২০২৬ সাল শুরু হওয়ার আগেই ভারতের রাজনীতি যেন এক অদৃশ্য নির্বাচনি মিছিলে নেমে পড়েছে। পোস্টার এখনো টাঙানো হয়নি, প্রার্থীদের নাম ঘোষণা হয়নি, কিন্তু রাজনীতি তার আসল কাজটি শুরু করে দিয়েছে- সমাজকে ভাগ করা। ধর্ম, পরিচয়, ভয়, ‘স্মৃতি- এই চারটি অস্ত্র হাতে নিয়েই ভারত ঢুকে পড়ছে আর একটি নির্বাচনি বছরে।
এ বছর চারটি বিধানসভা নির্বাচন হবে। আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যেই শেষ হবে তামিলনাড়ু, কেরালা, পুদুচেরি এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন। সংখ্যার বিচারে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই। কিন্তু রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে একটি রাজ্যই বাকিদের ছাপিয়ে যাবে, পশ্চিমবঙ্গ। কারণ বাংলায় ২০২৬-এর লড়াই কেবল ক্ষমতার নয়, এটি এক রাজনৈতিক ভাষার গণভোট। এখানে ঠিক হবে, ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথটা কতটা বহুত্ববাদী থাকবে, আর কতটা একরৈখিক হয়ে উঠবে।
২০১৪ সালের পর ভারতীয় রাজনীতিতে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা আর নিছক দলবদলের গল্প নয়। এটি ছিল রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় বদলের প্রকল্প। বিজেপি শুধু ক্ষমতায় আসেনি, তারা রাজনীতির ভাষা, প্রশ্ন করার ধরন এবং ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরা কথাবার্তাকেও বদলে দিয়েছে। ২০২৪-এর পর বিজেপির সংসদীয় শক্তি কিছুটা কমলেও আদর্শগত আত্মবিশ্বাস কমেনি। বরং উল্টোটা হয়েছে। কারণ গত ১০ বছরে তারা বুঝে গেছে, নির্বাচন জেতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক কথোপকথনের দখল। আর সেই দখল বজায় রাখতে রাজ্য রাজনীতিই সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ। ২০২৬-এ সে কৌশলের পূর্ণ প্রয়োগ দেখা যাবে।
চার রাজ্য, এক লক্ষ্য
চারটি বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির কাছে পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র। কোথায় কতটা হিন্দুত্ব কাজ করে, কোথায় উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ দরকার, কোথায় ভয় দেখানোই সবচেয়ে কার্যকর- এসবই মাপা হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এ পরীক্ষার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কারণ এখানে বিজেপির সামনে শুধু একটি সরকার নয়, একটি ঐতিহাসিক সামাজিক চরিত্র দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে এত বছর ধরে ধর্ম ছিল সংস্কৃতির অংশ, রাজনীতির হাতিয়ার নয়।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কাছে এখনো এক অসমাপ্ত যুদ্ধ। ২০১৯-এ সাফল্য, ২০২১-এ ব্যর্থতা। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিজেপি বুঝতে পেরেছে, বাংলা জয় করতে গেলে দিল্লির স্লোগান যথেষ্ট নয়। দরকার বাংলার সমাজকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা।
২০২৬-এ বিজেপির হিন্দুত্ব আর প্রতিক্রিয়াশীল থাকবে না। তা হবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক। ধর্মীয় শোভাযাত্রা, উৎসবের রাজনীতি, ইতিহাসের পুনর্লিখন- সব মিলিয়ে এক স্থায়ী মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা হবে। এ রাজনীতির লক্ষ্য একটাই- ভোটার যেন নিজেকে আগে হিন্দু ভাবে, পরে বাঙালি। বিজেপির সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বরাবরের মতোই ভয়। NRC-CAA, সীমান্ত, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ এ শব্দগুলো ২০২৬-এর প্রচারে নতুন করে প্রাণ পাবে।
এ ভাষা কেবল মুসলিম সমাজকে কোণঠাসা করার জন্য নয়। এর মাধ্যমে হিন্দু সমাজের মধ্যেও একটি স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করা হবে- সংখ্যা কমছে, সংস্কৃতি বিপন্ন, রাষ্ট্র বিপদে। এ ভয় যত গভীরে ঢুকবে, ততই রাজনীতি যুক্তির জায়গা ছেড়ে আবেগের হাতে চলে যাবে।
