এইচএসসি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু এটা জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শেখার ক্ষমতা, মানসিক স্থিতি, মূল্যবোধ, পরিশ্রম এবং পরিবার থেকে পাওয়া আস্থা। যেকোনো ভালো ফল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল কোনো সম্ভাবনাময় জীবনের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয় না।...
২ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর জন্য এটা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, এটা কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রতি বছর এ সময় পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নের ধরন, কোচিং, সাজেশন কিংবা সম্ভাব্য ফল নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়–পরীক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা।
এই বয়সের ছেলেমেয়েদের আমরা প্রায়ই ভুল বুঝি। তারা নিজের মতো থাকতে চায়, সিদ্ধান্ত নিতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। বাইরে থেকে দেখে অনেক অভিভাবকের মনে হয়, সন্তান বুঝি পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ মনোবিজ্ঞান বলছে, কৈশোর এমন একটি সময় যখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক নিরাপত্তার প্রয়োজন–দুটোই একসঙ্গে কাজ করে। সন্তান স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু একা হতে চায় না, সে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে চায়, আবার সংকটের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি খোঁজে পরিবারের আশ্রয়।
কিশোর বয়স মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল মানসিক পরিবর্তনের সময়। এই বয়সে আবেগ দ্রুত ওঠানামা করে, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, বন্ধুদের প্রভাব গভীর হয়, আবার পরিবারের গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তাবোধও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আচরণগত সমস্যার বড় অংশের সূচনা ঘটে কৈশোরেই। তাই এই বয়সকে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় হিসেবে নয়, বরং মানসিক বিকাশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপের লক্ষণ বহন করে। অর্থাৎ তিনজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য মানসিক চাপে থাকে। গবেষণায় আরও দেখিয়েছে, অভিভাবকের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক, অতিরিক্ত শিক্ষাগত চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপ মানসিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থাৎ শুধু পড়াশোনার চাপ নয়, পারিবারিক সম্পর্কের গুণগত মানও একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই গবেষণার ফল আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। পরীক্ষার আগে সন্তানকে আরও বেশি পড়তে বলা, আরও বেশি কোচিং করানো কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন তাকে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করানো। কারণ পরীক্ষার হলে সে একাই বসবে, কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।
কৈশোরের মনোবিজ্ঞান এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়। এই বয়সে মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশ পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটির পূর্ণ বিকাশ তখনো সম্পন্ন হয় না। অন্যদিকে আবেগ, কৌতূহল এবং পুরস্কারের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত অংশ অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে একজন কিশোর বা কিশোরী একই সঙ্গে যুক্তিবাদী ও আবেগপ্রবণ, আত্মবিশ্বাসী ও অনিশ্চিত, স্বাধীনচেতা ও নির্ভরশীল–সবকিছুই হতে পারে। এই আচরণকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি স্বাভাবিক বিকাশের অংশ।
বাংলাদেশে অভিভাবকদের বড় অংশ সন্তানের নীরবতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। সন্তান নিজের ঘরে বেশি সময় কাটালে মনে করা হয় সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে বেশি কথা বললে মনে করা হয় বাবা-মায়ের আর প্রয়োজন নেই। অথচ গবেষণা বলছে, এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা বন্ধুদের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, সংকটের মুহূর্তে তারা এখনো পরিবারের স্বীকৃতি, সমর্থন এবং নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে। পরিবারে নিরাপদ সম্পর্ক থাকলে তাদের উদ্বেগ, হতাশা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনাও কমে যায়।
পরীক্ষাকেন্দ্রিক আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। পরীক্ষাকে আমরা প্রায়ই জীবনের চূড়ান্ত বিচার হিসেবে দেখি। ফল প্রকাশের আগেই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনা শুরু হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা মনে করে, তাদের মূল্য যেন জিপিএ বা নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। যেকোনো পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট সময়ের প্রস্তুতির মূল্যায়ন করতে পারে, কিন্তু তার সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সহমর্মিতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারে না। ইতিহাসে অসংখ্য সফল মানুষের জীবনে পরীক্ষার ফল কখনোই চূড়ান্ত পরিচয় হয়ে থাকেনি।
এখনকার পরীক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আগে পরীক্ষার পর আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত বন্ধুদের মধ্যে। এখন পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন, উত্তর, বিশ্লেষণ, গুজব এবং তুলনার ঝড়-বন্যা বয়ে যায়। ইউনিসেফের বাংলাদেশে পরিচালিত প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে এক জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ, নেতিবাচক মন্তব্য ও অনলাইন বুলিং, এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট তরুণদের মানসিক চাপের বড় উৎস। একই জরিপে অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহণকারী ক্ষতিকর আচরণ ঠেকাতে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এ কারণেই পরীক্ষার সময়ে সন্তানকে শুধু অফলাইনে নয়, অনলাইনেও মানসিকভাবে সহায়তা করা জরুরি। ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা, অন্যের নম্বরের সঙ্গে তুলনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয়–এসব থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।
ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ এখন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। Mental Health Act 2018, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্কুলভিত্তিক Mental Health and Psychosocial Support (MHPSS) কর্মসূচি চালু হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমেও শিক্ষার্থীদের সামাজিক-মানসিক দক্ষতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে কোনো নীতিমালা পরিবারের বিকল্প হতে পারে না। একজন শিক্ষকের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর যোগাযোগ দিনের কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু একজন বাবা-মায়ের উপস্থিতি তার জীবনের প্রতিটি স্তরে।
এইচএসসি পরীক্ষার আগে তাই অভিভাবকদের প্রতি কয়েকটি অনুরোধ।
সন্তানকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। পরীক্ষার আগের রাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবেন না। পরীক্ষা শেষে প্রথম প্রশ্নটি যেন না হয়-‘কত নম্বর পাবে?’ বরং জিজ্ঞেস করুন–‘আজ কেমন লাগল?’ ফল প্রকাশের দিনও মনে রাখুন, সন্তানের প্রয়োজন বিচারক নয়, সহযাত্রী।
যেকোনো পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন সন্তান জানে–সাফল্যে যেমন অভিনন্দন মিলবে, ব্যর্থতায়ও ভালোবাসা কমবে না।
এইচএসসি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু এটা জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শেখার ক্ষমতা, মানসিক স্থিতি, মূল্যবোধ, পরিশ্রম এবং পরিবার থেকে পাওয়া আস্থা। যেকোনো ভালো ফল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল কোনো সম্ভাবনাময় জীবনের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয় না।
এই ২ জুলাই যখন লাখো শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে যাবে, তখন তাদের হাতে থাকবে কলম, প্রবেশপত্র এবং স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে একটি বাক্য–‘ফল যা-ই হোক, আমরা তোমার পাশে আছি।’ এই বাক্যটিই হবে একজন পরীক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক