৫ আগস্ট পরবর্তী সময় দেশ উত্তাল। ক্ষমতাচ্যুত এমপি-মন্ত্রীদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও দখলদারত্ব নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজে প্রথম পাতা ও শেষ পাতায় গুরুত্ব দিয়ে নিউজ ছাপা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৪ অক্টোবর দুপুরে জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক অপূর্ব ইব্রাহীম ফোন দিয়ে বলেন, মনু আপনার উপরে ওহি জারি হয়েছে। প্রতি উত্তরে তাকে বলি, সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক, চিফ রিপোর্টার এবং দুজন জিএমসহ শীর্ষদের মধ্যে ১০-১২ জন যখন বরিশালের তখন দুই একটি ওহি জারি স্বাভাবিক। তিনি জানান, জারি হওয়া ওহির বিষয়বস্তু হচ্ছে জাতীয় পার্টির তৎকালীন কো-চেয়ারম্যান (বর্তমানে একাংশের মহাসচিব) রুহুল আমীন হাওলাদার ও তার স্ত্রী সাবেক এমপি নাসরিন জাহার রত্না আমিনের দুর্নীতির অনুসন্ধান করা।
রত্না আমীনের বিরুদ্ধে বরিশাল-৬ আসনের অর্থাৎ বাকেরগঞ্জে দৃশ্যমান মোটা দাগের দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তবে রুহুল আমীন হাওলাদারের বিরুদ্ধে কুয়াকাটায় জমি জবরদখলের অভিযোগ রয়েছে। সেটি পটুয়াখালী প্রতিনিধিকে বললে ভালো হয়। অপূর্ব ইব্রাহীম ঠিক আছে বলে ফোন ছেড়ে দেন। একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
কিন্তু পরদিন বিকেলে মফস্বল বিভাগের সম্পাদক অঞ্জন দা ফোন দিয়ে বললেন। পটুয়াখালী দিয়ে হবে না। ওর রিস্ক আছে। তাই আপনাকে যেতে হবে। এটা নির্বাহী সম্পাদকের নির্দেশ। বলে তিনি নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন ভাইকে ফোনে ধরিয়ে দিলেন। তিনি কিছু গাইডলাইন দিয়ে বললেন, কোনো ঝামেলা মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।
‘প্রায় আড়াই মাস পরে দেশের দক্ষিণ প্রান্তের সূর্যটার আলো দেখা মেলে। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি নিউজটি প্রথম পাতায় ছাপা হয়। ওই দিন কুয়াকাটা ও কলাপাড়ার ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের খবরের কাগজকে নিয়ে জন্ম হওয়া ভুল ধারণা ভেঙে যায়। আমাকেসহ খবরের কাগজের সম্পাদক মহোদয় এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেছেন নিউজ ছাপায় বিলম্ব হওয়ায় আমারও ভেবেছিলাম অন্যদের মতো খবরের কাগজও রুহুল আমীন হাওলাদারের দুর্নীতির নিউজ ছাপবে না। কিন্তু খবরের কাগজ কথা রেখেছে।’...
গত বছরের ৮ অক্টোবর পটুয়াখালীর প্রতিনিধি হাসিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে কুয়াকাটায় পৌঁছালাম। সেখানে পৌঁছানোর আগে কুয়াকাটার কয়েকজন সহকর্মীর সহযোগিতা চেয়েছিলাম। রুহুল আমীন হাওলাদারের বিষয় বলে তারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেননি। আমি এবং পটুয়াখালী প্রতিনিধি হাসিব পায়ে হেঁটে রুহুল আমীন হাওলাদারের মালিকানাধীন হোটেল কুয়াকাটা গ্র্যান্ডের আশপাশে কয়েক ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করলাম। হোটেল কুয়াকাটা গ্র্যান্ডের সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ৭ তলায় উঠে ছবি তুললাম ও ভিডিও করলাম।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে হোটেলের পেছনের গেটসংলগ্ন টংঘরের চায়ের দোকানে বসে কলেজেপড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলি। তবে ওই ছেলেটি তেমন তথ্য দিতে পারেনি। তবে রুহুল আমীন হাওলাদার বিপুল পরিমাণ জমি জবর দখল করে রেখেছেন এটুকু জানিয়েছে। সব তথ্য জানেন- এমন একজন স্থানীয় বিএনপি নেতার খোঁজ পেলাম। রাখাইন মার্কেট এলাকায় তার সঙ্গে দেখা হলো। কিন্তু কোনো তথ্য দিলেন না। তার ভাবখানা এমন আমরা দুজনও ধান্ধা করতে এসেছি কুয়াকাটায়। তিনি বলেন, ‘আরে ভাই ২০ বছর ধরে কত বড় বড় সাংবাদিক দেখেছি, কত টিভি চ্যানেল আসতে দেখেছি, বড়বড় কথা শুনেছি। কত তথ্য দিয়েছি। এখান থেকে ফেরত গিয়ে রুহুল আমীন হাওলাদারের মাল (টাকা) খায়। নিউজ আর ছাপা হয় না। আপনি-তো বরিশাল থেকে এসেছেন।’
তিনিও কোনো তথ্য না দিয়ে শাজাহান শেখ নামে এক ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে বলেন, ‘উনার কাছে গিয়ে শুনুন তাদের জমি কীভাবে দখল করেছেন।’
শাজাহান শেখ আমাদের সঙ্গে দেখা করেন মাগরিবের নামাজের পরে। কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাদের ৩৫ শতাংশ পৈতৃক জমি রুহুল আমীন হাওলাদার কীভাবে জবরদখল করেছেন তার বর্ণনা দেন। পরে তিনি অপর এক ভুক্তভোগীর কথা বলেন। রাতে দেখা করি তার সাথে এভাবে দুইদিন ঘুরে ভাণ্ডারে যে তথ্য জমা হয় তাতে মোটামুটি একটি নিউজ দাঁড় করানো যাবে। তাই ৯ তারিখ বিকেলে কুয়াকাটা থেকে বরিশালে ফিরে আসি।
