নেহাদের ড্রয়িং রুমে লাল পিঁপড়েটা গুটি গুটি পায়ে একা একা ঘুরছে। জন্মের পর এই প্রথম সে নিঃসংকোচে ঘরের দেয়ালজুড়ে ঘুরতে পারছে। ঘরের ফ্লোরে নামছে। পায়চারি করে ফের ওপরে উঠছে।
গত দিনগুলোয় নিজের ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারেনি। এখানে-ওখানে নির্দ্বিধায় যেতে পারেনি। ঘুরতে পারার কারণ, গতকাল থেকে তার প্রধান শত্রু লেজকাটা টিকটিকিটাকে দেখা যাচ্ছে না। দেখা না যাওয়ার কারণ, এ বাসার ছোট্ট নেহা স্কেল দিয়ে টিকটিকিটাকে তাড়া করেছিল। ধরতে না পেরে টিকটিকিটার ওপর স্কেল ছুড়ে মেরেছে। স্কেল গিয়ে পড়েছে টিকটিকিটার লেজের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে লেজটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে মেঝের ওপর লাফাতে লাগল।
আর টিকটিকিটা পুরো শরীর নিয়ে কোথায় যেন পালিয়ে গেল। পাজি টিকটিকি। পাজিটা ঘরের কীটপতঙ্গদের সুযোগ পেলেই হত্যা করে। যারা বেঁচে আছে, ওরাও ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না।
গতকাল নেহার মার খেয়ে লেজকাটা টিকটিকি পালিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তাকে দেখা যাচ্ছে না। ফলে গতকাল থেকে সব কীটপতঙ্গ ভয়হীন ঘোরাফেরা করতে পারছে। নির্ভয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে পারছে।
পিঁপড়েটা এ সময় ওর পরিচিত একটা তেলাপোকা দেখতে পেল। পিঁপড়েটা ভাবল, তেলাপোকাটা দেয়ালের নিচে হাঁটাহাঁটি করছে। দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠছে না। তেলাপোকাটা কি এখনো লেজকাটা টিকটিকিটার ভয়ে ভীত? পিঁপড়েটা তেলাপোকাটার কাছাকাছি গিয়ে ডাকল।
এই যে তেলাপোকা ভাইয়া। তুমি কেমন আছ?
ডাক শুনে পিঁপড়ের দিকে তাকাল তেলাপোকা। বলল, ভালো থাকি কীভাবে? তোমাদের একটি দল কদিন আগে আমার ছোট্ট ছেলেটাকে কোথায় যে নিয়ে গেল এখন পর্যন্ত খোঁজ পাচ্ছি না। এছাড়া লেজকাটা টিকটিকিটার ভয়ে স্বাভাবিকভাবে কি চলাফেরা করা যায়?
পিঁপড়েদের ওই দলে আমি ছিলাম না ভাইয়া। ভবিষ্যতে যেন এরকম না হয় এজন্য তোমাকে ডাক দিয়েছি। বিশেষ করে লেজকাটা টিকটিকিটার জন্য আমরা সবাই ভয়ে ভয়ে থাকি। তার কবল থেকে বাঁচার জন্য আমাদের বসা উচিত। কীভাবে বাঁচা যায় সে পথ বের করা উচিত।
বসতে কোনোপ্রকার আপত্তি নেই। কখন বসবে আমাকে জানালেই দলবল নিয়ে চলে আসব।
ঠিক আছে এখনই জানিয়ে দিলাম। অন্যদেরও বলে দিও। একটু পরই নেহাদের বাথরুমের ওপর জলছাদের দক্ষিণ কোনায় বসব। আমিও সবাইকে নিয়ে জলছাদে যাচ্ছি।
পিঁপড়াটা জলছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যে নেহাদের ঘরে বসবাসকারী সব কীটপতঙ্গ এক সভায় বসল। সভায় যোগ দিয়েছে পিঁপড়াদের একটি দল, দুই প্রজাপতি, তিন মাছি, দুই তেলাপোকা ও তিন মাকড়সা। ওরা সবাই লেজকাটা টিকটিকিটার ভয়ে সন্ত্রস্ত। লেজকাটা টিকটিকিটা ফিরে এলে ওরা কী করবে, কোথায় পালাবে, কীভাবে প্রতিরোধ করবে, এনিয়ে ওদের আজকের সভা। প্রথমেই সভার সভাপতি কে হবে, এনিয়ে কথা বলল লাল পিঁপড়ে।
আজকের সভার আয়োজন সম্পর্কে ইতোমধ্যে অবগত হয়েছ। এখনই আমরা সভা শুরু করব। সভা শুরুর আগে সভাপ্রধান হিসেবে একজনের নাম প্রস্তাব করতে চাই। কী বলো তোমরা? তবে সবাইকে অনুরোধ করব লেজকাটা টিকটিকি এদিকে আসে কি না, খেয়াল রাখতে।
খুব ভালো কথা। এক মাছি বলল। সভাপ্রধান হিসেবে আমার নাম বলো লালু।
মাছির কথায় লাল পিঁপড়ে রেগে গেল। বলল, সাবধান, আমাকে লালু বলবে না। তোমাকে এর আগেও সাবধান করে দিয়েছি।
তোমাকে এই বাড়ির মানুষরা লাল পিঁপড়ে বলে ডাকে। তাহলে আমি ডাকলে দোষ কী! লালকে তো লালুই ডাকব। মাছি লালু ডাকার যুক্তি দেখাল।
এবার মাক্ষিটাকে সামাল দাও লাল পিঁপড়ে। মাকড়শা বলল। তোমাকে আগেই বলেছি ওসব বেয়াদব মাক্ষিটাক্ষি সভায় ডেক না। ওরা সুযোগ সন্ধানী। মানুষের ভালো খাবার নষ্ট করে দেয়। ওদের জন্য নেহার বাবা একদিন ঘরে বিষাক্ত ওষুধ ছিটিয়েছিল। আমরা যারা সচেতন, তারা বেঁচে গেলেও, আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব মারা গেছে বিষাক্ত ওষুধ খেয়ে।
পিঁপড়ে, মাছি ও মাকড়শাকে ঝগড়া করতে দেখে প্রজাপতি বলল, তোমরা কি এখানে ঝগড়া করতে এসেছ, নাকি লেজকাটা টিকটিকির আক্রমণ থেকে কীভাবে বাঁচা যায়, সেই সিদ্ধান্ত নিতে এসেছ?
