১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর কাজল হয়ে জন্ম নেওয়া মানুষটি বিখ্যাত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ নামে। জন্মদিনে হুমায়ূন আহমেদের ছোটবেলার গল্প শোনাচ্ছেন আহমেদ রিয়াজ।
কাজল তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। সিলেটের বাসায় বেড়াতে এসেছেন তার দাদা। বেশ গরম পড়েছে। হাতপাখায় বাতাস খাচ্ছেন। হঠাৎ কাজলকে বললেন, ‘এই শোন, পাখার ভেতের তো বাতাস ভরা নেই। তবু পাখা নাড়লেই আমরা বাতাস পাই কীভাবে? বাতাসটা আসে কোত্থেকে?’
কঠিন প্রশ্ন। প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি কাজল। উল্টো হকচকিয়ে গেল। দাদার গলায় দুঃখ, ‘আমার ধারণা ছিল তুই পারবি। তুই তো আমার মনটাই খারাপ করে দিলি।’
দাদার মন খারাপ করে দেওয়া বালকের ডাকনাম কাজল। ভালো নাম শামসুর রহমান। বাবা ফয়জুর রহমান। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রেখেছেন। কাজলের জন্ম নানাবাড়িতে- ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জে। বাবা তখন সিলেটের বিশ্বনাথ থানার পুলিশ। প্রথম সন্তান মেয়ে হবে ভেবে নামও ঠিক করে রেখেছেন। মেয়ের জন্য ফ্রক বানিয়েছেন, রুপার মল বানিয়েছেন। সেই ফ্রক আর রুপার মল নিয়েই ছেলেকে দেখতে আসেন ফয়জুর। বাবাকে সন্তুষ্ট করার জন্য অনেক দিন মেয়েদের ওই পোশাক পরে থাকতে হয় কাজলকে। মেয়েদের মতো মাথার চুলও লম্বা করে রাখা হয়, যাতে বেণি করা চুলে রঙবেরঙের রিবন পরতে পারে।
কাজলের ছোট্টবেলাটি কেটেছে নানাবাড়িতে। তখনই তার নামকরণ করা হলো- কাজল। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছিলেন শামসুর রহমান নামে। সপ্তম বছরে হঠাৎ বাবা ফয়জুর রহমান বদলে ফেললেন ছেলের নাম। নতুন নাম রাখলেন- হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ নামে দুই বছর দিব্বি চালিয়ে নিলেন। দুই বছর পর আবার নাম বদলের সুর তুললেন বাবা। এবার কঠিন আপত্তি জানালেন হুমায়ূন আহমেদ- বারবার নাম বদল চলবে না। সেই আপত্তিতে আর নাম বদল হলো না।
ফয়জুর রহমানের অসুখ ছিল ছোট্ট কাজলদের কাছে মজার ব্যাপার। অসুখের সময়ই একবার তিনি জানালেন, সঞ্চয়িতা থেকে যে একটা কবিতা মুখস্থ করে তাকে শোনাতে পারবে সে এক আনা পয়সা পাবে। দুটো মুখস্থ করলে দুআনা।
বিপুল উৎসাহ নিয়ে কবিতা মুখস্থ করতে শুরু করলেন কাজল। মুখস্থ করে ফেললেন ‘এবার ফেরাও মোরে’ কবিতাটি। কোনো ভুল না করে দীর্ঘ কবিতাটি আবৃত্তি করে বাবাকে শুনিয়ে দিলেন। এক আনার বদলে বাবার কাছ থেকে পেলেন চার আনা। আর ওটাই ছিল তার জীবনের প্রথম সাহিত্যবিষয়ক উপার্জন।
