নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালের মূল ফটক থেকে শুরু করে পুরো এলাকাই দিনভর ঘিরে রাখেন দালাল চক্রের সদস্যরা। নানা ধরনের প্রতারণা করেন রোগীদের সঙ্গে। তাও আবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনেই। অভিযোগ রয়েছে, এ হাসপাতালের চিকিৎসক নিজেই ভাড়ায় রাখেন দালাল। সেই সঙ্গে আবার অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বাড়তি ভাড়ার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রোগী ও তাদের স্বজনরা।
নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে অবস্থিত সদর জেনারেল হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার বহির্বিভাগ ও শুক্রবার জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে মূল ফটকে অবস্থান নেন দালাল চক্রের সদস্যরা। নারী-পুরুষ উভয় এখানে অবস্থান করেন। রিকশা থেকে রোগী নামার পর পরই তারা ছুটে গিয়ে রোগীকে নেন জরুরি বিভাগে। সেখানে চিকিৎসকের কক্ষে আবার দুই থেকে তিনজন সারাক্ষণ অবস্থান করেন। রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ ওষুধও কিনে দেন। সঙ্গে কোথায় যেতে হবে তার একটি রশিদও দিয়ে দেওয়া হয়। জরুরি ও বহির্বিভাগ থেকে রোগী বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে গিয়ে হাজির হন দালালরা। এরপর নিয়ে যান নির্ধারিত স্থানে। সেখানে বাড়তি খরচে রোগীদের করাতে হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসার নানা কার্যক্রম।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা হেনা পারভীন বলেন, জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভেতরেই অবস্থান করেন দালালরা। তারা চিকিৎসকের কক্ষ থেকেই রোগীকে নিয়ে যান বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। আমাকেও এভাবেই নিয়ে গেছেন। ডাক্তারের সামনেই বলেছেন সেখানে কম খরচ লাগবে অথচ পরীক্ষা করাতে নিয়েছেন ৩ হাজার ৪০০ টাকা। এই পরীক্ষা যদি সরকারি হাসপাতালে করলে ৬০০ টাকা খরচ হতো। কিন্তু আমি এটা পরীক্ষা করার পর রিপোর্ট দেখাতে এসে জেনেছি। আর জেনেই বা কী লাভ, ডাক্তার যেখানে পাঠান সেখান থেকে পরীক্ষা না করালে তিনি রিপোর্ট দেখতে চান না।
অসুস্থ শিশু সুরিয়াকে নিয়ে হাসপাতালে আসা তার মা লিপি বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, তিন দিন ধরে আমার মেয়েটার পেটব্যথা। এ পর্যন্ত চারবার হাসপাতালে এসেছি। তারা বারবার বাইরে পরীক্ষা করতে পাঠায়। হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে গিয়েছিলাম সেখানে বলে পরীক্ষা করাতে হলে সকাল ৯টায় আসতে হবে। পেটব্যথা কি ঘড়ির সময় ধরে আসে। আর ডাক্তারের রুমেই তো দালাল থাকে। ডাক্তার লেখার সঙ্গে সঙ্গে তারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঠিকানার রশিদ হাতে ধরিয়ে দেয়। সেখান থেকে আবার না করালে ডাক্তার রিপোর্ট দেখতে চান না। রোগীরা এখানে জিম্মি, তাদের ইচ্ছেই তো সব।
স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও চিকিৎসক পর্যন্ত দালালদের ভাড়া রাখেন বলে জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের জেলার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল। তিনি বলেন, হাসপাতালে বেশ কয়েকটি ঝামেলার বিষয়ে জেনেছি। নিজেও গিয়ে দেখছি। এখানে আসলে সেবা পেতে হলে টাকা খরচ করতে হবে। নয়তো সেবা পাবেন না। কারণ হাসপাতালে চারপাশ ঘিরে থাকে সরকারি ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল।
ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, জরুরি ও বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের রুমে থাকে দালাল। আসলে তারা বাড়তি টাকা পাওয়ার জন্যই দালাল রাখেন। আবার হাসপাতালে রোগীরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে হামলার শিকার হতে হয়। তিনি বলেন, ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিককে মারধর করেছে এ হাসপাতালে এমন ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সিভিল সার্জন কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেননি। আসলে তার অনুমতি ছাড়া তো আর কিছু হয় না। ফলে তিনিও এর সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন সুজন। তবে এর পরিবর্তনসহ যারা অনিয়ম ও রোগীদের হয়রানি করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ হাসপাতালে শুধু দালালই নয়, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কাছেও জিম্মি রোগীরা। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেল যেতে ১৮৫০ টাকা দিনে ও রাতে ২ হাজার টাকা ভাড়া নেন অ্যাম্বুলেন্সচালকরা। আর সোহরাওয়ার্দী, পঙ্গু হাসপাতাল কিংবা হৃদরোগ ইনস্টিটিউট যেখানেই রোগী যান না কেন ২৫০০ টাকা ভাড়ায় তাকে অ্যাম্বুলেন্স নিতে হয়।
অথচ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তালিকা অনুসারে, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে এ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত ভাড়া মাত্র ৬৭০ টাকা। আর সোহরাওয়ার্দী ও পঙ্গু হাসপাতালে যাওয়ার জন্য ভাড়া ৭৭০ টাকা। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সচালক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকায় রোগীরা ফোন করে তার খোঁজ পায়। দালালের যোগসাজশ থাকায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে হয়।
হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের পদে পদে হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান খবরের কাগজে বলেন, ‘আগের তুলনায় রোগীদের ভোগান্তি অনেক কমেছে। এখনো যেটুকু সমস্যা আছে, তা সমাধানে আমরা কাজ করছি। কিন্তু কোনো চিকিৎসক যদি তার রুমে দালাল বসিয়ে রাখেন সেটা তো সার্বক্ষণিক তদারকি সম্ভব নয়। তবে অভিযোগ যেহেতু এসেছে আমরা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব।’
সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও রোগীদের হয়রান হতে হচ্ছে কেন- এমন প্রশ্নে সিভিল সার্জন বলেন, হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তবে চালক একজন। তাও আবার সিভিল সার্জন অফিসের নানা কাজে তাকে বিভিন্ন অফিসে পাঠানো হয়। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিতে হয়। তবে দ্রুত চালক নিয়োগসহ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। রোগীদের ভোগান্তি নিরূপণে ফায়ার সার্ভিস ও ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল থেকে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান।
হাসপাতালে দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে খবরে কাগজকে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। রোগীর ভোগান্তি কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনে গোয়েন্দাদের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।