এক দেশে ছিল এক ভ্রমর যে ফুলদের খুব ভালোবাসত। ভ্রমররা ফুল আর ফুলবাগানকে ভালোবাসবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক হলো সেই ভ্রমর ভালোবাসত শুধু একটি গোলাপকে। গোলাপ ফুল হলো ফুলবাগানের রানি। কিন্তু ভ্রমর যে গোলাপকে ভালোবেসেছিল, সে ছিল সব গোলাপের চেয়ে অন্যরকম। যেমন তার রূপ, তেমন তার সৌরভ। ভ্রমরের ভালোবাসায় গোলাপও মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলল।
একদিন রানি সেই ফুলবাগানে ঘুরতে এল। গোলাপগুলোকে দেখে তার খুব ভালো লাগল। সে বাগানের মালিকে আদেশ করল, প্রত্যেক রবিবারে তার জন্য একটা করে গোলাপ ফুলের তোড়া বানিয়ে পাঠাতে।
মালি রানিকে কথা দিল, প্রতি রবিবারেই সে এক তোড়া গোলাপ রানির কাছে পাঠাবে। মালির জন্য সেটা ছিল মামুলি ব্যাপার, কিন্তু যে গোলাপটা ভ্রমরকে ভালোবেসেছিল, তার জন্য ছিল দুঃসহ।
মালি সরে যেতেই গোলাপ চিৎকার করে উঠল, ‘ওহ, এক তোড়া গোলাপ ফুল? রোজ রবিবার? কী করব আমি?’
গোলাপ খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল, ‘না, না, অন্য গোলাপদের সঙ্গে মালি আমাকেও কেটে নিয়ে তোড়া বানিয়ে রানির ফুলদানিতে সাজাক, আমি তা চাই না। আমি এই সুন্দর পৃথিবীতে আমার ভ্রমরের জন্য থাকতে চাই।’
এমন সময় সেখানে হাজির হলো ভ্রমর। সে গোলাপকে চিন্তা করতে বারণ করল। বলল, ‘চিন্তা করো না প্রিয় গোলাপ, আমি তোমাকে রক্ষা করব। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।’
ভ্রমরটা সেখান থেকে উড়ে গিয়ে বসল ডেইজি ফুলের বাগানে। ডেইজিও ভ্রমরদের বেশ পছন্দের ফুল। ভ্রমর ডেইজিদের কাছে সাহায্য চাইল। তারা খুশি হয়ে ভ্রমরকে সাহায্য করতে রাজি হলো।
ডেইজিরা একে একে ওদের ফুল থেকে একটা করে পাপড়ি খসিয়ে ভ্রমরকে দিল। ভ্রমর সেগুলো নিয়ে চলে এলো গোলাপের কাছে। ভ্রমর তার চাক থেকে খানিকটা আঠাল মধু নিয়ে ডেইজি পাপড়িগুলোতে লাগাল। এরপর সেগুলো গোলাপটির ওপরে সাজিয়ে দিল। দেখে মনে হলো, ওটা গোলাপ না- একটা ডেইজি ফুল।
মালি গোলাপ ফুল তুলতে এসে দেখে, ওটা তো গোলাপ না, ডেইজি। রানি শুধু গোলাপের তোড়া বানাতে বলেছে। তাই সেই গোলাপটিকে না তুলে সে অন্য গোলাপগুলো তুলে নিয়ে চলে গেল। সে যাত্রায় বেঁচে গেল সেই গোলাপ।
মালি চলে যেতেই ভ্রমর আর গোলাপ আনন্দে নেচে উঠল। গোলাপ বলল, ‘বন্ধু, তোমার বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে। বোকা মালি আমাকে ডেইজি ফুল মনে করে না তুলে চলে গেছে!’
‘সত্যিই মালিটা বেশ বোকা! কিন্তু বন্ধু, তোমার শরীরে ডেইজি ফুলের পাপড়ি সাজানোয় তোমাকে এখন সূর্যের মতো লাগছে।’
এভাবে এক সপ্তাহের পর আর এক সপ্তাহ কেটে গেল। ভ্রমর আর গোলাপ এই কৌশল করে বেঁচে গেল। তারা দুজন রোজ আনন্দে খেলায় মেতে রইল। কিন্তু তার অন্য সাথী গোলাপগুলো যখন তোড়ার ফুল হয়ে রাজপ্রাসাদে যেত ও রানির আদর পেত, তখন সেই গোলাপ তার চালাক ও সাহসী ভ্রমর বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাত।
কিন্তু একদিন গোলাপ দেখল, তার গায়ে লাগানো ডেইজি ফুলের পাপড়িগুলো শুকিয়ে ধীরে ধীরে একে একে ঝরে পড়ছে। শেষে সব ডেইজি পাপড়ি ঝরে পড়ল। এমন সময় মালি দেখে ফেলল সেই অপূর্ব সুন্দর গোলাপ ফুলটিকে। সে মনে মনে ভেবে রাখল, সামনের রবিবার এলেই ওকে কেটে রানির ফুলের তোড়ায় বেঁধে দেবে। গোলাপ তা বুঝতে পেরে কাঁদতে লাগল।
ভ্রমর এসে বলল, ‘কাঁদছ কেন বন্ধু?’
