আদ্যিকালের কথা। সেই কালে যা ঘটত, তা এখন আর ঘটে না। দিনকাল যে অনেক বদলে গেছে, তাই। আগেকার দিনে আকাশরাজ্য থেকে পরীরা নিয়মিত চলে আসত মাটির এই দুনিয়ায়। নির্জন পাহাড়ে দলবেঁধে উড়ে আসত তারা। বিশেষ করে যেদিন ভরা পূর্ণিমা থাকত, সেই রাতে। রাতভর তারা নাচত, গান গাইত। আনন্দ উল্লাস করত। ভোরের আলো ফুটি ফুটি হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেত সেই উৎসব। ডানা মেলে তারা ফিরে যেত নিজের দেশে।
একবার এক বুড়ো মানুষ সেই পাহাড়ে আটকা পড়লেন। কেমন কেমন করে যেন ঘটে গেল এই ঘটনাটা। বাড়ি থেকে অনেক দূরের এক মেলায় যাচ্ছিলেন তিনি। হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। নির্জন সেই পাহাড়ের কাছে পৌঁছে থামলেন। ভাবলেন, একটু জিরিয়ে নেবেন। বিকাল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামে নামে। হলো কী, পথের শ্রান্তিতে বুড়ো মানুষটি ঘুমিয়ে পড়লেন। সে কী গভীর ঘুম! সন্ধ্যা ফুরিয়ে এল। রাত হয়ে গেছে। মানুষটির ঘুম কিন্তু ভাঙল না তারপরও। সারা দিন অনেক ধকল গেছে কি না। ঘুম ভাঙবে কেমন করে? চারদিকে ফকফকা জোছনা। স্নিগ্ধ পরিবেশ। ফুরফুরে হাওয়া বইছে। নাম না জানা ফুলের সুবাসে ভরে আছে চারদিক।
পরীরা চলে এসেছে যথারীতি। তাদের রুটিন এটা। কোনো সময়েই এদিক-ওদিক হয় না। পরীরা এসে দেখে ক্লান্ত একটি মানুষ। তার পাশে রাখা আছে একটা থলে। লোকটা মনে হয় কোথাও যাচ্ছিলেন। মাঝপথে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কোনোদিনই এখানে কোনো লোকজন আসে না। বুড়ো মানুষটিকে দেখে খুব মায়া হলো পরীরানির। আহা রে, বেচারি! একেবারে শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। নিষ্পাপ চোখমুখ। দেখে তাই মনে হয়। তিনি করলেন কী, ফিরে যাওয়ার সময় লোকটিকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। লোকটার ঘুম তখনো ভাঙেনি। রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করেছে তার চোখে। ঘুম ভাঙল তখন, যখন পরীরানির দল তাদের দেশে গিয়ে পৌঁছুল।
পরীরাজ্য এই মাটির দুনিয়া থেকে অনেক অনেক দূরে। আকাশের এক প্রান্তে। এর আগে কোনো মানুষ কোনোদিন সেখানে যেতে পারেনি। সোনার রাজপ্রাসাদে নিজেকে দেখতে পেয়ে লোকটা অবাক হলেন ভীষণ। ভাবলেন, স্বপ্ন দেখছেন বুঝি। নাহ, স্বপ্ন নয়। ঝলমলে এক প্রাসাদে অপূর্ব সুন্দরী পরীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ নাচছে, কেউ বা গাইছে। সবার মুখেই আনন্দের হাসি। চমৎকার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হলো। এত ভালো খাবার-দাবার জন্মেও জোটেনি। পরীরা তাকে বলল-
এখানে যে আপনি এসেছেন, সেকথা কাউকে বলা যাবে না। বললে আপনার ক্ষতি হবে। আমাদের কথাটা মনে রাখবেন। মনে রাখতে পারলে আপনারই উপকার।
একথা শুনে তিনি মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ মনে থাকবে।
পরীরা তাকে নিয়ে নানা জায়গায় বেড়াল। খেয়েদেয়ে আবার ঘুম। এই সুযোগে পরীরা তাকে রেখে এলো সেই পাহাড়ে। যেখানে তিনি ঘুমুচ্ছিলেন।
