গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র একপক্ষীয় বা এক মতের হতে পারে না- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বহুপক্ষীয় এবং বহু মতের ব্যবস্থা। এ ভিন্নতা বা মতবিরোধের সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক সভ্যতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সে কারণে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কয়েকটি অপরিহার্য শর্ত থাকে, যা ছাড়া রাষ্ট্রচরিত্র নির্ণীত হয় না। প্রথমত, সব দল ও মতের উন্মুক্ত অংশগ্রহণে এবং সম্পূর্ণ মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনপুষ্ট দল বা গোষ্ঠীর সরকার গঠন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত রাষ্ট্রশাসকের হাতে সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণিপেশার মানুষের মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার বা মানবাধিকার সংরক্ষণ। তৃতীয়ত, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ। চতুর্থত, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষপাতহীন আচরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
এ শর্তগুলো আলাদা মনে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় তা আলাদা বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বরং একটি অপরটির পরিপূরক। মনে রাখা জরুরি যে, বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যাই থাক না কেন, পক্ষ ও বিপক্ষ মিলেই গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মিত হয়। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এক দলের নয়, একপক্ষের নয়, এক মতেরও নয়, এবং তা হওয়ার সুযোগ নেই। ভিন্ন মতের অনুসারী বা প্রতিপক্ষকে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি সে কারণেই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমের স্বাধীন বিচরণনকে বাধাগ্রস্ত করে না বরং উন্মুক্ত করে। রাষ্ট্রের এ চতুর্থ স্তম্ভের স্বাধীনতা সে কারণে জরুরি। কারণ গণমাধ্যম সমাজের আরশি- যা সমাজসংকট বা দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায্যতার ছবি তুলে ধরে। কোনো গণমাধ্যম সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতা উপেক্ষা করলে বা পরিকল্পিত পন্থায় মিথ্যাচার ছড়ালে বা সমাজ-সংঘাতের কারণ হলে, তার নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবিধান আছে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সমালোচনা হলো বলেই বা শক্তিধরদের অপছন্দের কারণ হলো বলেই কোনো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ হতে পারে না। যদি তা হয় তাহলে সেই সমাজ বন্য হয়, সে রাষ্ট্র সংবিধান ও আইনকে উপেক্ষা করে।...
প্রথমত, আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা বা মত নির্ধারণের প্রশ্নে আসি, সে ক্ষেত্রে একটি দেশের মানুষের মুক্ত ও অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণের বিকল্প নেই। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এ ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন ঘটবে? উত্তর একটাই- দেশের সব দল ও মতের অবাধ অংশগ্রহণে ভোট বা নির্বাচনপর্ব সম্পন্ন করা। এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাব বলয়ের বাইরে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি নির্বাচন কমিশন বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান- যা নির্বাচন পরিচালনার সব দায়িত্ব পালন করবে। সব দেশেই এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি থাকে বটে, কিন্তু সব দেশে তা সত্যিকারের স্বাধীনতা ভোগ করে না। এবং নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতার ফলে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শাসক দল বা তাদের প্রভাবশালী অনুসারীরা নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এবং তাদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে। ফলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না এবং সঠিক গণপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারিত হয় আরও একটি বিশেষ শর্তকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্র, যা বেশির ভাগ অর্থেই সরকার, তাকে সব শ্রেণি, পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষের অধিকার, যা মানুষের মৌলিক অধিকার, সমানভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর আরেক নাম মানবাধিকার সংরক্ষণ- যা রাষ্ট্রীয় সংবিধানের গচ্ছিত সম্পদ। কোনো রাষ্ট্র যদি সব নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ না করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয় না, আধুনিক হয় না। এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। সব সমাজ বা রাষ্ট্রেই উগ্র জাতীয়তাবাদী বা উগ্র ধর্মীয় বিশ্বাসী গোষ্ঠী থাকে- যারা নিজেদের মতের সমর্থনে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল থাকে। