রাজধানীর বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মে নিয়োজিত ৮৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী স্কুলে যায় না, অথচ ৫৫ দশমিক ১১ জীবনের কোননা কোন পর্যায়ে স্কুলে গিয়েছিলেন। এছাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয় বলে ঢাকা শহরে গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুদের বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এদিকে গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে দ্রুত গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন পাসের তাগিদ দেয় আলোচকরা।
মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তাগিদ দেয় আলোচনায় অংশ নেওয়া সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে গবেষণা ফলাফল তুলে ধরেন এএসডি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইউ কে এম ফারহানা সুলতানা।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ৮৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু বর্তমানে স্কুলে যাচ্ছে না। বর্তমানে যারা স্কুলে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ (৯৩.০৪%) বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত স্কুলে পড়ছে। ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু কাজের ব্যস্ততা তাদের শিক্ষার প্রধান অন্তরায়। অথচ ৫৫ দশমিক ১১ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু জীবনের কোনোনা কোন পর্যায়ে স্কুলে গিয়েছেন। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা কখনো স্কুলে যায়নি তাদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ খন্ডকালীন কাজে এবং ১৩ দশমিল ০৭ শতাংশ পূর্ণকালীন কাজে নিযুক্ত।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৪৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু তাদের পরিবারের সহায়তার জন্য বাধ্যতামূলক প্রয়োজনের গৃহকর্ম যোগ দেয়। এছাড়াও, ২২.ল দশমিক ৯৭ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন, কারণ তাদের পরিবার শিক্ষা ব্যয় বহন করতে অক্ষম। অপরদিকে ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশু পারিবারিক ঋণ শোধ করার জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এছাড়া ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুর বাবা-মা বা অভিভাবক নেই, যার কারণে তারা বেঁচে থাকার জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে।
এতে দেখা যায়, রাজধানীতে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশের নির্যাতিত শিশুর মধ্যে শারীরিক আঘাতের শিকার ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ, মারধরের শিকার ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ, বকাঝকার শিকার ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের শিকার ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ গৃহকর্মী অত্যাধিক কাজের চাপে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, ‘গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালা সংশোধনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। গৃহকাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদ্যমান নীতিমালা ও আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির করতে হবে। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার শিশুদের স্বাস্থ্য ও আইনি সেবাদান কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক পরিচালিত ২০২২ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১.৭৭ মিলিয়ন শিশু শ্রমিক রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১.০৬ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিযুক্ত হবে। ধূইকাজে নিয়োজিত শিশুদের এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকার ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করেছে। তবে নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন না থাকায়, প্রাপ্তবয়স্ক এবং গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুরা এই নীতির সুবিধা পাচ্ছে না।
আলোচনায় বিগত সরকার নীতিমালা প্রণয়ন করলেও সেই নীতিমালা গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছে না, বলে মনে করেন আলোচকরা৷ এর পাশাপাশি গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ করেন তারা।
আইনের খসড়া প্রণয়ন হয়েছে শিগগিরই তা চূড়ান্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক ও শিশু অধিকার কমিটির সদস্য সচিব এম. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষায় মানবাধিকার সবসময় সক্রিয় আছে। শিশু নির্যাতনের ঘটনা বন্ধে সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চলছে। নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইন প্রণয়নে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রণয়ন হয়েছে, দ্রুতই তা চূড়ান্ত হবে বলে আশা করি।’
শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যে ৪৩টি কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে, এর পাশাপাশি গৃহকর্মকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে উল্লেখ করে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. তরিকুল আলম বলেন, ‘গৃহকর্মী শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা সবসময় অঙ্গীকারবদ্ধ। অনেক আগে থেকে শিশু শ্রমিক নির্যাতন চলে আসছে তবে এটা সত্য আগের তুলনায় শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন অনেকাংশেই কমে এসপছে। আমরা চাই, এটা শতভাগ বন্ধ হোক। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যে ৪৩টি কাজ চিহ্নিত করা আছে, তার সঙ্গে গৃহকর্মকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
এতে এএসডি’র নির্বাহী কমিটির সভাপতি ড. আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে অন্যান্যদের মধ্যে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) ডা. বিশ্বজিত রায়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোছা. সালমা আক্তার, শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক এস এম এনামুল হক, এএসডি’র নির্বাহী পরিচালক এম এ করিম, স্ক্যান সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মুকুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
আরিফ জাওয়াদ/এমএ/