ঘুম ভাঙল আবার। জেগেই লোকটা তার থলে খুঁজলেন প্রথমে। ভীষণ ভারী ভারী লাগছে। খুলে দেখেন, ভেতরে সোনার মুদ্রাভর্তি। অবাক কাণ্ড তো! এটা কীভাবে সম্ভব হলো? আবছা আবছা মনে পড়ল, গত রাতে কী কী ঘটেছে। হুম। অবাক কাণ্ডই ঘটেছে বটে। তিনি বাড়ির পথ ধরলেন।
বাড়ি ফিরেই পড়লেন বিপদে। বৌ জেরা শুরু করে দিলে রীতিমতো। বৌটা ভীষণ ঝগড়াটে। সাধারণ বিষয় নিয়ে কোঁদল করতে ওস্তাদ। মুখ ঝামটা দিয়ে সে জানতে চাইল-
এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি? মেলায় যাওনি বুঝি? তুমি আসলেই একটা অকম্মার ধাড়ি। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। হয়ওনি এতকাল। ব্যাপার কী হয়েছে, সোজা সাপটা খুলে বলো শুনি। না বললে ঝামেলায় পড়বে।
লোকটা চুপ। তিনি জানেন, সত্যি ঘটনা বললে বৌ তাকে সন্দেহ করবে। তাছাড়া বিপদও হবে। পরীরা তাকে সাবধান করে দিয়েছে। সেটা তিনি ভোলেননি। বৌ যত চেঁচায়, তিনি তত চুপ করে থাকেন। কিন্তু বৌ ছাড়বার পাত্রী নয়। বকাঝকা করে চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়া মাথায় তুলে ফেলল। ঘরের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে লাগল এদিক-সেদিক।
ঝগড়ার একপর্যায়ে লোকটা তার থলের দিকে ইঙ্গিত করলেন। ভাবলেন, সোনার মুদ্রা দেখে বৌ হয়তো ঠাণ্ডা হবে। তার বৌটা ভীষণ লোভী কি না।
যা ভাবলেন, তা হলো না। বরং উল্টোটা হলো। খুশি তো হলোই না। গেল আরও খেপে। চণ্ডমূর্তি ধারণ করল। কী যন্ত্রণা! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল বৌ-
ও, আজকাল তুমি তাহলে চুরিদারি শুরু করেছ। ছি ছি ছি। তলে তলে এত উন্নতি তোমার হয়েছে? আমি তো সেটা জানতাম না। ভালোয় ভালোয় ঠিকঠাক করে বলো। না হলে তোমার একদিন কী আমার একদিন। আমি পষ্ট জানতে চাই, কোথায় পেলে এইসব। চুরি-ডাকাতি ছাড়া তো এগুলো পাওয়ার কথা নয়। সত্যি করে বলো, কী ঘটেছে। বেকুবের মতো চুপচাপ থেকে কোনো লাভ হবে না। সত্যি কথাটা বলতেই হবে।
লোকটা তারপরও চুপ। কিচ্ছু বলছেন না। সত্যি কথাটা বলতে মানা। বৌ এদিকে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছে। তাকে ঠাণ্ডা না করলে চলছে না। কপাল মন্দ। না পেরে তিনি সব খুলে বললেন। বলেই তার খারাপ লাগতে শুরু করল।
২.
রাতটা কোনোমতে পার হলো। ঘুম তেমন হলো না। যা-ও হলো, সেটা ছেঁড়া ছেঁড়া। খুব সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠলেন তিনি। সেরকমই অভ্যেস। দীর্ঘকালের। উঠেই তিনি ভাবলেন, সকাল সকাল গঞ্জের বাজারে যাবেন। কিছু সোনাদানা বেচে সংসারের জন্য জিনিসপাতি কিনবেন। বেশ কিছুদিন হলো বাজারহাট করা হয়নি। আজ না গেলেই নয়।
লোকটা চোখ বুজে থলের ভেতরে হাত ঢোকালেন। কয়েকটা সোনার মুদ্রা বের করার জন্য। হাতের মুঠোয় যা উঠে এল, তা দেখে তিনি হতবাক। মনে হলো, মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। হায় হায়! হাতে এইসব কী?
এগুলো তো সোনাদানা নয়।
তার হাত ভর্তি কালো কালো বিচ্ছিরি ময়লা পাথর। শামুকের খোল।
জাহ্নবী