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি নীরব থাকে, কোনো ভূমিকা না রাখে, তাহলে সে রাষ্ট্র উগ্রবাদীদের পরিপূরক অপরাধে যুক্ত হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আরও একটি অবিচ্ছেদ শর্ত। কারণ সব শ্রেণির মানুষ, শেষ অবলম্বন হিসেবে, এ বিভাগের দ্বারস্থ হয় এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। যে রাষ্ট্র বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, সে রাষ্ট্র কেবল অগণতান্ত্রিক নয় বরং তা বহুলাংশে নিপীড়ক হয় এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ উন্মুক্ত করে। আমাদের মতো বহু সংখ্যক দেশেই এ অভিযোগ এন্তার ওঠে যে, রাষ্ট্রশক্তি বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে কিংবা নিয়ন্ত্রণ করে। সবক্ষেত্রে এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হলেও সব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অতএব, বিচার বিভাগকে রাষ্ট্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে হবে; সংবিধান, বিবেক ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রেখে আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বিচার বিভাগের পরাধীনতা, অধঃপতন বা অনৈতিকতা একটি রাষ্ট্রকে পতনের দিকে ধাবিত করে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমের স্বাধীন বিচরণনকে বাধাগ্রস্ত করে না বরং উন্মুক্ত করে। রাষ্ট্রের এ চতুর্থ স্তম্ভের স্বাধীনতা সে কারণে জরুরি। কারণ গণমাধ্যম সমাজের আরশি- যা সমাজসংকট বা দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায্যতার ছবি তুলে ধরে। কোনো গণমাধ্যম সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতা উপেক্ষা করলে বা পরিকল্পিত পন্থায় মিথ্যাচার ছড়ালে বা সমাজ-সংঘাতের কারণ হলে, তার নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবিধান আছে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সমালোচনা হলো বলেই বা শক্তিধরদের অপছন্দের কারণ হলো বলেই কোনো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ হতে পারে না। যদি তা হয় তাহলে সেই সমাজ বন্য হয়, সে রাষ্ট্র সংবিধান ও আইনকে উপেক্ষা করে।
সরকার বা তার অধীনস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষপাতহীন আচরণের বিষয়টি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম অপরিহার্য শর্ত। এমনও লক্ষ করা গেছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও এ শর্তটি পালিত হয় না, তারা স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। সরকার সমর্থক ও সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে আইনের সমান প্রয়োগ হয় না, হয় চরম বৈরী আচরণ। ফলে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা অসার হয় এবং আইনের শাসন অসার হয়ে পড়ে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি একক কোনো বিষয় নয়, বরং একটি সরকার কতটা সংবিধান মেনে চলে, কতটা আইন মেনে চলে, কতটা মানবাধিকার রক্ষা করে, কতটা জবাবদিহিমূলক হয়, কতটা পরমতসহিষ্ণু থাকে, কতটা ভিন্ন মতের সমালোচনাকে গুরুত্ব দান করে এবং কতটা দুর্নীতিমুক্ত হয়, তারই স্বাক্ষর রাখে সুশাসনে। অতএব বলাই বাহুল্য, সুশাসনের অভাব ঘটলে রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে দুর্বৃত্তচক্রে নিমজ্জিত হয়, দুর্নীতিতে নিমগ্ন হয়, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় শক্তির অবৈধ আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়; গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যা অশনিসংকেত।
পৃথিবীতে স্বৈরতান্ত্রিক বা একদলীয় কতিপয় শাসনব্যবস্থা আছে, যাদের কেউ কেউ ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নও সাধন করেছে। কিন্তু এরপরও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠ দৃষ্টান্ত সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান করে নিয়েছে। এসব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা নেই, তা নয়, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমানুষের মতের যে প্রতিফলন ঘটে, সাধারণের যে কর্তৃত্ব থাকে, সরকারি জবাবদিহির যে প্রতিফলন ঘটে, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। অতএব, এর কোনো বিকল্প নেই, প্রয়োজন শুধু এ ব্যবস্থাকে আরও বেশি সার্থক করা, আরও বেশি কার্যকর করা, আরও বেশি গণমুখী করা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও সমাজচিন্তক