বিভিন্ন সংস্কারের কথা বলা হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। আমদানি করা পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও দেশীয় শিল্পে বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এটা অনেক কমেছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ অবহেলিতরা কী পেয়েছে?’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বুধবার (১৮ জুন) রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। নাগরিক প্ল্যাফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র গবেষণা ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেছেন, ‘একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সরকার গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাজেটে সংস্কার বাস্তবায়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে কিছু পুনর্গঠন হয়েছে। কিন্তু খুব বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের যে বরাদ্দ হয়েছে, এটাও অনেক কম। অথচ বাজেটে এবার অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল।’
হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি সঞ্জিবনী সুধা বলেন, ‘বাজেটে অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকে। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের জীবন মানের উন্নতি হয় না, কর্মসংস্থান হয় না। তাই জীবন ধারণের জন্য রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। বাজেটে এই শ্রেণির মানুষের জন্য আগেও থাকত না, এবারও তাই হয়েছে। বৈষম্যের শিকার হয়ে ব্যাংক থেকে নিজে চাকরিচ্যুত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূলধারায় আসার ক্ষেত্রে সরকার যেমন পাশে দাঁড়ায় না, আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও সহায়ক ও মানবিক না।’
রিকশা, অটোরিকশাচালক সমিতির আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, ‘আমাদের কাছে বাজেট মানেই আতঙ্ক। কারণ বাজেট ঘোষণা করা হলেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে আশাভঙ্গের বাজেট মনে হয়েছে। তাই আমরা চাই সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কারণ প্রতিনিয়ত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। জীবনের নিরাপত্তা চাই।’
প্রবাসীদের প্রতিনিধি আজমত আলী বলেন, ‘প্রবাসীরা অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও বাজেটে তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। গতবারের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য ১ হাজার ২১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও নতুন বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে ৮৫৫ কোটি টাকায় আনা হয়েছে।’
প্রতিবন্ধীদের পক্ষে সালমা মাহবুব বলেন, ‘বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা বাড়ে না। এবারের বাজেট আমাদের খুবই হতাশ করেছে। স্বাস্থ্য খাতে সুবিধা পেতে প্রতিবন্ধীদের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। প্রত্যাশা ছিল এবারে ভাতার হার বাড়বে। কিন্তু সেটাও সামান্য।’
পার্থ হেফাজ শেখ বলেন, ‘হাইজিন খাতে গত বছরের বাজেটে ১২৬ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ ছিল। এবারে কমিয়ে ১০৯ বিলিয়ন টাকায় আনা হয়েছে।’
গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী তাহমিনা রহমান বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকরা সব সময় অবহেলিত। ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি এখনো সব গার্মেন্টস কারখানা থেকে দেওয়া হয় না। অধিকাংশ কারখানা তা কার্যকর করেনি। এবারের বাজেটে এই সরকার অনেক কিছু করলেও শ্রমিকদের স্বার্থে কোনো বরাদ্দ রাখেনি।’
শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও শ্রমিক নেতা সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাজেটে কিছু ব্যাপারে হতাশা দেখা দিয়েছে। এই সরকার বিভিন্ন সংস্কারের কথা বললেও শুধু রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নতুন বাজেটে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হয়নি। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার দিকে নজর দেওয়া হয়নি। বাজেট বক্তৃতায় ১১টি অগ্রাধিকারের কথা বলা হলেও শ্রমিকদের কোনো অগ্রাধিকারের কথা নেই। শ্রমিকের অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে।’
এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘এ মুহূর্তে বড় সমস্যা হচ্ছে, প্রতিনিয়ত মানুষ কর্মহীন হচ্ছে। তাই কাজ হারা মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে।’
বাসদের রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘আমরা বাজেট বুঝি না। অবহেলিতরা অবহেলাতেই থাকছে। তাই এটাকে স্বপ্নভঙ্গের বাজেট বলা যায়। ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চায়ের দোকানে চা বিক্রি কমে গেছে।’
জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম খান বলেন, ‘ঋণের বোঝা দূর করতে জাকাতকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখতে হবে। শুধু রমজান মাস এলেই জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গির ব্যাপার আসে। এটা থেকে বেরিয়ে জাকাত রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগ্রহ করতে হবে। সংস্কারের জন্য ছয়টা কমিশন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে সুসংবাদ নেই।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সামান্তা শারমিন বলেন, ‘আমরা সামাজিক রাজনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে অর্থনৈতিক রূপান্তরও দেখতে চেয়েছি। কিন্তু বাজেটে তা নেই। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। এই বাজেটে তরুণ প্রজন্মকে অবহেলা করার প্রচ্ছন্ন ছাপ দেখা গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পরও বাজেটে বৈপ্লবিক বাজেট নেই।’
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহাদি আমিন বলেন, ‘যারা এক্সপার্ট তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও গণ-অভ্যুত্থানের চিত্র ফুটে উঠেনি। মূল্যস্ফীতির তুলনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। তাই এসব ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বাজেট প্রণয়নে তারা ডাকবে। কিন্তু করেনি। কোনো মতামত চাওয়া হয়নি। এই বাজেটে বৈষম্য আরও বাড়বে।’
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কোনো কিছু প্রত্যাশা করা ঠিক না। কিন্তু যেহেতু গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই সরকার গঠন করা হয়েছে। তারপরও আমরা বিপ্লবী বাজেট চাই না। তবে অবহেলিত জনগণ বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিকরা যাতে কিছু পায়, তা দেখার বিষয়। পরোক্ষ কর সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়ে বেশি। সেটা পরিবর্তন হয়নি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো ছাঁচের পরিবর্তন দেখছি না বাজেটে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এই বাজেট ঘোষণা করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ খুব বেশি বাড়েনি। সামাজিক, রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশ দরকার। সরকার ট্রাম্পের হুমকির কারণে অস্থির হয়ে অনেক পণ্যে শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু দেশীয় শিল্পে শুল্ক বাড়িয়েছে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।’