নদীর নাম মধুমতি। বাইগার তারই একটি শাখা। বাইগারের তীরে পাটগাতি ইউনিয়ন। টুঙ্গিপাড়া এই ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী। সাবেক মহকুমা, বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত।
ছায়াঘেরা পাখি ডাকা সবুজ সুন্দর একটি গ্রাম। বাংলার আর দশটা গ্রামের মতোই প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপচে পড়ে এই গ্রামে। সেই গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবারে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। ৩ চৈত্র ১৩২৭ বঙ্গাব্দ, ১৭ মার্চ ১৯২০ সাল, মঙ্গলবার রাত ৮টায়।
তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতা সাহেরা বেগম। ৪ বোন ও ২ ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন তৃতীয়। তাঁর একমাত্র কনিষ্ঠ ভাই শেখ নাসের। বোনদের সবাই ছিলেন তাঁর বড়।
কথিত আছে, শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বপুরুষ ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়াল। যিনি মুঘল শাসন আমলে বাগদাদ থেকে চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁয় আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে। শেখ আউয়ালের পুত্রের নাম শেখ জহিরউদ্দিন এবং তদীয় পুত্র শেখ জান মাহমুদ ওরফে তেকড়ি শেখ। শেখ জান মাহমুদের পুত্র শেখ বোরহান উদ্দিন ছিলেন ব্যবসায়ী। ব্যবসা-সংক্রান্ত কাজে তিনি প্রায়ই আসতেন গোপালগঞ্জের গিমাডাংগায়। গিমাডাংগা লাগোয়া টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। শেখ বোরহান উদ্দিন এই টুঙ্গিপাড়ার বনেদী পরিবার কাজী বাড়িতে বিয়ের সূত্রে আবদ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন। শেখ বোরহান উদ্দিনের পুত্র শেখ আকরাম। তদীয় পুত্র শেখ আবদুল হামিদ। শেখ আবদুল হামিদের পুত্র লুৎফর রহমান অর্থাৎ শেখ মুজিবের পিতা। শেখ লুৎফর রহমান সিভিল কোর্টের একজন সেরেস্তাদারের চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। শেখ মুজিবের জীবনে পিতার আদর্শ বিরাট ভূমিকা রেখেছে। অন্যায়, অসত্য, নির্যাতন, ভয়ভীতির কাছে কখনো মাথা নত করেননি শেখ লুৎফর রহমান।
টুঙ্গিপাড়ার শ্যামল পরিবেশে শেখ মুজিবের জীবন কাটে দুরন্তপনা করে। বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে তাঁর দুরন্তপনার কথা উল্লেখ করেছেন। ছেলেবেলার কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজেকে দুষ্টু বালক ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৩৪ সালে যখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতাম।’
পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সবার আদর পাওয়ার বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আব্বার কাছে থেকেই আমি লেখাপড়া করি। আব্বার কাছেই আমি ঘুমাতাম। তাঁর গলা ধরে রাতে না ঘুমালে আমার ঘুম আসত না। আমি বংশের বড় ছেলে, তাই সমস্ত আদর আমারই ছিল।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লেখায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলেবেলার কথা ওঠে এসেছে সাবলিলভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে। বাবুই পাখি বাসা কেমন করে গড়ে তোলে, মাছরাঙা কীভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, কোথায় দোয়েল পাখির বাসা, দোয়েল পাখির সুমধুর সুর আমার আব্বাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। তাই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে করে মাঠে-ঘাটে ঘুরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বেড়াতে তাঁর ভালো লাগত। ছোট্ট শালিক পাখির ছানা, ময়না পাখির ছানা ধরে তাদের কথা বলা ও শিস দেওয়া শেখাতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন, তারা তার কথামতো যা বলতেন তাই করত। এই পোষা পাখি, জীবজন্তুর প্রতি এতটুকু অবহেলা তিনি সইতে পারতেন না। খেলাধুলা, পাখি ধরা, মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও তিনি সে সময় বাড়িতে খুব পড়াশোনাও করতেন। বিশেষ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা তিনি নিয়মিতই পড়তেন। বাড়িতে বাবা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। এসবই সে সময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা। সে সময়ের শিক্ষিত পরিবার মাত্রই এসব পত্রিকা বাড়িতে রাখতেন। ছোটবেলা থেকে এসব পত্রিকার সঙ্গে পরিচয় থাকার কারণে ছোট্ট মুজিবের সামনে বিপুলা পৃথিবীর এক দরাজ দরজা খুলে গিয়েছিল।’