তাদের একটা পোষা কুকুর ছিল। নাম বেঙ্গল টাইগার। এক দিন বাড়ির মন্দিরের চাতালে বোন শেফালি আর ভাই জাফর ইকবালের সঙ্গে বসে আছেন কাজল। খানিকপর মা এসে তাদের হেফাজতে দিয়ে গেলেন ছোট ভাই আহসান হাবীবকে (তখন কিন্তু তার নাম কুদরতে খুদা)। মা চলে যেতেই তারা দেখতে পেলেন প্রকাণ্ড এক কেউটে সাপ বের হয়ে এসেছে দরজার ফাঁক দিয়ে। ফণা তুলে হিস হিস শব্দ তুলে এগিয়ে যাচ্ছে আহসান হাবীবের দিকে। ঠিক তখুনি সাপটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বেঙ্গল টাইগার। মরার আগে সাপটিও মরণ ছোবল দিয়ে যায় কুকুরের গায়ে। দুদিন পর বিষক্রিয়া শুরু হয়। বেঙ্গল টাইগারের শরীর পচে গলে যেতে লাগল। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বেঙ্গলকে গুলি করে মেরে ফেলেন বাবা। বেঙ্গলের কষ্ট আর তাদের বিপদে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনা গভীর দাগ কাটে কাজলের। ঘটনাটা তিনি লিখে ফেলেন ‘আমাদের বেঙ্গল টাইগার’ নামে। আর এটাই তার প্রথম সাহিত্যকীর্তি।
তবে সাহিত্য রচনার জন্য তো পড়া দরকার। তাঁর বই পড়ার অভ্যাসটা হয় সিলেটের মীরা বাজার থেকে। স্কুল ছুটির পর এক দিন হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েন এক বাড়ির চৌহদ্দিতে। বাড়ির বাসিন্দা সিলেট এমসি কলেজের রসায়নের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এ কে রায় চৌধুরী। হঠাৎ দেখলেন কোনার দিকের একটি গাছের নিচে পাটি পেতে ষোলো-সতেরো বছরের একটি মেয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। হাতে একটা বই। মেয়েটি হাত ইশারায় তাকে ডাকল। কাছে গেলে জানতে চাইল, কী নাম তোমার খোকা?
কাজল।
কী সুন্দর নাম! কাজল। তোমাকে মাখতে হয় চোখে। তাই না? তা তুমি একা একা হাঁটছ কেন?
জবাব না পেয়ে মেয়েটি। শেষে জানতে চাইল, কী জন্য এসেছ এ বাড়িতে?
বেড়াতে।
তারপর ঘরের ভেতর গেল মেয়েটি। হাতে করে নিয়ে এলো কদমফুলের মতো একটা মিষ্টি। বলল, মিষ্টি খেয়ে চলে যাও। আমি এখন পড়াশোনা করছি। এ সময় কেউ হাঁটাহাঁটি করলে বড্ড বিরক্তি লাগে।
তৃতীয় দিন ওই বাড়িতে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ছোটবোনকে। মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এ আমার ছোটবোন। এ-ও খুব মিষ্টি পছন্দ করে।
ঘরের ভেতর গেল মেয়েটি। খানিকপর ফিরে এসে দুঃখিত গলায় জানাল, আজ ঘরে মিষ্টি নেই। তোমাদের জন্য একটা বই নিয়ে এসেছি। খুব ভালো বই। বইটা নিয়ে যাও। দাঁড়াও, আমার নাম লিখে দেই।
মুক্তার মতো হরফে মেয়েটি লিখল, দুজন দেবশিশুকে ভালোবাসা ও আদরে-শুক্লা দি।
বইটির নাম ‘ক্ষীরের পুতুল।’ লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাতায় পাতায় ছবি।
ক্ষীরের পুতুল বইটি ছিল কাজলের পড়া প্রথম সাহিত্য।
