জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজের সামনে নিহত হন ইলেকট্রিশিয়ান শাওন সিকদার। সেই ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ৪০ জনের নামে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। এ মামলার ২৩ নম্বর আসামি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষি খাতে অলিখিত গডফাদার এম সাইদুজ্জামান।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঠেকাতে গত বছরের ৪ আগস্ট তার (সাইদুজ্জামানের) অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতায় খামারবাড়িতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাস্তায় শোডাউন করেন কৃষিবিদরা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী সেই এম সাইদুজ্জামান গত ১১ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত একটি কর্মশালায় যোগ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। ইতোমধ্যে কর্মশালায় যোগ দেওয়া তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বালাইনাশক বিধিমালা-২০২৫ প্রণয়নবিষয়ক এই কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম। কর্মশালা আয়োজনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপকরণ শাখা-২ থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র সহকারী সচিব নাইমা আফরোজ ইমাম একটি নোটিশ ইস্যু করেন। এতে অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) সভাপতিকে কর্মশালায় যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়।
এই সংগঠনের (বিসিপিএ) সভাপতি এম সাইদুজ্জামান। কৃষি খাতে কীটনাশকসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান পেস্টিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির (পিটাক) সদস্যও এম সাইদুজ্জামান। পিটাকের সভাপতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান। সদস্যসচিব হিসেবে থাকেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার (মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত, ঢাকা, সিআর মামলা নং ২৩/২০২৪-লালবাগ) একজন আসামি সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় কীভাবে অংশ নেন? এমন প্রশ্নের জবাবে গত মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান খবরের কাগজকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, তার (পেস্টিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য এম সাইদুজ্জামান) বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। যদি তেমন কিছু প্রমাণিত হয় তবে এই কমিটি রিভিউ করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির আশীর্বাদপুষ্ট এম সাইদুজ্জামান কৃষি খাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। সাইদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ট্যাক্স ফাঁকি ও জালিয়াতি এবং অননুমোদিত সোর্স থেকে নিম্নমানের বালাইনাশক আমদানি করেছেন। এ ছাড়া সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে দেশে কৃষি খাতের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বালাইনাশক আমদানি ও সরবরাহে মনোপলি করা হয় তার নেতৃত্বে। একইভাবে তিনি স্বল্প মূল্যের বালাইনাশক আমদানি করে চালানে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং মিমপেক্স অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কোম্পানির মালিক এম সাইদুজ্জামান রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতি কেজি ক্ষতিকর ওয়ান্ডার ৫ ডব্লিউডিজি ৯৯০ টাকা দামে আমদানি করে বিক্রি করেছেন ৫ হাজার ৪০০ টাকায়। এভাবে বাজার থেকে লুটে নিয়েছেন কৃষকের বিপুল অর্থ। তার মালিকানাধীন মিমপেক্স অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কোম্পানির বালাইনাশকে কেমিক্যালের অস্তিত্ব না পাওয়ায় ভুক্তভোগী মামলা করেন এবং সেই মামলায় জেল খাটেন এম সাইদুজ্জামান।
অবশ্য এ বিষয়ে মিমপেক্স অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কোম্পানির মালিক এম সাইদুজ্জামান এর আগে খবরের কাগজকে জানিয়েছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা সবই মিথ্যা। ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং ব্যবসায়ী হিসেবে আমার সুনাম নষ্ট করতে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী।’