খেলাধুলা নিয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি খেলাধুলাও করতাম। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতাম। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলাম না। তবু স্কুলের টিমের মধ্যে ভালো অবস্থান ছিল। এই সময় আমার রাজনীতির খেয়াল তত ছিল না।’ খেলাধুলার প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা শেখ লুৎফর রহমানেরও আগ্রহ কম ছিল না। বরং তিনি ছেলের খেলাধুলাকে উৎসাহ দিতেন।
‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখায় এই সংক্রান্ত উল্লেখ পাই। খেলাধুলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দাদা শেখ লুৎফর রহমানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘আব্বার লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল। বিশেষ করে ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করতেন। মধুমতী নদী পার হয়ে চিতলমারী ও মোল্লারহাট যেতেন খেলতে। গোপালগঞ্জে স্কুলের টিম ছিল। এদিকে আমার দাদাও খেলতে পছন্দ করতেন। আব্বা যখন খেলতেন তখন দাদাও মাঝে মাঝে খেলা দেখতে যেতেন। দাদা আমাদের কাছে গল্প করতেন, ‘তোমার আব্বা এত রোগা ছিল যে বলে জোরে লাথি মেরে মাঠে গড়িয়ে পড়ত। আব্বা যদি ধারে কাছে থাকতেন তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন। আমরা তখন সত্যিই খুব মজা পেতাম। এর পেছনে মজার ঘটনা হলো মাঝে মাঝে আব্বার টিম ও দাদার টিমের মধ্যেও খেলা হতো।’
যে বয়সটা দুষ্টুমি ও দুরন্তপনার, সে সময়ই সংসার জীবনে পা রাখতে হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সঙ্গে আমার এক নাতনির বিবাহ দিতে হবে। কারণ আমি সব সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরুব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সঙ্গে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর সাত বছর বয়সে মারা যান। তারপর সে আমার মায়ের কাছে চলে আসে। আমার ভাই-বোনদের সঙ্গেই রেণু বড় হয়।’
শেখ মুজিব শেখাপড়া শুরু করেন অনেকটা দেরিতে। যখন তাঁর বয়স নয় কী দশ, তখন গৃহশিক্ষক পণ্ডিত সাখাওয়াত উল্লাহর কাছে লেখাপড়ার হাতেখড়ি নেন। এরপর টুঙ্গিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং টুঙ্গিপাড়ার গীমাতা বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন।
শেখ লুৎফর রহমান জানতেন পুত্র মুজিব ডানপিটে ও দুরন্ত। তারপরও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ছিলেন বেশ আশাবাদী। তাই নিজ কর্মস্থল মাদারীপুরে নিয়ে এলেন শেখ মুজিবকে। এটা ১৯৩১ সালের কথা। ভর্তি করলেন মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। এখানে বছর দেড়েক যেতে না যেতেই শেখ মুজিব আক্রান্ত হলেন বেরিবেরি রোগে। এই রোগ থেকে চোখের ভীষণ অসুখ দেখা দিল। যার নাম ‘গ্লুকোমা’। ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় চার বছরের জন্য। পুত্রের চিন্তায় শেখ লুৎফর রহমান ভেঙে পড়েন। ইতোমধ্যে তিনি মাদারীপুর থেকে গোপালগঞ্জে বদলি হন। গোপালগঞ্জে নিয়ে গেলেন শেখ মুজিবকে। সেখানে শুভাকাঙ্ক্ষীরা পরামর্শ দিলেন শেখ মুজিবকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। শেখ মুজিবকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন শেখ লুৎফর রহমান। কলকাতার চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. টি আহমদ কলিকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেখ মুজিবের চোখ অপারেশন করেন। অপারেশন সফল হলো। কিন্তু ডাক্তার শেখ মুজিবকে পরামর্শ দেন চশমা নেওয়ার জন্য। শেখ মুজিব চশমা নিলেন। অর্থাৎ ছেলেবেলায় বঙ্গবন্ধুর দুরন্তপনা কথা জানলেও রোগ নিয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘স্বভাবে দুরন্ত হলেও ছোটবেলায় নানা রোগও তাকে কম ভোগায়নি। শৈশবে বেরিবেরি রোগ হওয়ার পর হৃদযন্ত্র হয়ে পড়েছিল দুর্বল, ১৯৩৬ সালে গ্লুকোমা হওয়ায় চিকিৎসা নিতে হয়েছিল কলকাতায়। অস্ত্রোপচারের পর চোখে উঠেছিল চশমা। চোখের অসুখের কারণে বেশ কিছুদিন পড়াশোনা বন্ধ থাকে। পরে ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৩৯ সাল। তাঁর বয়স ১৯ বছর। এ বছর তিনি বয়সে চাচাতো বোন ফজিলাতুন্নেসা রেণুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