ফেরার পথে মুঠোফোনে একের পর এক কল আসতে শুরু করে। মোটরসাইকেল ড্রাইভ করায় সেগুলো রিসিভ করতে পারিনি। পায়রা সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় যাত্রাবিরতি দিয়ে দেখি সিনিয়র সাব এডিটর অপূর্ব ইব্রাহীমসহ পরিচিত অপরিচিত জনদের প্রায় অর্ধশত মিসড কল। এর মধ্যে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ১৪টি মিসড কল। জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদককে ফোন ব্যাক করার সাথে সাথে তিনি বলেন, মনু আপনাকে নিয়েতো পুরো অফিস গরম। এ কথা শুনে অসহায় সুরে বললাম আমি আবার কী করলাম? অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন, কুয়াকাটা পটুয়াখালী ঘুরে এখন বরিশালে ফিরছি। তিনি বলেন, আরে না আপনি কিছুই করেননি। কিন্তু হাওলাদার সাহেব-তো পুরো অফিস গরম করে ফেলেছেন। তবে চিন্তার কারণ নেই। সম্পাদক ভাইয়া এবং নির্বাহী সম্পাদক ভাইয়া ভালো করে নিউজটি করে পাঠাতে বলেছেন। এ কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাসায় ফিরতে না ফিরতে বরিশালের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের ফোন। রিসিভ করতেই তার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করেন। রাতে তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বলেন, ‘হাওলাদার সাহেব তোকে কয়েকবার ফোন দিয়েছিলেন। না পেয়ে আমাকে ফোন দিয়েছেন। অপরিচিত নম্বর মিলিয়ে দেখি সেটি রুহুল আমীন হাওলাদারের। সিনিয়র ওই সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার মাঝে তার ফেনে রুহুল আমীন হাওলাদার ফোন দিলে তিনি সেটি আমাকে ধরিয়ে দেন।’
হাওলাদার সাহেব কথার বলার শুরুতে নিউজ না করার অনুরোধ করেন। দ্বিতীয় ধাপে প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকালসহ পত্রিকার ব্যুরো চিফ বানাবেন বলে লোভ দেখান। তার মালিকানাধীন ফাইভ স্টার হোটেল কুয়াকাটা গ্র্যান্ডের ইনচার্জের দায়িত্ব দেওয়া, লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান। এসবে প্রলুব্ধ করতে না পেরে কয়েক লাখ টাকার অফার দেন। এরও কোনো ভালো উত্তর না পেয়ে তৃতীয় দফায় তিনি ঠাণ্ডা মেজাজে মামলার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে নিউজ হলে মানহানির মামলা করব।’ ১৫ থেকে ১৬ মিনিটের কথোপকথনের এই পর্যায়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। প্রতি উত্তরে মি. হাওলাদারকে বলেছিলাম, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার মুড নেই। আর মামলার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। মামলা করলে সম্পাদকসহ আরও অনেককে আসামি করতে হবে। তাদের সঙ্গে আদালতে হাজিরা দিব। মামলা দিলে আপনি দিতে পারেন বলে ফোনটি ওই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের হাতে দিয়ে দিই।’
১০ অক্টোবর নিউজ পাঠাই। ১১ অক্টোবর দুপুরের মধ্যে সংশোধিত নিউজ পাঠালাম। ১২ অক্টোবর লিড ছাপা হবে নিশ্চিত হলাম। রাতে আমি আনন্দে আত্মহারা কিন্তু সকালে আমার মধ্যে বিষাদের সুর। লিড-তো দূরের কথা ১৬ পাতার পত্রিকার কোথাও নিউজ নেই। মফস্বল সম্পাদক নিউজ না ছাপার কারণ বলতে না পেরে আমাকে একটা কিছু বুঝ দিলেন। আমি তাই বুঝে নিলাম।
শুরু হলো নিউজ ছাপার অপেক্ষার পালা। দিন যায় সপ্তাহ যায় মাস যায় কিন্তু নিউজ ছাপা হয় না। কুয়াকাটার মানুষেরা বলতে শুরু করে আমরা (খবরের কাগজ) নিউজ ছাপাতে পারব না। অন্যদের মতো হাওলাদার টাকা দিয়ে অফিস ঘুচ করে ফেলেছে। অমুক তমুক। শুনতে মোটেও ভালো লাগছিল না। কেউ কেউ উলটাপালটা কথাও বলতে শুরু করে। কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই।
এ নিয়ে মফস্বল সম্পাদকও অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। তিনিও রুহুল আমীন হাওলাদারের নিউজ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না। আশা ছেড়ে দিলাম।
‘প্রায় আড়াই মাস পরে দেশের দক্ষিণ প্রান্তের সূর্যটার আলো দেখা মেলে। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি নিউজটি প্রথম পাতায় ছাপা হয়। ওই দিন কুয়াকাটা ও কলাপাড়ার ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের খবরের কাগজকে নিয়ে জন্ম হওয়া ভুল ধারণা ভেঙে যায়। আমাকেসহ খবরের কাগজের সম্পাদক মহোদয় এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেছেন নিউজ ছাপায় বিলম্ব হওয়ায় আমারও ভেবেছিলাম অন্যদের মতো খবরের কাগজও রুহুল আমীন হাওলাদারের দুর্নীতির নিউজ ছাপবে না। কিন্তু খবরের কাগজ কথা রেখেছে।’
লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল, খবরের কাগজ