২০১৭ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এখন উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে চরম অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা ও সংকটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
বর্তমানে এই দুই উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখে বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
চারদিকে যখন পবিত্র ঈদুল আজহার আমেজ, তখন কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে উৎসবের আনন্দ যেন থমকে গেছে। আনন্দ-উদযাপনের বদলে সেখানে বিরাজ করছে দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা ও সীমাহীন বঞ্চনার হাহাকার।
এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন আরও বিপন্ন হয়ে উঠছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা নজু মিয়া দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, আমরা একসময় মিয়ানমারে জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলাম। কিন্তু সংঘাতের কারণে বাড়িঘর ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আল্লাহ ছাড়া এখন আমার পরিবারের দেখভাল করার মতো কেউ নেই। যাদের পরিবারের সদস্য বিদেশে আছেন, তারা গরু কিনে কোরবানি দিচ্ছেন। আর আমরা খুব কষ্টে দিন পার করছি। একটি মুরগি কিনে খাওয়ার মতো টাকাও নেই। কেউ সাহায্য করলে তবেই হয়তো গরুর মাংস খেতে পারব।
ক্যাম্প গুলোতে একদিকে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। আসন্ন কোরবানির ঈদ ঘিরেও তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। অথচ নিজ দেশে থাকাকালে এমন দুঃসময় কখনো দেখেননি বলে জানান অনেকে।
লেদা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা মাহামুদা খাতুন বলেন, আগে আমাদের পরিবারে সদস্য ছিল ৭ জন, বর্তমানে মাত্র দুজন একসঙ্গে বসবাস করছি। আগে প্রতি মাসে ১২ ডলার করে সহায়তা পেতাম। কয়েক মাস ধরে তা কমে ৭ থেকে ১০ ডলারে নেমে এসেছে। এতে খুব কষ্টে দিন কাটছে। কোরবানির ঈদ এলেও ঘরে মাংসের দেখা মেলে না। বিশেষ করে লেদা পুরাতন ক্যাম্পে আমরা তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও পাই না।
টেকনাফ উপজেলায় বর্তমানে ৭টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। সেগুলো হলো নয়াপাড়া মোচনী রেজিস্টার্ড ক্যাম্প, জাদিমুড়া ২৭ নম্বর ক্যাম্প, শালবাগান ২৬ নম্বর ক্যাম্প, লেদা ২৪ নম্বর এলএমএস ক্যাম্প, আলীখালী ২৫ নম্বর ক্যাম্প, হোয়াইক্যং উনচিপ্রাং ২১ নম্বর ক্যাম্প এবং চাকমারকুল ২২ নম্বর ক্যাম্প। এসব ক্যাম্পে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
জানা যায়, গত বছরের ১৪ মার্চ শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে এসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসনের আশার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে একের পর এক ঈদ এলেও মাতৃভূমির সেই চেনা উঠোনে ফেরা হয়নি তাদের।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ নুর বলেন, মিয়ানমারে থাকাকালে আমরা গরু-ছাগল পালন করতাম। তখন যখন যা ইচ্ছা হতো, সেটিই কোরবানি দিতাম। কিন্তু মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে এখন ৮ সদস্যের পরিবার নিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। এখানে আসার পর অনেক ঈদ কোরবানিতে গরুর মাংস পর্যন্ত দেখতে পাইনি। অনেক কষ্ট করে কাজকর্মের মাধ্যমে কিছু টাকা জমিয়ে ১০ পরিবার মিলে ৬৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি ছোট গরু কিনেছি। খুব কষ্টের মধ্য দিয়েই দিন পার করছি।
লেদা এলএমএস ২৪ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মো. আলম বলেন, আমার ক্যাম্পে মোট জনসংখ্যা ৩৬ হাজার ৪৫৩ জন। এখানে ৭ হাজার ৮৭৩টি পরিবার রয়েছে। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সরকার বা কোনো এনজিওর পক্ষ থেকে আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। ১০ থেকে ১৫টি পরিবার মিলে নিজেদের অর্থায়নে কয়েকটি গরু কিনেছে। অনেকেই কষ্ট নিয়ে ঈদ পালন করেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, আশ্রয় শিবিরে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী অনেক এনজিও বর্তমানে তহবিল সংকটে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে এবারের কোরবানির আয়োজনেও। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে গেছে।
তিনি বলেন, গত বছর প্রতিটি পরিবারকে দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়েছিল। তবে এবার উখিয়া ও টেকনাফ এর ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের মধ্যে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হবে।
রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ঈদুল আজহা উপলক্ষে আশ্রয়শিবিরে থাকা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা পাঁচ থেকে ছয় হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল সরবরাহ করত। তবে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছালেও কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে প্রায় দুই হাজারে নেমেছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দুবাই, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের আত্মীয় স্বজনদের পাঠানো টাকায় আশ্রয় শিবিরে কিছু কিছু পরিবার গরু কিনে কোরবানি দেওয়ার সুযোগ হয়েছে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। এছাড়া ভাসানচরে রয়েছেন আরও প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫০ জন রোহিঙ্গা। ফলে বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৪ হাজার ১২৩ জন।
এসএন/