দুই বছর পূর্ণ করে এবার তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করল দৈনিক খবরের কাগজ। একটি দৈনিক সংবাদপত্রের জন্য দুই বছর এমন বেশি কোনো সময় নয়। যদিও বিগত বছর দুটি ছিল নানা কারণে উল্লেখযোগ্য, যার মধ্যে ছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের ঘটনা। গত বছরের ছাত্র-জনতার সেই গণ-অভ্যুত্থান ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
নির্দ্বিধায় বলতে পারি, গণ-অভ্যুত্থানের সেই টালমাটাল অস্থির দিনগুলোতেও এই পত্রিকায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অবিচল থেকে রেখেছেন প্রশংসনীয় সাহসী ভূমিকা।
একেবারে শুরুর দিকে খবরের কাগজের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত অনুজপ্রতিম সাংবাদিক তৌফিক মারুফ। আমি তখন ঢাকা ও বরিশালে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও দেশি-বিদেশি বার্তা সংস্থায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করে (অনেকটা প্রায়) অবসর নিয়ে পুনরায় ঢাকাবাসী হয়েছিলাম কিছুটা পারিবারিক কারণে।
তখন ঢাকায় আমার সময় কাটত মূলত নানা রকম লেখালেখি আর পূর্বপরিচিত পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও গল্প-গুজব করে। সক্রিয় সাংবাদিকতা করার তেমন আর ইচ্ছেই ছিল না। তাই তখন কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকা থেকে কাজ করার অনুরোধ পেলেও আমি রাজি হইনি।
আমরা জানি, গণমাধ্যম হচ্ছে আমাদের সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিকের ভূমিকা হচ্ছে- ওয়াচডগের। এই বাস্তবতার নিরিখে আমাদের প্রতিদিনের অগ্রযাত্রায় কোনোভাবেই আর পেছন ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আর আমাদের সেই অগ্রযাত্রায় দৈনিক খবরের কাগজ দিনে দিনে সবার জন্য হয়ে উঠছে সত্য আর আলোর পথের দিশারী।...
তবে তার পরও মারুফের অনুরোধ ফেলতে না পেরে একদিন বিকেলে চলে গিয়েছিলাম ফার্মগেটে এক বহুতল ভবনের উঁচু একতলায় প্রকাশিতব্য খবরের কাগজের অস্থায়ী কার্যালয়ে। সেখানেই সেদিন আলাপ-পরিচয় হয়েছিল পত্রিকার সম্পাদক কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামাল, উপ-সম্পাদক (বর্তমানে নির্বাহী সম্পাদক) এনাম আবেদীন, কপি এডিটর (বর্তমানে দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক) কবি হাসান হাফিজ এবং প্রধান বার্তা সম্পাদক (বর্তমানে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক) খালেদ ফারুকীসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে। মারুফ তো ছিলই। তার দায়িত্ব ছিল চিফ রিপোর্টারের।
এরা প্রায় সবাই একসময় দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় কাজ করতেন। মোস্তফা কামাল ছিলেন নির্বাহী সম্পাদক। তবে এর পাশাপাশি তিনি কথাসাহিত্যিক হিসেবেও সুপরিচিত।
আলাপ পরিচয় হওয়ার পর আমার কাছ থেকে তাদের প্রথম জানার বিষয়টি ছিল, আমি ঢাকায় থাকব, নাকি বরিশালে ফিরে যাব? এই প্রশ্নের উত্তরটি আমি তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারছিলাম না। বলেছিলাম, দুদিন পরে জানাব। সেদিন চমৎকার পরিবেশে এই পর্যন্ত কথাবার্তা বলে চলে এসেছিলাম।
এদিকে বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই নানা কারণে আমি এবং আমার পরিবারের সবাই বরিশালে ফিরে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছিলাম। এবারে সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করে ফেরার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলাম।
দুই দিন পরে ফার্মগেটে গিয়ে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালে সম্পাদক কামাল ভাই আমাকে একজন প্রতিবেদক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবকিছুসহ অফিস নিয়ে বরিশালের বিভাগীয় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিলেন। যেহেতু পুনরায় বরিশালে ফিরছি সেহেতু কামাল ভাইয়ের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম।
এভাবেই সেদিন ২০২৩ সালের সম্ভবত আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় দৈনিক খবরের কাগজ পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেলাম।
তারপর কিছুদিনের মধ্যেই যথারীতি বাংলামোটরের কার্যালয়ে সর্বাধুনিক সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজ প্রকাশনার কাজ শুরু হয়। বরিশালেও খোলা হয়েছে অফিস, সেই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে যুক্ত হয়েছে একসময় দৈনিক কালের কণ্ঠে কাজ করা স্নেহভাজন সাংবাদিক মইনুল ইসলাম সবুজ।
এরপর আমরা আর পেছন ফিরে তাকাইনি। যথাসময়ে মহাসমারোহে শুরু হয়েছে আমাদের পথচলা, ভালো-মন্দ মিশিয়ে যা এখনো চলমান রয়েছে।
আর এখন দ্বিধাহীনভাবেই হয়তো বলা যায় যে, ‘দৈনিক খবরের কাগজ বিগত দুই বছরেই বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে মোটামুটি একটা স্থান করে নিতে পেরেছে, পাশাপাশি কিছুটা হলেও পাঠকদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে খবরের কাগজে কর্মরত সাংবাদিকসহ কর্মীদের কর্মদক্ষতা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণেই। তবে একই সঙ্গে তাদের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়, যাদের মাধ্যমে প্রতিদিন দেশব্যাপী হাজারও পাঠকের কাছে নিয়মিত পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের হাতে গড়া অনেক স্বপ্নের খবরের কাগজ।’
আমরা বিশ্বাস করি, সংবাদপত্র হওয়া উচিত সর্বজনপাঠ্য ও গ্রাহ্য একটি আপসহীন, সাহসী গণমাধ্যম, যার মাধ্যমে দেশের সর্বস্তরের মানুষ যেকোনো ঘটনার সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য অবাধে পেতে পারে। এই বাস্তব সত্যটি আমরা সব সময় মেনে চলার চেষ্টা করি।
আমার এই দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে নানা পদমর্যাদায় যেমন কাজ করতে হয়েছে স্বাধীনতা-পূর্ব দৈনিক পূর্বদেশ-এ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, বার্তা সংস্থা ইউএনবি এবং দি ডেইলি স্টার-এর মতো পত্রিকায়। তেমনি কাজ করেছি বিদেশি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং রয়টার্স-এ, যেখানে কাজ করতে গিয়ে আমাকে অভাবিতভাবে মুখোমুখি হতে হয়েছে ভালো-মন্দ মিলিয়ে নানা ধরনের নতুন সব অভিজ্ঞতার। ধারণা করতে পারি, এই সময়ের সাংবাদিকদের বিগত দিনের চাইতে কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত আরও কঠিন পরিবেশ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে সবকিছুই তারা সামলে নেন তাদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর সাহসের জোরে।
আমরা জানি, গণমাধ্যম হচ্ছে আমাদের সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিকের ভূমিকা হচ্ছে- ওয়াচডগের। এই বাস্তবতার নিরিখে আমাদের প্রতিদিনের অগ্রযাত্রায় কোনোভাবেই আর পেছন ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
আর আমাদের সেই অগ্রযাত্রায় দৈনিক খবরের কাগজ দিনে দিনে সবার জন্য হয়ে উঠছে সত্য আর আলোর পথের দিশারী।
লেখক: সাবেক উপদেষ্টা, বরিশাল বিভাগ, খবরের কাগজ ও শব্দসৈনিক