পবিত্র কোরআন ও ইসলামবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র নেতারা। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তারা বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার মতো ভুল করবেন না। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো নীতি বাস্তবায়ন করার সাহস করবেন না।’
শনিবার (৩ মে) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চার দফা দাবিতে আয়োজিত মহাসমাবেশ থেকে এই আহ্বান জানান নেতারা। সকাল ৯টার দিকে মহাসমাবেশটি শুরু হয়। বেলা সোয়া একটার দিকে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয় মহাসমাবেশ। হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে ১২ দফা দাবি উত্থাপন করেন হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মাহফুজুল হক।
মহাসমাবেশে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘দেশে ইসলামবিরোধী গোষ্ঠী আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সম্প্রতি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন কোরআনবিরোধী প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সাম্রাজ্যবাদের ফান্ডখোর কুখ্যাত নারীবাদীরা এদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিধি-বিধান, ঐতিহ্য ও পরিবারকাঠামো ধ্বংস করার পাশ্চাত্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে। আমরা হুঁশিয়ারি করে বলতে চাই, এনজিওবাদী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না, যা কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে যায়। এক্ষেত্রে আমরা কোনো ছাড় দেব না। এই বিতর্কিত কমিশন ও কোরআনবিরোধী প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিল করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার আলেম-ওলামার পরামর্শ নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করুন।’
তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এমন একটি বিভেদমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে কাউকে গুম-খুন, জেল-জুলুম এবং পুলিশি নির্যাতন করা হবে না। গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দালালদেরও বিচার করা হবে। আমরা এ দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হেফাজতের এই সমাবেশ উল্লেখ করে সংগঠনের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে বলতে চাই, অবিলম্বে জনগণের দাবি মেনে নিন। পবিত্র কোরআন ও ইসলামবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বিরত থাকুক। এসব দাবি আদায়ে আমরা আন্দোলন করব, সংগ্রাম করব, প্রয়োজনে জেহাদ করব।’
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘একাত্তর সালে মুক্তিযোদ্ধারা বলেছিলেন, আমরা পিন্ডির গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করেছি, দিল্লির দাসত্ব করার জন্য নয়। ২৪-এর জুলাইয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর আমি বলতে চাই, আমরা দিল্লির দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছি নিউ ইউর্কের গোলামি করার জন্য নয়। যদি বাংলাদেশকে ওয়াশিংটনের দাসে পরিণত করার কোনো চক্রান্ত করা হয়, হিউম্যানিটেরিয়ান করিডরের নামে বাংলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হরণ করার জন্য অপতৎপরতা চালানো হয়, তাহলে সারা দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান থাকবে, দেশের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিন।’
নেতা–কর্মীদের নামে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলছি, আগামী দুই মাসের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। সব নেতা–কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।’
সমাবেশে ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় নেতা জৌনপুরের সাইয়্যেদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী বলেন, ‘অসংখ্য আলেম-ওলামাকে জঙ্গি তকমা দিয়ে কারাগারে রাখা হয়েছে। যদি বাবর সাহেব (লুৎফুজ্জামান বাবর) মুক্তি পান, আলেম সমাজ কেন মুক্তি পাবে না। তাদের মুক্তির আগে সংস্কার নয়, নির্বাচনও হতে দেওয়া হবে না।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ড. ইউনূস কয়েক দিন আগে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেবে কি না এ সিদ্ধান্ত তাদের। ড. ইউনূস ভুলে যাবেন না আপনাকে আমরা ক্ষমতায় বসিয়েছি। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে কি করবে না, আসবে কি আসবে না- এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। আওয়ামী লীগ মারা গেছে বাংলাদেশে আর জানাজা হয়েছে দিল্লিতে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাই হবে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সংস্কার। এখানে কিন্তু-যদি-অথবা নেই। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতেই হবে।’
দুটি কর্মসূচি ঘোষণা
মহাসমাবেশ থেকে নতুন দুটি কর্মসূচির ঘোষণা দেন মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। এগুলো হলো- নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিন মাসের মধ্যে বিভাগীয় সম্মেলন এবং আগামী ২৩ মে বাদ জুমা চার দফা আদায়ে বিক্ষোভ মিছিল।
১২ দফা দাবি
সমাবেশ থেকে ১২ দফা দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নায়েবে আমির মাওলানা মাহফুজুল হক। এগুলো হলো: নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন এবং তাদের কোরআনবিরোধী প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিলপূর্বক আলেম-ওলামার পরামর্শক্রমে ধর্মপ্রাণ বৃহত্তর নারীসমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিশন গঠন করে বাস্তবমুখী সংস্কারের দিকে যেতে হবে। সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করতে হবে এবং ধর্মপ্রাণ গণমানুষের ঈমান-আমল রক্ষার্থে ‘বহুত্ববাদ’ নামক আত্মঘাতী ধারণা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে এ ছাড়া ‘লিঙ্গ পরিচয়’, ‘লিঙ্গ বৈচিত্র্য’, ‘লিঙ্গ সমতা’, ‘লিঙ্গ বৈষম্য’, ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ (বা থার্ড জেন্ডার), ‘অন্যান্য লিঙ্গ’ ইত্যাদি শব্দের মারপ্যাঁচে ট্রান্সজেন্ডারবাদের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমাজবিধ্বংসী ও ধর্মবিরুদ্ধ সমকামী-বান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর নামে কটূক্তি ও বিষোদ্গার বন্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির আইন এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের ধর্ম অবমাননার শাস্তি সংক্রান্ত আইনি ধারাগুলো বাতিলের সুপারিশ বাদ দিতে হবে। চট্টগ্রামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে শহিদ সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার উসকানিদাতা চিন্ময় দাসের জামিন প্রত্যাহারপূর্বক তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সারা দেশে প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও ইসলামমনা তরুণদের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা ও বানোয়াট মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করতে হবে এবং ‘জঙ্গি নাটক’ বা ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলে আলেম-ওলামার ওপর যারা গত ১৫ বছর নির্যাতন ও গুম-খুন চালিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
গাজার মুসলমানদের ওপর অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা ও ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের সরকারকে কূটনৈতিকভাবে আরও উচ্চকণ্ঠ হতে হবে এবং দেশের সর্বস্তরে জনতাকে ইসরায়েলি ও ভারতীয় পণ্য বয়কট করতে হবে। শাপলা ও জুলাই গণহত্যার বিচারে গতি আনতে ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা এবং জাতীয় নির্বাচনের আগেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার চিহ্নিত দোসরদের বিচার শেষ করতে হবে।
গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাদের সব ধরনের কার্যক্রম ও তৎপরতা নিষিদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাখাইনকে ‘মানবিক করিডর’ প্রদানে সরকারের সম্মত হওয়া সম্পূর্ণরূপে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত- আমাদের ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে।
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশি মিশনারীদের অপতৎপরতা ও দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং সামরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও বৃদ্ধি করা ছাড়াও পাহাড়ি বাঙালি ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থিতি নির্মাণে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করতে হবে এবং তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রমুখ।