সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা- কবি এই কথাটা বলার কারণ, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথম উপাদান অন্ন, তারপর বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথম উপাদান অন্ন উৎপাদন করেন কৃষক। কৃষক হাসলে হাসবে দেশ, ফল-ফসলে ভরে উঠবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কৃষকরা দেশের সুদিন ও দুর্দিন সব সময় দেশের অর্থনীতির মূল খাত কৃষিকে আরও আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষাবাদ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কাজে নিয়োজিত থাকে। আমরা দেখছি করোনাকালীন কৃষি বাদে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কর্মহীন হয়ে বেহাল অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। সরকারি কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সব পেশাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ঝড়ঝাপ্টার পরও আমাদের কৃষক ভাইয়েরা মরণের ভয়কে উপেক্ষা করে কৃষিকাজ চালিয়ে রেখেছিলেন। যার কারণে খাদ্যের অভাবে বাংলাদেশের মানুষ তেমন পড়েনি। যে পেশার লোকজন একটা দেশের খাদ্য উৎপাদনে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেন তাদের চেয়ে বড় আর কে হতে পারে? দেশ স্বাধীনের সময় যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশে স্বাধীন করেছে তারা আজ দেশ বা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাও একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করেছিল তারা। কিন্তু যে সম্প্রদায়ের লোকজন বছরের পর বছর একটা জাতির খাদ্যাভাব দূর করার জন্য দিনরাত বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন তাদের সম্মান কি মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে কম? তারাই হলেন আমার দেশের অর্থাৎ বাঙালি জাতির আসল শ্রেষ্ঠ সন্তান।
বাংলার প্রতিটি বিপদে এই কৃষি ছিল আমাদের ভরসার নাম। আজ যখন বিশ্ব অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে। সবকিছুর সূচক যখন নেমে গেছে, তখনো আমাদের একটাই আশা ও ভরসা হলেন এই কৃষি ও চাষা। বাংলার সোনা ফলা মাটি এটা বলতে পারবে তার সন্তানরা না খেয়ে মরবে না। এবারও কিন্তু বাম্পার ফলন বাংলাদেশে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব ’৭৪ সালে আমরা খাদ্যাভাবে পড়েছি। সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কোনো খালি জায়গা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। ফলে ’৭৫-এ ভালো ফসল হয়ে ছিল। এরপর আবার ৮৮ বন্যার পর দেশে ভালো ফলন হয়েছিল। ৯০ দশকে কৃষিতে এক বৈকল্পিক উন্নতি সাধিত হয়। প্রচলিত ধানের বদলে ইরি বিরি চলে আসে। বাড়তে থাকে ফলন, একই জমিতে একাধিক আবাদ।
বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ঘাটতি ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়াদির মধ্যেই সুখবর পাওয়া গেল যে, বোরোর উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায় বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই বারবার বলা হয়, দেশের কৃষক বাঁচান দেশ বাঁচবে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য দিন। যে সরকার কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে ব্যর্থ তাদের তুলনা চলে একমাত্র নীলকরদের সঙ্গে। আমরা এ দেশে তেমন শাসক চাই না। আমাদের সরকার বাহাদুর অনেক কিছুই করেন কৃষকের জন্য… কী করেন। ঋণ দান, সামান্য কিছু ভর্তুকির বিপরীতে ধান চালের যে দর বেঁধে দেন তাতে তাদের সারা বছরের উৎপাদন খরচই ওঠে না, শ্রমের মূল্য তো দূরের কথা।
আমরা যে চাল কিনি ৫০ টাকায় কৃষক তার মূল্য পান অর্ধেকটা মাঝখানে পুরোটাই খেয়ে নেয় মধ্যস্বত্বভোগী আর দালালরা। কৃষক কি পান? সরকার তার কর্মচারীদের উত্তরোত্তর বেতন বৃদ্ধি করছে। করুক সমস্যা নেই। ব্যবসায়ীরা পণ্য মূল্যবৃদ্ধি করে লাভ নিশ্চিত করছে, করুক। কিন্তু কৃষক তো আর তা পারছেন না। কৃষককে তাকিয়ে থাকতে হয় সরকার কত টাকা মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে তার ওপর। সরকার লক্ষ রাখে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে আবার গণ-অসন্তোষ যাতে না দেখা দেয়। উভয় চাপে পড়ে কৃষক চিড়ে চ্যাপ্টা। সরকারকে যখন গণ-অসন্তোষ মাথায় রেখেই নীতি নির্ধারণ করতে হচ্ছে তখন তারা কৃষকের জন্য ফ্রি চিকিৎসা কার্ড, ফ্রি যাতায়াত সুবিধা, তাদের সন্তানদের জন্য ফ্রি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করছে না কেন? কৃষক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান কারণ তারাই অন্নের জোগানদাতা। কৃষককে মাথায় করে রাখুন। তাতে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবরে পড়বে না বরং দেশের অগ্রগতি আরও গতিশীল হবে। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু প্র্যাকটিকাল কাজ করতে হবে। প্যান্ট-শার্ট-কোট একটু খুলতে হবে। তা না হলে কৃষিবিপ্লব করা যাবে না। বাংলাদেশে প্যান্ট-শার্ট-কোট ছেড়ে মাঠে না নামলে বিপ্লব করা যাবে না, তা যতই লেখাপড়া করা যাক, তাতে কোনো লাভ হবে না।