গোলাপ বলল, ‘দেখো বন্ধু, আমার গা থেকে সব ডেইজি পাঁপড়ি খসে পড়ে গেছে। এখন আর আমাকে ডেইজি ফুলের মতো লাগছে না। আমি খুবই হতাশ হলাম, মালি এবার আমাকে তুলে নেবে। তোমার সঙ্গে আমি আর কখনো খেলতে পারব না।’
‘দুঃখ করো না বন্ধু। যেখানে বন্ধুত্ব থাকে সেখানে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই।’ এই বলে ভ্রমর গোলাপের পাপড়িতে অশ্রুকণার মতো জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুছে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভ্রমরটি এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিতে পরিণত হলো।
পরি বলল, ‘তোমাকে অবাক করার জন্য সত্যিই দুঃখিত। আমি আসলে এক পরি। অল্প সময়ের জন্য আমি ভ্রমরের রূপ ধরেছিলাম। তুমি ছিলে রূপে ও গন্ধে এই ফুলবাগানের সেরা গোলাপ। তোমার রূপে মুগ্ধ হয়ে আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। তুমিও আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলে। তুমি সত্যিই এক ভালো মনের ফুল, ভালো বন্ধু। তাই তুমি যা চাও, আমি তোমার সে ইচ্ছে অবশ্যই পূরণ করব।’
‘সত্যিই তাই? তাহলে তুমি এক্ষুণি আমাকে ডেইজি ফুল বানিয়ে দাও। তাহলে আমি চিরকাল এই বাগানে থাকতে পারব। রানির তোড়া বানানোর জন্য মালি আর আমাকে তুলবে না।’
‘তুমি কি ঠিক বলছ? তাহলে তুমি আর এ বাগানের সেরা ফুল থাকবে না, গোলাপ থাকবে না।’
’তাতে কী? গোলাপ হলে তো আমি মরে যাব, মালি তুলে নিয়ে যাবে। ডেইজি হলে আমি বেঁচে থাকতে পারব। এই সুন্দর বাগান ছেড়ে আমি কখনো যেতে চাই না বন্ধু। তুমি আমাকে ডেইজি করে দাও। তাতেই আমি সুখী হব।’
পরি গোলাপের আব্দারে ওকে ডেইজি করে দিল। সেই গোলাপের ঠাঁই হলো ডেইজি বাগানে। পরিটাও আবার ভ্রমর হয়ে গেল। সেই ডেইজি বাগানে ওরা দুজন বন্ধু হয়ে সুখেই দিন কাটাতে লাগল। কী দরকার গোলাপ বা পরি হয়ে, যদি দুজন আর বন্ধু হয়ে থাকতে না পারে?
লেখক পরিচিতি
মার্কিন লেখক টেমপ্লেটন মস সমকালীনদের মধ্যে একজন জনপ্রিয় লেখক। নাটক, উপন্যাস ও কবিতা লিখলেও মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ছোট ছোট মজার গল্পই তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়োর্বা লিন্ডায়, বড় হয়েছেন সান ডিয়েগোতে, এখন বসবাস করছেন লুইসভিলে। তবে ডিজনিল্যান্ডকে তিনি তার দ্বিতীয় বাড়ি বলে মনে করেন। স্কুল জীবন থেকেই তার লেখালেখির শুরু। ড্রাগন ফ্লাই, প্লেন্টি অব থ্রেড, দ্য বি অ্যান্ড দ্য রোজ, দ্য বান্নি-র্যাব, টকিং পিগস অ্যান্ড ম্যাজিক্যাল লেডিস ইত্যাদি তার লেখা কয়েকটি বই। দ্য বি অ্যান্ড দ্য রোজ গল্পের বইটি প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে স্টোরিবেরিজ থেকে।
কলি