ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে নোয়াখালীতে বেশি ক্ষতি হয়েছে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়। এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন নিঝুমদ্বীপের বেশির ভাগ এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এ ইউনিয়নের ৩৩ হাজার পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত ২৫ দিনেও ওই এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের কোনো লোক না যাওয়ায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে ইউনিয়নের বাসিন্দারা। সরেজমিনে নিঝুমদ্বীপ ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দিনাজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘রিমালের তাণ্ডবে অর্ধশত বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, চার শতাধিক বাড়িঘরের ভিটার মাটি জোয়ারে ভেসে গেছে। ৩৭টি নতুন করা সড়কের প্রায় ১৮০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিঝুমদ্বীপে প্রধান সড়কের চার স্থানে ভেঙে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে।’
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ঘূর্ণিঝড়ের আগের দিন থেকে খোঁজখবর রাখছেন। উপজেলা পরিষদ থেকে ১০০ প্যাকেট ত্রাণ, ১০ বান্ডিল ঢেউটিন ও দুই লাখ নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে নিঝুমদ্বীপে আসতে দেখিনি। উপজেলা চেয়ারম্যান আশিক আলীর আশ্বাসে আমি স্বেচ্ছাশ্রমে লোকজন নিয়ে প্রধান সড়কের ভাঙনের চারটি স্থানে মাটি দিয়ে এবং কয়েকস্থানে অস্থায়ী কাঠের সেতু ও সাঁকো দিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করেছি।
নিঝুমদ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল কালাম ও লুবনা বেগম দম্পতি শূন্য ভিটায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, পাঁচটি সন্তান নিয়ে আমরা এখন কোথায় যাব। কীভাবে থাকব। ঘর নাই, খাবার নাই, পরনের কোনো কাপড় নাই। সব সর্বনাশা রিমাল কেড়ে নিয়েছে।
লুবনা বেগম বলেন, ‘এখানে আমাদের ঘর ছিল। পাঁচটি ছাগল ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র আঘাতে দিশেহারা হয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পরনের কাপড় দিয়ে পেঁছিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে কোনো মতে জীবন রক্ষা করেছি। ঘর-দরজা, ছাগল, হাড়িপাতিল, ঘরের আসবাবপত্র সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরে আমাদের চেয়ারম্যান ৯ কেজি চাল ও নগদ দুই হাজার টাকা দিয়েছে। এ দিয়ে সাতজন মানুষ কীভাবে চলি’, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
মোল্লা গ্রামের তাসলিমা বেগম একমাত্র আশ্রয়স্থল বসত ঘর হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে এখন পাশের গ্রামে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ঘরের চাল ও বেড়া পড়ে আছে ভিটির ওপর। ঘরের মালামাল ও ভিটার মাটি নিয়ে গেছে মেঘনার জোয়ারের পানি। ঝড় থেমে গেলেও দুর্ভোগ থামেনি তাসলিমা বেগমের পরিবারের। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, আমরা গরিব অসহায়। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নাই।
এদিকে ঘূর্ণিঝড়ে প্রবেশ করা জোয়ারের পানি আটকে থাকায় এখন স্থানীয়রা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। দ্বীপের বাসিন্দাদের গায়ে এলার্জিসহ শরীরের চামড়ায় নানা ধরনের ফোস্কা পড়েছে। স্থানীয়ভাবে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় এলাকাবাসী কোনো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনও আসছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় রিমালে দ্বীপের ১৯১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আধাপাকা ২৭০টি ও কাঁচা ৩ হাজার ২২৮টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩ হাজার পরিবার কমবেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবাদিপশু, হাঁসমুরগি ভেসে গেছে ৪ হাজার ৮৭৬টি, ৮ হাজার ৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ৩৮০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার রাস্তাসহ ১১টি কার্লভাট ও ১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ধসে গেছে। ৬০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৩৫ টিউবওয়েল ও ২৮৫টি নৌকা-ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশীষ চাকমা খবরের কাগজকে বলেন, দ্বীপের ১১ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার মধ্যে পাঁচটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এগুলো হলো নিঝুমদ্বীপ, সুখচর, নলচিরা, হরনী ও চানন্দী। উপজেলায় মোট ২১১ কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৩ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা এলাকায় না যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ইউএনও শুভাশীষ চাকমা বলেন, আপনারা খোঁজখবর নিয়ে দেখেন আমাদের লোকজন মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। প্রয়োজন হলে আবারও যাব।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার বলেন, আমরা নিঝুমদ্বীপে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছি। তবুও কোথাও না পৌঁছালে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাজমুল হাসান রাজুকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, হাতিয়াসহ উপকূলীয় সব ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো এবং দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে হাতিয়া দ্বীপের সাত লাখ মানুষ। এবারের ঘূর্ণিঝড় রিমাল সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। এখানকার মানুষ ত্রাণ নয়, স্থায়ী বেড়িবাঁধ চান। বিষয়টি আমি উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি।