও বিএস ১১ হাজার ১১ দাগে ১৪-১৫ জন ব্যক্তি দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে ফেলেন। পরে বাঁধ নির্মাণ করেন এবং মাছ চাষ করেন। এতে ওই এলাকার প্রাণপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়ে। ধ্বংস হয়ে যায় বিশাল আয়তনের বনভূমি। ঘটনাস্থল থেকে বন বিভাগ কোদাল, ঝুড়ি, শাবলসহ পাহাড় কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। যেখানে ১৬ হাজার ৮০০ ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়েছে এবং বনে অবৈধভাবে মাছ চাষ করা হয়েছে। যা ১৯২৭ সালের বন আইনের ২৬ (১ ক), (ঙ), ৩৩ (১ ক), (গ) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একইভাবে ২ ফেব্রুয়ারি আরও দুটি মামলা করা হয়েছে। একটি মামলায় বড়হাতিয়ার নুরুল ইসলামের ছেলে নাছির উদ্দিন, আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে জামাল উদ্দিন, সুলতান উদ্দিনের ছেলে কামাল উদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ৪ হাজার ৫০০ ঘনফুট পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে এবং ২ হাজার ১০০ ঘনফুট মাটি স্তূপ আকারে পাওয়া গেছে।
১৯২৭ সালের বন আইনের ৩৩ (১) (ঘ), ৩৩ (১ ক), (গ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি মামলায় মো. দিল মোহাম্মদ প্রকাশ বেট্টো সওদাগর, সাইফুল ইসলাম, শাহা আলম, আব্দুর রহিম, খোরশেদুল আলমকে আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরা হলেন- মো. নাছির উদ্দিন, মনজুর আলম, দিল মোহাম্মদ প্রকাশ বেট্টো সওদাগর, মোরশেদ আলম, সাইফুল ইসলাম, আব্দুর রহিম, শাহা আলম, খোরশেদুল আলম, জামাল উদ্দিন, কামাল উদ্দিন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মামলাগুলোতে বন আইনের উল্লিখিত ধারায় সরকারি বনের জায়গায় অনুপ্রবেশ করে পাহাড় কেটে মাটি অপসারণ করে বাঁধ দিয়ে ছড়ার মুখ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়ে। উজাড় করা হয় বিশাল বন, নষ্ট করা হয় হাতির পালের চলাচলের পথ। পুরো একটি সংরক্ষিত বনকে ডুবিয়ে হ্রদ বানানো হয়েছে মাছের ঘের তৈরির জন্য।
এমকে মনির/জোবাইদা/অমিয়/