চার দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে যশোর শহরের নিম্নাঞ্চল জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। টানা এক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাত হলেই শহরের অন্তত ৩০টি সড়ক পানির নিচে চলে যাচ্ছে। এ পানি সরতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। এর মধ্যে আবার বৃষ্টি হলে একই অবস্থা বিরাজ করে। কোনো কোনো এলাকায় বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। টানা বর্ষণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার মানুষ। শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোর ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এরপর তিন দিন ধরে থেমে থেমে চলে বৃষ্টি। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা ও বিদ্যমান ড্রেনের অচলাবস্থা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পৌরসভার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
যশোর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে যশোরে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যশোরে ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আর গত চার দিনে ৩৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভারী বর্ষণ হলেই যশোর পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। খড়কি এলাকার শাহ্ আবদুল করিম সড়ক, স্টেডিয়াম পাড়া, শহরের পিটিআই, নাজির শংকরপুর, ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে পাইপ পট্টি, বেজপাড়া চিরুনিকল, আশ্রম রোড, শংকরপুর, রেল রোড, মিশনপাড়া, রেলস্টেশন, চোপদারপাড়া, বেজপাড়া তালতলা, টিবি ক্লিনিক মোড়, পুরাতন কসবা, পুলিশ লাইন টালিখোলা, বিমানবন্দর রোড ও ষষ্ঠীতলাপাড়ার বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে আছেন পৌরসভার ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। এসব এলাকার অন্তত ৩০টির বেশি প্রধান সড়ক এবং অসংখ্য লেন ও বাইলেনের ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত নোংরা পানি উপচে ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে।
শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা আলতা বানু বলেন, ‘কয়েক শ বাড়িতে পানি উঠেছে। আমাদের বাড়ির নিচতলায় হাঁটুপানি জমেছে। টিউবওয়েলের কিছু অংশ পানিতে ডুবেছে। রান্নাঘরে পানি ঢোকায় রান্না বন্ধ।’
একই এলাকার আকবর হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা যায়। থাকে দুই তিন দিন। টানা চার দিন বৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তি দ্বিগুণ হয়েছে।’
স্টেডিয়াম এলাকার আসমা খাতুন বলেন, ‘বাড়িঘরে পানি উঠেছে। ঘরের ভেতরে হাঁটুপানি। পরিবার নিয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছি।’
খড়কি এলাকার ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, সড়কের পাশে ড্রেন থাকলেও আবর্জনায় পূর্ণ হওয়ায় পানি উপচে সড়কে প্রবেশ করেছে। সড়কের এই পানি আবার দোকানে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, সড়ক নিচু আর ড্রেন উঁচু হয়ে গেছে। তাই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
পৌর নাগরিক অধিকার আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, শহরের ভেতর দিয়ে ভৈরব ও পাশ দিয়ে মুক্তেশ্বরী নামে দুটি নদ-নদী বয়ে গেছে। এর মধ্যে ভৈরব নদ দিয়ে শহরের উত্তরাংশ ও মুক্তেশ্বরী নদী দিয়ে শহরের দক্ষিণাংশের পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু গত দেড় দশকে শহরের দক্ষিণাংশের পানি মুক্তেশ্বরী নদী দিয়ে নামতে পারছে না। পয়োনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে শহরের পানি হরিণার বিল দিয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যেত। কিন্তু ২০১০ সালে হরিণার বিলে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। এরপর আশপাশে আরও অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে বিল দিয়ে পানি আগের মতো নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ওই পানি বের করার জন্য খালের মাধ্যমে মুক্তেশ্বরী নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। কিন্তু পৌরসভা গত দেড় দশকেও সেই উদ্যোগ নিতে পারেনি।
যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, ‘শহরবাসীর অসচেতনতার কারণেও ড্রেনের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর পৌরসভার জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা হয়। এ বছরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’