তৃণমূলের প্রতিরোধের জায়গা কোথায়? এ প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান সবচেয়ে জটিল। বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তৃণমূল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে দলটি ক্রমশ এক কৌশলগত দ্বিধায় আটকে পড়েছে।
একদিকে মুসলিম ভোটব্যাংক। যারা নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তৃণমূল্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে হিন্দু ভোট যাদের একাংশ বিজেপির ভাষায় প্রভাবিত। এ চাপ সামলাতে গিয়ে তৃণমূল বেছে নিচ্ছে ‘সফট হিন্দুত্ব’। প্রশ্ন হলো, এতে কি বিজেপির আগ্রাসন থামবে? না কি বিজেপির ভাষাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
২০২৬-এর পথে মুসলিম সমাজের অবস্থান হবে সবচেয়ে সংবেদনশীল। বিজেপির আক্রমণাত্মক রাজনীতির মুখে তৃণমূলের ওপর নির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে এক ধরনের হতাশাও। রাজনৈতিক ভাষায় সুরক্ষা কি যথেষ্ট স্পষ্ট? এ অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তনটি ঘটছে সামাজিক স্তরে। রাজনীতি আর শুধু সভা-মিছিলে নেই। এটি ঢুকে পড়েছে পাড়ার সম্পর্ক, স্কুলের পরিবেশ, সামাজিক মাধ্যমে। এটা এখন পরিচয়ের রাজনীতি। আর একবার এ সীমারেখা গাঢ় হলে, তা মুছতে কয়েক প্রজন্ম লাগে।
২০১৯-এর পর ছয় বছর পেরিয়ে গেল। নাগরিকত্বের কী হলো। এবার এসআইআর-এর ভয় দেখিয়ে আবারও ভোটের ঘৃণা কৌশল। মিথ্যাচার আর প্রতারণা ধরা পড়ে গেল। তড়িঘড়ি বাংলায় উড়ে এলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কথা বললেন অনেক। চিঁড়ে ভিজল কি? উলটো ভোটার তালিকায় যোগ্যদের নাম বাতিলের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা সামনে চলে এল। এবার কি তবে মোদি-শাহ-যোগী বাহিনীর ভয় দেখানো এবং ঘৃণার রাজনীতির জবরদস্তি চালু হবে বাংলায়।
উদ্বাস্তুদের নিয়ে বিজেপির দরদ যে আসলে লোক দেখানো, সেটাও ধরা পড়ে গেছে। কী বলেছিল বিজেপি নেতারা। ১ কোটি ২০ লাখ রোহিঙ্গা তাড়ানো হবে। তার জন্যই নাকি এসআইআর। বাংলাদেশ থেকে নাকি লাখে লাখে মুসলমান অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছে এ দেশে। বিহারেও একই ভাষ্য চলছিল। ‘ঘুষপেটিয়াকো উখাড় দেখা’র জন্যই নাকি এসআইআর। কিন্তু বিহারের ভোটার তালিকায় বাতিল ঘুষপেটিয়া তো মিলল না। এ রাজ্যের বাস্তবটা কী। দেখা যাচ্ছে বিজেপির প্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যে।
সেই মিথ্যাচারের ফানুস ফেটে গেছে। তথ্য কী বলছে? ইতোমধ্যেই এসআইআর-এর ফলে খসড়া ভোটার তালিকা-২০২৬ প্রকাশ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এতে শুধু বাদ গেছে মৃত, ডুপ্লিকেট অ্যান্ট্রি, শিফটেড এবং আনট্রেসডদের নাম। এ তালিকাতেও বেশ কিছু ভুল ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে। এরপর শুনানিতে ডাকা হবে তাদের, যাদের ম্যাপিং মিলছে না অর্থাৎ অমিল বা সন্দেহজনক ভোটার। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ম্যাপিং না মেলার গড় ৩.৯৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬ শতাংশ। এদের হিয়ারিংয়ে যেতে হবে, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার মতুয়া অধ্যুষিত বিভিন্ন বিধানসভায় এ অমিল সংখ্যার গড় ৯.৪৩ শতাংশ। গাইঘাটায় এ পরিমাণ ১৪.৫১ শতাংশ। বাগদায় ১২.৫১ শতাংশ। বনগাঁয় প্রায় ১১ শতাংশ। রানাঘাটে ১১ শতাংশের আশপাশে। কল্যাণীতে প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থাৎ বিরাট সংখ্যার উদ্বাস্তু এবং মতুয়া মানুষকে সন্দেহজনক বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। অগ্নিপরীক্ষায় বসতে হবে তাদের। ভোটার তালিকা থেকে এদের নাম বাদ দেওয়ার মতো করেই ব্যবস্থাপনা।
অন্যদিকে কী খবর মুসলমান অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন বিধানসভার। রাজ্যের সবচেয়ে বেশি ভোটারের ম্যাপিং মিলেছে ডোমকল বিধানসভায়। যেখানে ৮০ শতাংশের বেশি মুসলমান মানুষের বাস। গত লোকসভা ভোটে যে সিটে লিড নিয়েছিল সিপিআই (এম), সেই রানিনগরে সন্দেহপূর্ণ ভোটার মাত্র ০.১ শতাংশ। সুজাপুর, সামশেরগঞ্জ, হরিহরপাড়া- এসব বিধানসভায় সন্দেহপূর্ণ ভোটারের সংখ্যা ১ শতাংশের আশপাশে। বাংলার সার্বিক গড়ের থেকেও অনেক কম। এগুলো সবকটিই কিন্তু মুসলিম অধ্যুষিত বিধানসভা।