শেখ মুজিব তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৪২ সালে মিশন স্কুল থেকে শেখ মুজিব প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
অপারেশনের পর চোখ ভালো হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিবকে গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। এই স্কুলে থাকাকালীন শেখ মুজিবের প্রতিভা আর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। এমনিতেই ক্লাসের অন্য ছেলেদের থেকে শেখ মুজিব কিছুটা বয়স্ক। সেই সঙ্গে তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা সবাইকে মুগ্ধ করে। সবার প্রিয় পাত্রে পরিণত হন তিনি। তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে ‘মুজিব ভাই’ হিসেবে।
ফুটবল শেখ মুজিবের পছন্দের একটি খেলা। কিন্তু খেলতেন ভলিবল। শরীরের ছিপছিপে লম্বা হ্যাংলা গড়ন তাকে ভলিবল খেলায় পারদর্শী হতে সাহায্য করেছিল। সে সময় গুরু সদয় দত্তের প্রবর্তিত ‘ব্রতচারী নৃত্য’ ছিল খুব প্রিয়। ‘ব্রতচারী নৃত্য’ সেকালের কিশোর তরুণদের দেশপ্রেমের মহান মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর মানবদরদি ও হৃদয়বান এক মহান মানুষের পরিচয় পাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘তিনি ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত হৃদয়বান ছিলেন। তখনকার দিনে ছেলেদের পড়াশোনার তেমন সুযোগ ছিল না। অনেকে বিভিন্ন বাড়িতে জায়গির থেকে পড়াশোনা করত। চার-পাঁচ মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হতো। সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে আসত। আর সারা দিন অভুক্ত অবস্থায় অনেক দূরে হেঁটে তাদের ফিরতে হতো। যেহেতু আমাদের বাড়িটা ছিল ব্যাংকপাড়ায়, আব্বা তাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। স্কুল থেকে ফিরে দুধ-ভাত খাবার অভ্যাস ছিল এবং সবাইকে নিয়েই তিনি খাবার খেতেন। দাদির কাছে শুনেছি, আব্বার জন্য মাসে কয়েকটি ছাতা কিনতে হতো। কারণ আর কিছুই নয়, ছেলে গরিব, ছাতা কিনতে পারে না, দূরের পথ, রোদ বা বৃষ্টিতে কষ্ট হবে দেখে তাকে ছাতা দিয়ে দিতেন। এমনকি পড়ার বইও মাঝে মাঝে দিয়ে আসতেন। দাদির কাছে গল্প শুনেছি, যখন ছুটির সময় হতো তখন দাদি আমগাছের নিচে এসে দাঁড়াতেন। খোকা আসবে দূর থেকে রাস্তার ওপর নজর রাখতেন। একদিন দেখেন তার খোকা গায়ের চাদর জড়িয়ে হেঁটে আসছে, পরনের পায়জামা-পাঞ্জাবি নেই। কী ব্যাপার? এক গরিব ছেলেকে তার শত ছিন্ন কাপড় দেখে সব দিয়ে এসেছেন।’
তিনি যে দরিদ্র মানুষের বিপন্নতায় বিচলিত হতেন। তার প্রমাণ মেলে ছোটবেলার আরেকটি ঘটনায়। ‘একবার তার গ্রামের চাষিদের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে অভাব-অনটন। অনেক বাড়িতেই দুবেলা ভাত রান্না বন্ধ হয়ে যায়। চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। তাদের সন্তানরা অভুক্ত। সারা গ্রামেই প্রায়-দুর্ভিক্ষাবস্থা নিয়ে চাপা গুঞ্জন। কিশোর মুজিব এরকম পরিস্থিতিতে দুঃখ-ভারাক্রান্ত। কিন্তু কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। একটা কিছু করার জন্য তিনি ছটফট করছিলেন। সে সময় যে পথটি তার সামনে খোলা ছিল, তিনি তাই করলেন। নিজের পিতাকে তিনি তাদের গোলা থেকে বিপন্ন কৃষকদের মধ্যে ধান বিতরণের জন্য অনুরোধ জানালেন। তাদের নিজেদের ধানের মজুত কেমন, এই অনুরোধ তার বাবা রাখতে পারবেন কি না, সেসব তিনি ভাবেননি। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার চিন্তাটিই ছিল তখন তার কাছে মুখ্য।’
আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। একবার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আসেন গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল পরিদর্শনে। সঙ্গে আসেন খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুল পরিদর্শন শেষে তাঁরা ডাকবাংলোর দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পথে বাঁধা পেয়ে দাঁড়ালেন। কারণ কয়েকটি ছেলে তাদের পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে। প্রধান শিক্ষক দ্রুত এগিয়ে এসে ছাত্রদের রাস্তা ছেড়ে দিতে বললেন।
প্রধান শিক্ষকের কথা অমান্য করে একেবারে প্রধানমন্ত্রীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল লম্বা ছিপছিপে চেহারার একটি ছেলে। যার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। সবার মুজিব ভাই। নির্ভয়ে মুজিব প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন, হোস্টেলের ছাদ দিয়ে বর্ষাকালে পানি পড়ে। এতে ছাত্রদের বইপত্র, বিছানা নষ্ট হয়ে যায়। মেরামতের ব্যবস্থা না করলে রাস্তা ছাড়া হবে না। এই ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন। আর শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে। আমি মিশন স্কুলের ছাত্র। তাই তাকে সংবর্ধনা দিলাম। তিনি স্কুল পরিদর্শন করে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের দিকে চললেন, আমিও সঙ্গে চললাম। তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম।’
কিশোর ছাত্রের সৎসাহস আর স্পষ্টবাদীতায় মুগ্ধ হলেন ফজলুল হক। জানতে চাইলেন ছাদ মেরামত করতে কত টাকা লাগবে তাদের। দৃঢ়কণ্ঠে শেখ মুজিব বললেন, ১২০০ টাকা লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তার তহবিল থেকে ১২০০ টাকা মঞ্জুর করে অবিলম্বে ছাদ মেরামতের জন্য এসডিও সাহেবকে নির্দেশ দিলেন। শেখ মুজিবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, আজ থেকে তুমি আমার নাতি। সেই থেকে ফজলুল হকের সঙ্গে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠতা হয়।
এখানে শেষ নয়, এতক্ষণ প্রধানমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়িয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলেন খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেখ মুজিবের সৎসাহস, কর্তব্যবোধ তাঁর মনোযোগ কাড়ল। ডাকবাংলোতে ফিরেই সোহরাওয়ার্দী লোক মারফত শেখ মুজিবকে ডেকে পাঠালেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে কিছুক্ষণ তাঁর কথা হলো। সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় শেখ মুজিবকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন।
স্কুল জীবনেই শেখ মুজিব প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। শেখ মুজিব যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক সভায় ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় মিথ্যা অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ছাত্রদের দাবির মুখে পুলিশ শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৪০ সালে যোগ দেন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাকে গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। গত শতকের ত্রিশের দশকের মধ্যেই স্বদেশি আন্দোলন দেখে ইংরেজবিরোধী মনোভাব জেগে ওঠে বালক শেখ মুজিবের মনে।
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুর ফিরে এলাম, কোনো কাজ নেই। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলা নেই, শুধু একটা মাত্র কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশি আন্দোলনের যুগ। ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম।’
পরে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ বিভাজনে মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়েন শেখ মুজিব। সারা জীবন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির ভক্ত ছিলেন।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক
[email protected]