’৫২ থেকে ২০২৪- একটা জাতির জীবনে ৭২ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। ৭২ বছরের অনেকগুলো বছর আবার আমাদের পাকিস্তানি নব্য উপনিবেশিকদের শাসনাধীনে কেটেছে। এই পুরো সময় ২১ ফেব্রুয়ারি একটা প্রেরণা দিয়ে গেছে। ‘১৯৫২ থেকে ৭১’ পর্যন্ত আমাদের জাতীয় জীবনে যতগুলো ঘটনা ঘটেছিল তার পেছনে একুশে ফেব্রুয়ারির একটা প্রেরণা ছিল। আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ভাষা, আমাদের পরিচিতি সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং তাই হয়েছে। আমাদের দেশটাকে আমরা যেভাবে ভেবেছিলাম স্বাধীন করব, সেভাবেই স্বাধীন করতে পেরেছি। যদিও তার পেছনে বহু রক্ত রয়ে গেছে। বহু নারীর বেদনা সেখানে পুঞ্জিভূত হয়েছে। তারপরও দেশটা স্বাধীন হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রে একুশের প্রেরণা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। সেই প্রেরণাটা আমাদের আত্মশক্তি জাগানোর, আত্মবিকাশের এবং জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা দেওয়ার। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা এবং প্রতিবছর, প্রতিদিন সেগুলো নবায়ন করা। প্রতিবছর যখন একুশে ফেব্রুয়ারি আসে সেই নবায়নের কাজটা আমাদের করতে হয়।
স্বাধীনতার শুরুতে আমাদের আকাঙ্ক্ষা খুব তীব্র ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলো। এরপর এক ধরনের রাষ্ট্রচিন্তা ফিরে এল, যেটি পাকিস্তানের চিন্তার অনুবর্তী। আমরা সেই জিন্দাবাদ ধ্বনি আবার ফিরিয়ে আনলাম। পাকিস্তানের সময় আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সেটা আবার কেন জানি ফিরে এল। এটি তখন আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছিল। পুরো আশির দশকে বাঙালি জাতির প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেল এই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য। তার মানে আমাদের একটা অকারণ পরিশ্রম করতে হলো।
এই সময়টা আমরা বাংলা ভাষার বিকাশের জন্য কাটাতে পারতাম। শিক্ষার উন্নতির জন্য কাটাতে পারতাম। আমাদের ভবিষ্যৎকে সুন্দরভাবে সাজানোর চিন্তাগুলো আমরা নতুন করে বিন্যস্ত করতে পারতাম। সেই কাজগুলো করা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে গেল। যখন রাষ্ট্র এ ধরনের উদ্যোগের পক্ষে দাঁড়ায় না, তখন ব্যক্তি মানুষগুলোর পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না। তখন রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের যে বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা অগ্রসর হচ্ছিলাম সেগুলো আবার ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা হয়েছিল ’৫২ সালের পর থেকে। আমাদের জাতিসত্তা নির্মাণের জন্য ঐতিহ্য এবং কৃষ্টি অবিরাম গ্রহণ করার একটা অনিবার্যতা সৃষ্টি করেছিল, সেটি আবার নতুনভাবে দেখা দিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, ’৮১ সালে যখন দেশে ফিরে দেখলাম একুশে ফেব্রুয়ারি তার মহিমা ফিরে পেয়েছে, শহিদ মিনারে সবাই সমাবেত হচ্ছে এবং একুশে উদযাপনটা যখন নতুন মাত্রা নিয়ে এল, যখন দেখলাম যে চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন হলো, তখন বুঝতে পারলাম একুশের প্রভাব এই শোভাযাত্রাকে তৈরি হতে সাহায্য করেছে।
যখন ভাষার প্রশ্নে আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম, আমাদের বাঙালিয়ানা এবং সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রসঙ্গে যখন আমরা আবার দাঁড়িয়ে গেলাম, তখন সেখানে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল। এই পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে আমাদের দেশে, বারবার গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি, আবার হারিয়েছি। গণতন্ত্রের চর্চাটা আমরা অব্যাহতভাবে ধরে রাখতে পারিনি। আমাদের অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষা এখনো সেই মাত্রা অর্জন করতে পারেনি; যা একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। আমাদের ভিতর অন্তঃকলহ প্রচুর। আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি খুব কণ্টকাকীর্ণ। আমাদের শ্রেণিগত, বিত্তগত বৈষম্য বিশাল। আমাদের দেশে দারিদ্র্য এখনো একটি ভয়ানক অবস্থা করে রেখেছে। আমাদের দেশে শিশুরা এখনো তাদের সব অধিকার পায়নি। অনেক সমস্যা আমাদের আছে কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের একটা সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইতিহাসটুকু বলার কারণ, আজকে যারা তরুণ, হয়তো এই শতাব্দীতে জন্ম নিয়েছে অনেকে, হয়তো তারা বাংলাদেশের ইতিহাসটা তেমন জানে না। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস একদিনে তৈরি হয়নি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পেছনে যে বিনিয়োগ ছিল তা অনেক জাতিই দিতে পারেনি। অনেক রাষ্ট্র নির্মাণের পেছনে এই বিনিয়োগ থাকে না। এত বড় বিনিয়োগ দিয়ে আমাদের রাষ্ট্রকে কেন আমরা বসবাসযোগ্য করব না প্রত্যেকের জন্য?