এটা স্পষ্ট যে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে চলেছেন Undocumented Citizens, কাগজের শক্তি কম এমন মানুষ, ভোটার এবং নাগরিকরা। যারা মূলত গরিব মানুষ। সহায় সম্বলহীন। পিছিয়ে থাকা। এদের একটা বড় অংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। এরা দেশভাগের শিকার। যারা সাতের দশকে এপারে আসেননি, বলা ভালো আসতে পারেননি। পরে এসেছেন মুখ্যত বাধ্য হয়েই। এদের অথবা কারুর কাছেই তখন অথবা কখনোই নাগরিকত্বের প্রশ্নটা গুরুত্ব পায়নি। কারণ এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন অথবা সংশয় তখন ছিলই না। সংবিধান যখন বলছে- ‘We the people of India’, তখন বিজেপি কি তা নিয়েও প্রশ্ন করতে চায়। অথচ সবাই তো দেশের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ীভাবে বসবাসকারী। স্বানীনভাবেই ভোটাধিকার সম্পন্ন।
গোলমালটা পাকালো ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে। পাকালো বিজেপি আর তৃণমূল। এনডিএ সরকারের আমলে। আইনটা বদল করে কাগজহীন নাগরিকদের বেআইনি বলে লাগিয়ে দিল। সন্দেহজনক, ঘুষপেটিয়া, বিদেশি, উইপোকা, জেরিয়া, যা খুশি বলে অভিযুক্ত করল। স্থায়ীভাবে বসবাসকারী এই গরিব মানুষের পরিচিতি এবং অস্তিত্ব নিয়েই নানাভাবে ভয় দেখানোর ব্যবস্থা করল। অথচ, যার যা মত-ই থাকুক না কেন, এরা এ দেশেরই মানুষ। এ দেশেরই ভোটার। দেশের আইন অনুযায়ী ২০১৪-এর ডিসেম্বরের আগে থেকে উদ্বাস্তু, হিন্দু, মতুয়া যারা এ দেশে আছেন তারা নাগরিকত্বের অধিকারী। Deened Citizen, ২০২৪-এর ডিসেম্বরের আগে থেকে যারা আছেন, তারা আইনের বিবেচনায় এ দেশে থেকে যাওয়ার অধিকারী।
এসআইআর-এর মতো একটি স্বাভাবিক নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে রাজা এবং দেশের শাসক দল কেমন একটা যুদ্ধের বিষয়ে পরিণত করে ফেলেছে। আর তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির বাড়তি ঘোষণা, রাজ্যজুড়ে ৭০০ সিএএ সহায়তা ক্যাম্প তৈরির। সিএএর কথা যখন প্রথম এসেছিল তখন মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে তার দল স্লোগান দিয়ে মিছিলও করেছিল। পরে আবার ঘুরপথে এনপিআর-এর রাস্তা পরিষ্কারও করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, যে রাজ্যগুলোতে এসআইআর হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি পশ্চিমবঙ্গের।
মঙ্গোলিয়ান প্রাধান্যসম্পন্ন, ককেশিয়ান এবং দ্রাবিড়িয়ান এথনিক গ্রুপভুক্ত বাংলার সাড়ে ১০ কোটি মানুষ সাতটি প্রধান ধর্মের অনুসারী। গোটা দেশেই তাই। এই মানুষগুলো একটাই ভারতীয় পরিচয় নিয়ে ১২২টা ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলে, মত প্রকাশ করে, বিরোধ করে। যে অধিকার তাদের দিয়েছে এ ভারতের সংবিধান, এ ভারতের জাতীয় পতাকা। এ পরিচয় ছাড়া বাকি অন্য কোনো পরিচয়ই এই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ছিলও না, হবেও না।
বাম ও কংগ্রেসের দুর্বলতা বাংলার রাজনীতিকে কার্যত জিমেক করে তুলেছে। এ দ্বিমেরুতা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। কারণ তখন নীতি নয়, পরিচয়ই হয়ে ওঠে রাজনীতির একমাত্র মাপকাঠি। ২০২৬ সালের নির্বাচন শেষ হলে একটি সরকার গঠিত হবে। সে বিজেপির হোক বা তৃণমূলের। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন থাকবে- কোন রাজনীতি স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হলো?
ভয়ের রাজনীতি? না কি সহাবস্থানের রাজনীতি। এ সিদ্ধান্ত শুধু ব্যালট বাক্সে নেওয়া হবে না। নেওয়া হবে দৈনদিন কথোপকথনে, সংবাদমাধ্যমে, সাংস্কৃতিক পরিসরে। বাংলা বহুবার ইতিহাসে দেখিয়েছে, সে মাথা নত করে না। কিন্তু ইতিহাস নিজে থেকে ফিরে আসে না। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। ২০২৬ তাই শুধু একটি নির্বাচন নয়। এটি বাংলার আত্মপরিচয়ের এক কঠিন পরীক্ষা।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক