সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ (৩২) হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সাক্ষ্য নেওয়া ও জেরার বেড়াজালে পড়েছে।
সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নওশাদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মামলার আসামিপক্ষ সাক্ষ্য দেওয়া সাক্ষীদের দফায় দফায় জেরা করার আবেদন করায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার মুখে পড়েছে মামলাটি।
আজ (১১ অক্টোবর) আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে। তিন বছরে মামলার বিচারের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাদী ও সরকারপক্ষের আইনজীবীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
২০২০ সালের ১১ অক্টোবর ভোররাতে নগরের আখালিয়ার নেহারীপাড়ার বাসিন্দা রায়হান আহমদ বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতনের শিকার হন। রাত তিনটার দিকে রায়হানকে আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায় পুলিশ। সকাল ছয়টার দিকে রায়হানকে ফাঁড়ি থেকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হলে সাতটার দিকে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ তুলে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় ১০ হাজার টাকার জন্যে ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য রায়হানকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়।
মামলার পরপরই এসআই আকবরসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশকে নজরদারিতে রাখা হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী দুজন পুলিশ আদালতে জবানবন্দি দিলে এসআই আকবরসহ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপরই এসআই আকবর পালিয়ে ভারত চলে যান।
ঘটনার ২৮ দিন পর ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাটের ডনা সীমান্ত এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে খাসিয়াদের হাতে আটক হন আকবর। পরে তাকে বিজিবির মাধ্যমে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
মামলাটি পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। ২০২১ সালের ৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই।
অভিযোগপত্রে আকবর হোসেন ভূঁইয়া (৩২), বরখাস্ত এসআই হাসান উদ্দিন (৩২), বরখাস্ত এএসআই আশেকে এলাহী (৪৩), বরখাস্ত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস (৩৮), বরখাস্ত কনস্টেবল হারুন অর রশিদ (৩২) ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বড়দেও গ্রামের আব্দুল্লাহ আল নোমান (২৬) নামের এক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে বরখাস্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চারজন কারাবন্দি। একজন জামিনে মুক্ত। আসামি নোমান পালিয়ে বিদেশ চলে যান।
বাদীপক্ষের আইনজীবীদের মাধ্যমে জানা গেছে, মামলার মোট ৬৯ সাক্ষীর মধ্যে ৫৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আসামি হারুন অর রশিদের আইনজীবী পুরাতন ২৭ সাক্ষীকে নতুন করে জেরা করার জন্য আদালতে আবেদন করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার আদালতে জেরা হবে।
নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, আকবরসহ আসামিরা পুলিশ সদস্য হওয়ায় নানা ছলচাতুরী চলছে। বিচার বিলম্বিত করতে আসামিপক্ষের চেষ্টা চলমান আছে। আলামত নষ্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ করেও আসামিরা জামিন পাচ্ছে। প্রধান আসামি আকবরও জামিন নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আকবর জামিনে বের হলেই আবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশ চলে যাবেন। এমন কথা শোনা যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমি বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত চাই।
পুরাতন সাক্ষীকে নতুন করে জেরা করা হলে মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা স্বাভাবিকভাবে তৈরি হবে বলে মনে করছেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নওশাদ আহমদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, পুরাতন সাত সাক্ষীর জেরা শেষে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়ার কথা। এই সাক্ষ্য নেওয়ার মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার সাক্ষ্য নেওয়া সম্পন্ন করবে রাষ্ট্রপক্ষ।