চট্টগ্রামে আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে পেঁয়াজের বাজার। খাতুনগঞ্জে সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ১৫ টাকা বেড়েছে।
বাজার এত অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে পেঁয়াজ আসছে না। গত জানুয়ারি থেকেই দেশি পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এখন দেশি পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হয়ে আসছে। তাই সরবরাহও কমে এসেছে। কৃষক প্রতি মণ (৪০ কেজি) দেশি পেঁয়াজের দাম ৫০০ টাকা বাড়িয়েছেন। এসব কারণেই পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পেঁয়াজের সরবরাহ না বাড়লে বাজার দর আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।
এদিকে আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত থেকে যদি পেঁয়াজ আনা সম্ভব না হয় তাহলে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক থেকে পণ্যটি আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে দুই মাস সময় লেগে যাবে। সবমিলিয়ে দাম আরও বাড়তে পারে। পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়াতে এখনই যদি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তাহলে জুলাইয়ের শেষে পাইকারি বাজারে ১০০ টাকার ওপরে চলে যাবে পেঁয়াজের দাম। তখন খুচরা পর্যায়ে ১২০ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনে খেতে হবে ক্রেতাকে।
চট্টগ্রামের বৃহত্তর ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে গত কোরবানির ঈদের তিন দিন আগে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৭৫ টাকায়। গত ২৫ জুন বিক্রি হয় ৮০ টাকায়। গত ২৮ জুন বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। বর্তমানে পাইকারিতেই প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ঠেকেছে আকারভেদে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়।
অপরদিকে গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ছিল ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। গত ২৮ জুন পাইকারি এ বাজারে দাম বেড়ে বিক্রি হয় ৮০ টাকায়। বর্তমানে সরবরাহ সংকট দেখিয়ে পাইকারিতেই ভারতীয় পেঁয়াজ কিনতে প্রতি কেজিতে গুনতে হচ্ছে ৯৫ টাকা।
খাতুনগঞ্জের ‘হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট’ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে যেসব দেশি পেঁয়াজ আকারভেদে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সেগুলো আগের কেনা। কোরবানির আগে প্রতি মণ পেঁয়াজ কৃষক বিক্রি করেছেন ২ হাজার ৮০০ টাকায়। কোরবানির পর দাম বাড়িয়ে কৃষক প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়। বর্তমানে কৃষক প্রতি মণ পেঁয়াজ ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আর এসব পেঁয়াজ পাইকারিতেই বিক্রি করতে হবে ৯৭ থেকে ৯৮ টাকায়।’
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে পেঁয়াজ আসছে না। অন্য দেশ থেকেও আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। তার ওপর মৌসুম শেষ হওয়ায় কৃষক কিছু পেঁয়াজ মজুত করে রাখছেন। এ সুযোগে কৃষকও বাড়তি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। তাই দেশি পেঁয়াজের দামটা বাড়তি। অপরদিকে সরবরাহ কম থাকায় ভারতীয় পেঁয়াজের দামটাও বেড়েছে।’
এদিকে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্কের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় স্থলবন্দর দিয়ে ব্যাপকভাবে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে না। আমদানিকারকরা হিসাব করে জানিয়েছেন, ভারতে বর্তমানে ছোট আকারের পেঁয়াজ ২৪ থেকে ২৫ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রামে ভারত থেকে আসা বড় আকারের পেঁয়াজের চাহিদা বেশি। আর বড় আকারের পেঁয়াজ ভারতে বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৩৫ রুপিতে।’
এই পেঁয়াজ ভারতে কৃষক থেকে বর্ডার পর্যন্ত আনতে পরিবহন ভাড়া ও শুল্কসহ খরচ পড়বে ৬০ রুপি। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দাম পড়বে ৮৪ টাকা ৬০ পয়সা (প্রতি রুপি ১ টাকা ৪১ পয়সা দরে)। বাংলাদেশে ট্যাক্স ও ভ্যাট খরচ যোগ হবে আরও ১০ টাকা। সে হিসাবে ভারত থেকে এক কেজি বড় আকারের পেঁয়াজ আনতে আমদানিকারকের খরচ পড়বে ৯৪ টাকা ৬০ পয়সা। আর এসব পেঁয়াজ পাইকার থেকে খুচরায় যেতে যে দাম হবে তা থাকবে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. মোবারক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের সব স্থলবন্দর দিয়ে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পেঁয়াজ ভারত থেকে আসার কথা। অথচ গত ১৫ দিনে সব স্থলবন্দর দিয়ে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ গাড়ি পেঁয়াজ। এটা চাহিদার তুলনায় কিছুই না। তাই ভারতীয় পেঁয়াজে সয়লাব হচ্ছে না বাজার। কারণ ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ বেশি পড়বে। জেনে বুঝে এত বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না আমদানিকারকরা।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ডিমের বাজার অস্থির করার পর এখন পেঁয়াজে চোখ দিয়েছেন। বর্তমানে খাতুনগঞ্জে যেসব পেঁয়াজ রয়েছে- তা আগের কেনা। কাজেই এখন তো দাম এত বেশি বাড়ার কথা নয়। ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাড়তি মুনাফার লোভে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বাড়িয়েছেন। কৃষক থেকে খুচরা সর্বত্র অভিযান পরিচালনার বিকল্প নেই।’