গ্রামে গিয়ে আমার চাষি ভাইদের সঙ্গে বসে প্র্যাকটিকাল কাজ করে শিখতে হবে। কৃষি ও কৃষকের প্রতি তার যে হৃদয়ের গভীর টান ছিল সেটা সেদিনের ভাষণে ফুটিয়ে তুলেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। এ দেশের ৯০ শতাংশ কৃষক গ্রামে বাস করে। প্যান্ট-শার্ট ও কোট পরা লোকদের গ্রামের দিকে যেতে হবে। আমরা অর্থনীতি যদি গণমুখী করতে না পারি এবং গ্রামের দিকে যদি না যাওয়া যায়, সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না, কৃষিবিপ্লব হবে না।
কৃষি ও কৃষকের প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর মমত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল। সেজন্যই তিনি সব সময় দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা গঠনে কৃষি ও কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত কৃষিবিদদের কল্যাণে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গোটা কৃষিব্যবস্থাকে ব্যাপক আধুনিকীকরণ ও লাগসই উন্নয়নে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু কৃষি ও কৃষকের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করে গেছেন, তা সত্যিই আমাদের কৃষিবিদদের জন্য বিশাল গর্বের। আর এজন্যই ‘বঙ্গবন্ধুর মহান দান, কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ স্লোগানটি এ দেশের প্রতিটি কৃষিবিদের অনুভূতিতে মিশে আছে।
এ জীবনে যত তর্ক করেছি তার অধিকাংশই চালের দাম নিয়ে, চালের দাম এত বাড়ল কেন এই নিয়ে। যারা এই কুতর্কটা জুড়ে দেন তাদের অধিকাংশ শিক্ষিত যদিও ওদের আমরা মূর্খ শয়তান বলেই ডাকি। তাদের কাছে যখন জানতে চাই, গত ১০ বছরে বাসা ভাড়া কতগুণ বেড়েছে? বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত খরচ, পড়ালেখা-চিকিৎসা ব্যয় কতগুণ বেড়েছে। তখন সে সঠিক হিসাবটাই দেয় এমনকি এর পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যাও তার কাছে থাকে। তাদের কাছে কেবল কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকে না। না পারতে শেষে বলে সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তো বলেছিল ১০ টাকা সের দর চাল খাওয়াবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০৪১ সালের স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সক্ষমতা ও দক্ষতা লাভের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কৃষকের সন্তানও সক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। যে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে এক সময় উন্নত বিশ্ব সন্দেহ পোষণ করত, তারাই আজ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গুণেই আজ তা সম্ভব হয়েছে। কৃষকের জীবনে অনেক সমস্যা। দুর্যোগের কারণে ফলন নষ্ট হয়, আবার ফলন ভালো হলে তারা ভালো দাম পান না। ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষক ফসলে বেশি বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছিটান। এতে তার উৎপাদিত ফসলেই শুধু বিষ যায় না, তিনি নিজেও বিষে আক্রান্ত হন। এসব সমস্যায় থাকা কৃষকদের সমাধানের পথ বের করার চিন্তা থেকে কৃষকদের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করা হয়। দেশের অনেক জায়গায় কৃষকদের সমিতি বা ক্লাব হয়। তখন ক্লাব বা সমিতি মাধ্যমে দেশে নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তি ও বীজের প্রচলন শুরু হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের কাজের এলাকা বা ক্লাবগুলো মূল সড়ক ও শহর থেকে বেশ দূরে। ফলে সেখানে অন্য জেলা এবং শহর থেকে কৃষিবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা আসতে রাজি হয় না অনেক সময়। তারপরও কৃষকরা তাদের নিজেদের মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে রোদে পুঁড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মনের সুখে চাষাবাদ করে। আজ পর্যন্ত কোনো কৃষক তার ফসল নষ্ট করে আন্দোলন করেননি কিন্তু প্রচুর শ্রমিক তাদের কারখানা ভেঙেছে। আর তাই করোনা-পরবর্তী সময়ে আমাদের জিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মোকাবিলায় কৃষি আমাদের একমাত্র বাঁচার পথ। কবির ভাষায়, বাঁচতে হলে লাঙ্গল ধর রে আবার এসে গাঁয়। সাত-সকালে ঝাঁপি মাথায় চাষী মাঠের দিকে ধায়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
[email protected]