আমি কী বলি শোনো। আমরা কোনো মানুষের মতো রাজনীতি করতে আসিনি। আমাদের সভাপ্রধান হওয়া দরকার নেই। এই সভার সবাই ভুক্তভোগী, লেজকাটার ভয়ে ভীত। এখানে সবার কথা বলার অধিকার আছে। তবে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, কেউ কারও নাম বিকৃতি করে বলব না।
তুমি সুন্দর কথা বলেছ বন্ধু। আমিও তোমার সঙ্গে একমত পোষণ করছি। আমরা নিজেরাই যদি ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে যাই, তাহলে লেজকাটা আরও সুযোগ পেয়ে যাবে। পিঁপড়েদের দলনেতা বলল।
ঠিক ঠিক, তোমাদের কথা মেনে নিলাম।
মাছি বলল।
এরপর ওরা সবাই ঝগড়া থামিয়ে আলোচনা করল। সিদ্ধান্ত নিল লেজকাটা টিকটিকি বাসা থেকে বেরোনোর পর যেই প্রথম দেখে, সবাইকে জানিয়ে দেবে। সবাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে। নেহাদের খাবার-দাবার নষ্ট করবে না। শুধু পরিত্যক্ত খাবার ও ময়লা খাবে। তাহলে নেহার বাবা আর কোনো বিষাক্ত ওষুধ ছিটাবে না।
জীবনে বাঁচতে হলে আমাদের কৌশল অবলম্বন করতেই হবে। সভায় বলেছে প্রজাপতি।
লাপোকা বলেছে, আমরা একে অপরকে হত্যা করব না। কারণ নেহাদের বাসাটা খুবই ভালো একটা বাসা। আমি আরও কয়েকটা বাসায় বাস করে দেখেছি আরাম পাওয়া যায় না।
পিঁপড়া বলেছে, আমি ওয়াদা করছি কোনো কীটপতঙ্গকে আক্রমণ করব না। আমি সবার পক্ষ থেকে বলছি, এ বাড়িতে বসবাস করা কোনো পিঁপড়াই কাউকে আক্রমণ করবে না।
ওদের সভা শেষ হতেই মাকড়শা দেখল, লেজকাটা টিকটিকিটা ডাইনিং ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িটার পেছন থেকে উঁকি মারছে। মাকড়শা সবাইকে সতর্ক করল। মুহূর্তে সভায় উপস্থিত সব কীটপতঙ্গ সাবধান হয়ে গেল। পিঁপড়া বলল, আজকের জন্য সভা শেষ করলাম। তোমরা সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যাও।
ওরা যে যার মতো দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে গেল। কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল লেজকাটা টিকটিকিটা কী করছে, কোনদিকে যাচ্ছে।
লেজকাটা টিকটিকি দেয়াল ঘড়ির পেছন থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো। সবাই যেখানে সভা করছিল, সেখানে এলো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। দুষ্টুগুলো গেল কোথায়? নিজে নিজে বলল টিকটিকি।
প্রচণ্ড খুদা পেয়েছে লেজকাটা টিকটিকিটার। খাবারের সন্ধানে ডাইনিং ঘরের পুরো দেয়াল ঘোরাঘুরি করল। কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু খুদা নিয়ে বেশি সময় ঘোরাও যাবে না। এদিকে নেহা দেখে ফেললে মুশকিল হয়ে যাবে। গতকাল লেজ ফেলে দিয়ে বেঁচে গেছে, আরেকবার মার দিলে বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনিতেই গতকালের ব্যথাই এখনো পুরোপুরি সাড়েনি।
অনেকক্ষণ ঘুরেও যখন কোনো খাবার জুটল না, কোনো কীটপতঙ্গের দেখ মিলল না, বাসায় ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই ভেবে লেজকাটা টিকটিটি ঘড়ির পেছনের নিজ বাসায় ফিরে গেল। যেতে যেতে লেজকাটা টিকটিকিটা ভাবল, এই বাড়িতে বাস করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে। না খেয়ে মরতে হবে। বাসায় কিছুটা সময় জিরিয়ে নিয়ে পাশের বাসায় চলে যাবে।
কলি