হুমায়ূনের কথায়, ‘ক্ষীরের পুতুল বইটি আমার জীবনধারা অনেকখানি পাল্টে দিল। এখন আর দুপুরে ঘুরতে ভালো লাগে না। শুধু গল্পের বই পড়তে ইচ্ছে করে। কুয়োতলার লাগোয়া একটা ঘর, দুপুরের দিকে একেবারে নিরিবিলি হয়ে যায়। দরজা বন্ধ করে জানালায় হেলান দিয়ে গল্পের বই নিয়ে বসি। জানালার ওপাশে কাঁঠাল গাছের গুচ্ছ। সেই কাঁঠাল গাছে ক্লান্ত ভঙ্গিতে কাক ডাকে। এ ছাড়া চারদিকে কোনো শব্দ নেই। অদ্ভুত নৈঃশব্দের জগৎ। এটা যেন চেনা-জানা পৃথিবী নয়, অন্য কোনো ভুবন।’
দুপুরে যে বইগুলো তিনি পড়তেন, সেগুলো কিন্তু বাবার আলমিরা থেকে চুরি করা। কাজেই মা ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই খুব দ্রুত পড়ে ফেলতে হবে। ধরা পড়লে কী বিপদ আছে কে জানে? একদিন কিন্তু ঠিকই ধরা পড়ে গেলেন। তা-ও বাবার হাতে। বিস্মিত হয়ে বাবা দেখলেন পুত্র কাজল বড়দের বই পড়ছে।
বাবা ফয়জুর রহমানের ছিল বিশাল লাইব্রেরি। কিন্তু সব বই থাকত তালাবদ্ধ। তার ধারণা ছিল, ছেলেপুলেদের এখনো বই পড়ার বয়স হয়নি। কিন্তু পুঁচকে কাজলের পড়ার নেশায় ওসব বয়স-টয়স কোনোই ধার ধারেনি। আর বড়দের বই পড়ে ধরা পড়ার পরও বাবা রাগ করলেন না। ছোট্ট কাজলকে নিয়ে গেলেন সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। বইয়ের বিশাল সংগ্রহ তাদের। ‘যে-দিকে চোখ যায় শুধু বই, বই আর বই।’
কাজলকে গ্রন্থাগারের সদস্য করে দিলেন বাবা। আর শান্ত গলায় বললেন, ‘এখানে অনেক ছোটদের বই আছে, আগে এইগুলি পড়ে শেষ কর। তারপর বড়দের বই পড়বি।’
সম্ভবত ওই গ্রন্থাগারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন কাজল। আর সাহিত্যের প্রতি তার ভালোবাসার শুরু ওখান থেকেই।
মীরাবাজারের থাকার সময় এক গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কাজলের। দেখলেন মশারির ভেতরে ঠিক তার চোখের সামনে ফুটে আছে একটা আলোর ফুল। চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি-এটা কী? এটা কী?
তাঁর কণ্ঠে তখন বিস্ময়, ভয় ও আনন্দ মেশানো।
চিৎকার শুনে ঘুম থেকে জেগে গেলেন বাবা, মা আর ভাইবোনেরা। বাবাকে দেখালেন জিনিসটা। বাবা তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘জোছনার আলো ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে মশারির গায়ে পড়েছে। ভেন্টিলেটরটা ফুলের মতো নকশা কাটা। কাজেই তোমার কাছে মনে হচ্ছে মশারির ভেতর আলো ফুল। ভয়ের কিছু নেই, হাত বাড়িয়ে ফুলটা ধরো।’
কী অবাক! হাত বাড়াতেই ফুলটা উঠে এলো তার হাতে। কিন্তু ধরা পড়ল না। ফুল ধরতে গিয়ে বাকি রাতটা তার নির্ঘুম কাটল। এটা কখনো ধরা সম্ভব নয়। জেনেও একটিবারের জন্য জোছনার ফুল ধরার চেষ্টা করে গেছেন কাজল। সারা জীবন। আর রাঙিয়ে গেছেন আমাদের হৃদয়। সৌরভ ছড়িয়েছেন অসাধারণ সব কাহিনি দিয়ে। নানা রকম কাহিনি। পরীর কাহিনি, দৈত্যের কাহিনি, ভূতের কাহিনি, রূপকথার কাহিনি, আমাদের আশপাশের চেনা জগতের অচেনা কাহিনি।
কলি