একুশে ফেব্রুয়ারি একটা প্রতিবাদের নাম। একুশে ফেব্রুয়ারি এক অনুভূতির নাম। এক আবেগের নাম, যা অনুধাবন করছে আমার জাতিসত্তা, আমার সংস্কৃতি, আত্মপরিচিতি প্রতিষ্ঠার অনুভবের নাম। এখন যারা তরুণ তাদের আমি একটাই অনুরোধ জানাব, মাতৃভাষাকে বিকশিত করতে হবে। সঙ্গত কারণেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অর্থাৎ আমাদের দেশে যেসব মাতৃভাষা আছে প্রত্যেকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একুশে ফেব্রুয়ারি একটা অঙ্গীকারের নাম। মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মাতৃভাষাভাষী যে জনগোষ্ঠী তাদেরও প্রত্যেকের জীবনমান উন্নত করার একটা অংশ।
আমি মনে করি, তরুণদের এই প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে যে, তাদের জীবনে এটি শহিদ ভাষা দিবস, যারা ভাষার প্রশ্নে শহিদ হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগে আমরা স্বাধীনতা পর্যন্ত আসতে পেরেছি। স্বাধীনতার পরেও আমরা নির্মাণ করেই চলছি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠা হয়েছে। পৃথিবীর সব মাতৃভাষাকে সুরক্ষা দিয়ে, তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার, সুরক্ষা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সে দিবসটিকে আমরা যেন আমাদের কাজের ভিতর ধারণ করি, যেন ভাষার প্রশ্নে আমরা অনেক যত্নশীল হই। মাতৃভাষাকে লালন করা, এই ভাষাকে যেন আমরা উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি। সেই সুযোগ এবং সম্ভাবনা তৈরি করা প্রত্যেক মাতৃভাষা ব্যবহারকারীর সুরক্ষা দেওয়া আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সংস্কৃতিকে যেন আমরা লালন করি, বাইরের সংস্কৃতি অবশ্যই আমরা গ্রহণ করব। আমাদের নিজস্ব যে সংস্কৃতি, সেই সংস্কৃতি যেন একটা গ্রহণযোগ্য রূপে অর্থাৎ শুদ্ধ রূপে তুলে আনি, আমাদের সেই প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
এখন বহু সংস্কৃতির যুগ। সেই বহু সংস্কৃতির মিলনকেও আমরা উৎসাহ দেব। অভিনন্দন জানাব। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি যেন না হারিয়ে যায়, সেটি দেখতে হবে। আমাদের ভাষাকে ক্রমাগত আমরা শক্তিশালী করব। আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিখব। আমরা ইংরেজি, ফরাসি শিখব, আমরা সেই ভাষাগুলোর যত্ন করব। কারণ সেই ভাষাগুলোও আমাদের বিশ্বের সম্পদ। কিন্তু সেই ভাষার প্রভাবে যেন আমাদের ভাষা হারিয়ে না যায়। আমাদের এগুলো সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। সবশেষে যে কথাটি বলা দরকার তা হলো, একটা জাতির পরিচয়সূচক এই ভাষাকে অবহেলা করা উচিত নয়। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে গর্বিত বাঙালি হই, আমাদের মাতৃভাষাকে সেই গর্বের প্রধান অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে হবে এবং এই কাজটি যদি আমরা করতে পারি তাহলে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা অন্তত কিছুটা হলেও পরিশোধ করতে সক্ষম হব।
লেখক: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক