বাংলাদেশের জুলাই ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য অযৌক্তিক শতকরা হারে কোটা সংরক্ষণের কারণকে ঘিরে। কিন্তু আর একটু গভীরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, আন্দোলনের মূল ক্ষোভের কারণ ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার চরম বৈষম্য। ফলে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম সরকারি মদদপুষ্ঠ এক শ্রেণির লোক দুর্নীতি, অপশাসন, স্বজনপ্রীতি এবং পুজিবাদপুষ্ট ভাড়াটিয়া বাহিনীর সাহায্য নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন অসহনীয় করে তুলেছিল। গত সরকার রাষ্ট্রের ভেতর এক ‘গভীর রাষ্ট্রের’ জন্ম দিয়েছিল। জুলাই বিপ্লব দেশবাসীকে এক মারাত্মক আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা নিরসনে সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। সংস্কারের মূল ছয়টি বিষয় হচ্ছে- সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন পদ্ধতি, দুর্নীতিবিরোধী কমিশন, জনপ্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনী। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর এ সরকারের কাজের অগ্রগতী অব্যাহত রয়েছে। গণতন্ত্র সুসংহত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রতন্ত্রের মানবাধিকার লংঘন বন্ধ করার ক্ষেত্রে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB)-এর কর্মকাণ্ডকে একটা জবাবদিহির মধ্যে আনার প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে জননিরাপত্তার আশ্বাসকে সুদৃঢ় করবে। মানুষ যখন নিরাপদে বসবাস করার নিশ্চয়তা পায়, তখন সে তার অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিকে নির্দিধায় পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে বর্তমানে নেওয়া পদক্ষেপগুলো পজিটিভ। গত সরকারের সময় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। মাত্র তিন বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সেই রিজার্ভের পরিমাণ নেমে আসে ২১ বিলিয়ন ডলারে। রিজার্ভের পরিমাণ কমে আসার মূল কারণ হিসেবে প্রমাণিত হলো দেশ থেকে প্রচুর অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া। অর্থ পাচারের পেছনে রয়েছে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার লোভ। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনের সময় ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। পাচার অর্থ দ্বারা দুর্বৃত্তরা তাদের সম্পদ গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। অর্থ পাচারকারীর মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি আমলা।
স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতিমুক্ত সামরিক, বেসামরিক কিংবা আইনি প্রতিষ্ঠান আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণকে প্রচুর ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়, এর চূড়ান্ত অভিঘাত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর। মেধাহীন রাষ্ট্র কখনো উন্নত হতে পারে না।...
বর্তমান সরকারের গত এক বছরে রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। এর অর্থ হলো মুদ্রা পাচারকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির প্রবণতা কমেছে। রিজার্ভ যত বেশি হবে রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি তত কমবে। অতএব, ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, অর্থ পাচারের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কঠিন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করার জন্য বাস্তবিক অর্থে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতার ব্যাপকতা চিন্তা করে হয়তোবা আগামী নির্বাচিত সরকারের কাছে এর সংস্কারের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
মূলতঃ বাংলাদেশে তিন ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি চালু রয়েছে, যেমন- বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম। দেখা যায় যে, মাধ্যমগুলোর কারিকুলামের তারতম্যের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের মেধার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। চাকরির সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আসা ছাত্ররা বৈষম্যমূলক পৃষ্ঠপোষকতার শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা ছাত্রদের প্রবণতা হচ্ছে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে গমন করা এবং পরবর্তীতে দেশে ফিরে না আসা। উচ্চতর শিক্ষার মান উন্নত না হলে দেশ থেকে ভালো ছাত্রছাত্রীদের বিদেশ গমন রোধ করা সম্ভব হবে না। দেশে যুবক সম্প্রদায়ের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকার কারণে মেধাবী ছাত্রদের ইদানীং বিদেশে পাড়ি দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। বুদ্ধিবৃত্তির অধুনা এ প্রবণতা অর্থ পাচারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা এবং তাকে বাস্তবিক অর্থে ফলপ্রসূ করার জন্য একটা কর্মপদ্ধতি থাকা অপরিহার্য। যে জাতি বিজ্ঞান শিক্ষায় যত উন্নত, সেই জাতি অর্থনীতিতে তত উন্নত এবং সমষ্টিগতভাবে ধনী।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার হাত দেয়নি, সেটি হচ্ছে সামরিক বাহিনী। বাহিনীর সংস্কারের বিষয়টি জটিল এবং সংবেদনশীল হওয়ার কারণে বিষয়টির ওপর হাত দেওয়া হয়নি।
সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। পূর্ববর্তী সরকার বাহিনীর আধুনিকায়ন থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিল। এর প্রভাব বাহিনীর পেশাগত গতিশীলতার ওপর পড়েছিল।
একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ব্যতীত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতাকে সু-সংহত করা যায় না। সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর ত্রৈমাত্রিক পেশাগত মান যুগপৎভাবে যুগোপযোগী করার বিষয়টি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকারকে অপরিহার্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সীমানা। ‘নীল অর্থনীতির’ কথা প্রায়ই আমরা শুনে থাকি বিভিন্ন সেমিনার, সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক উপস্থাপনায়। অথচ এই বিরাট সম্পদশালী সমুদ্র সীমানা জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার মতো নৌশক্তি আমরা এখন পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে আমাদের নিজস্ব সম্পদ অজান্তে অপহৃত হচ্ছে, যার লভ্যাংশ থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। শক্তিশালী বিমান বাহিনীর এক অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য বেসামরিক বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে থাকে। এসব বিমানকে আমাদের আকাশসীমা ব্যবহার করার জন্য নেভিগেশন চার্জ প্রদান করা বাধ্যতামূলক। উপযুক্ত এবং ফলপ্রসূ রাডার নজরদারির অভাবে বাংলাদেশ যাতে রাজস্ব থেকে বিরত না থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সম্পূর্ণভাবে মনিটর করার জন্য রাডার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আধুনিক যুদ্ধবিমানের সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা জাতীয় নিরাপত্তার মাত্রাকে অধিকতর শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতিমুক্ত সামরিক, বেসামরিক কিংবা আইনি প্রতিষ্ঠান আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণকে প্রচুর ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়, এর চূড়ান্ত অভিঘাত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর। মেধাহীন রাষ্ট্র কখনো উন্নত হতে পারে না। দরিদ্র রাষ্ট্রের অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দক্ষ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির অভাব।
একটি রাষ্ট্র নৈর্ব্যক্তিক বস্তু নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ তার জনশক্তি। কিন্তু কোনো জনশক্তি প্রস্ফুটিত হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উপরিকাঠামোর ওপর দণ্ডায়মান সরকার প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ’কে তার প্রথম দায়িত্ব হিসেবে পালন থেকে বিরত থাকে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান