ঢাকা ৫ শ্রাবণ ১৪৩১, শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি গারো পাহাড়ের জেলা শেরপুর

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩৩ পিএম
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫৩ এএম
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি গারো পাহাড়ের জেলা শেরপুর
ছবি : খবরের কাগজ

‘পর্যটনের আনন্দে, তুলশীমালার সুগন্ধে’, এ স্লোগানে শেরপুর জেলাকে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা গারো পাহাড় বেষ্টিত সীমান্তবর্তী জেলা এটি। এ জেলার রয়েছে শাল-গজারি, ইউকিলিপটাস-আকাশমনি, সেগুন-মেহগিনিসহ নানা প্রজাতির গাছ-গাছালি ঘেরা ঊঁচু নিচু টিলা। আর পাহাড়ি এই টিলা বেয়ে সমতলের দিকে ছুটে চলা ছোট ছোট ঝর্ণা, ছড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির কলকল শব্দ যে কোনো প্রকৃতি প্রেমির হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। 

ওই সব পাহাড়ি টিলার উপর এবং সমতলে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির নানা সম্প্রদায়দের লোকদের সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে উচু-নিচু পাহাড়ের মেঘ-রোদ্দুরের খেলা আর সীমান্তের ওপারের ভারতীয় অধিবাসিদের ঘর-বাড়ির দৃশ্য মন ছুয়ে যায়, হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি এ জেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্যটন সমৃদ্ধ স্থান। ভ্রমণ পিপাসুরা ইট, কাঠ, কংক্রিট আর পাথুরে নগর জীবনের কোলাহল ছেড়ে ছুটে আসেন এসব পার্কে। এরইমধ্যে মধুটিলা ইকোপার্ক, গজনী অবকাশ, রাজার পাহাড়, নাকুগাঁও স্থল বন্দর, অর্কিড পর্যটন কেন্দ্র, রাবার বাগান, পানিহাটা-তারানি, মাইসাহেবা জামে মসজিদ, সীমান্ত সড়ক, জমিদারবাড়ি অন্যতম। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রকৃতির নিপূণ ছোঁয়ার রংতুলিতে আঁকা ছবির মতো সৌন্দর্য দেখতে শেরপুরে ছুটে আসেন ভ্রমন পিপাসুরা।

মধুটিলা ইকোপার্ক

প্রকৃতির সবুজ লীলা ভূমি শেরপুর জেলার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র নালিতাবাড়ী উপজেলায় স্থাপিত ‘মধুটিলা ইকোপার্ক’। প্রায় সারাবছর ভ্রমণপিয়াসীদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে এই পার্ক। সীমান্তবর্তী এই পার্কের চারপাশে উচু নিচু পাহাড়ি টিলা, কৃত্রিম লেক আর সবুজের সমারোহ দেখতে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা ভিড় জমান। শেরপুর জেলা শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে নালিতাবাড়ী উপজেলা। এ উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে ময়মনসিংহ বনবিভাগের ব্যবস্থাপনায় মধুটিলা ফরেষ্ট রেঞ্জের সমেশ্চুড়া বন বীটের আওতায় ৩৮০ একর বনভূমিতে গারো পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে ২০০০ সালে নির্মিত হয় মধুটিলা ইকোর্পাকটি।

এই পার্কটির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে সারি সারি গাছ। রাস্তার ডান পাশে খোলা প্রান্তর আর দুইপাশে রকমারি পণ্যের দোকান। সামনের ক্যান্টিন পার হলেই পাহাড়ি ঢালু রাস্তা। এরপরই হাতি, হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, বানর, কুমির, ক্যাঙ্গারু, মৎস্যকন্যা, মাছ ও পাখির ভাষ্কর্য। পাশের আঁকাবাঁকা পথে ঘন গাছের সারি ছুটে গেছে কৃত্রিম লেকের দিকে। এই লেকের উপরে স্বকীয় দূতি ছড়াচ্ছে মনমুগ্ধকর ষ্টারব্রিজ। এসব দেখে প্রাণ পায় নবচেতনা, মন হারায় প্রকৃতির মাঝে। লেকের প্যাডেল বোটে চরে ঘুরাফেরার পর পাহাড়ের চুড়ায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে আরোহণ করলেই নজর কেড়ে নেয় ভারতের উঁচু নিচু পাহাড় আর সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন ভ্রমণ পিপাসুরা। 

মধুটিলা ইকোপার্কে ঢুকতে জনপ্রতি টিকিট ১০ টাকা, গাড়ী পার্কিং খরচ- বড় বাস ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা, সিএনজি ৫০ টাকা ও মোটরসাইকেল ২০ টাকা। এছাড়া এখানে আলাদা আলাদা ফি দিয়ে প্যাডেল বোট চালানো, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠা, শিশু পার্কে প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত শুধু দিনের বেলায় ব্যবহারের জন্য (ভ্যাটসহ) ৬ হাজার ৯০০ টাকার বিনিময়ে চার কক্ষ বিশিষ্ট শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) সুসজ্জিত মহুয়া নামের রেষ্ট হাউজ রয়েছে। 

গজনী অবকাশ

ভারত সীমান্তঘেঁষা উঁচু-নিচু পাহাড়বেষ্টিত এই পর্যটনকেন্দ্রে নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গারো পাহাড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব এক লীলাভূমি। আর তাই শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা ঝিনাইগাতীর ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের গজনী অবকাশের পাদদেশে অবস্থিত সারি সারি শাল, গজারি, সেগুনগাছ; ছোট-বড় মাঝারি টিলা, লতা-পাতার বিন্যাস, যা প্রকৃতি ও পর্যটকের মনে নিশ্চিত দোলা দিয়ে যাবে।

শেরপুর জেলা শহর থেকে মাত্র ৩০কিলোমিটার দূরত্বে ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গজনী অবকাশ কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়। ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের প্রায় ৯০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে এর অবস্থান। গড়ে ওঠার পর থেকেই প্রতিবছর ক্লান্ত জীবনের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে অবসরে হাজারো পর্যটক ভিড় করেন এই গজনী অবকাশ কেন্দ্রে। 

শেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন করে পাহাড়ের বুকজুড়ে তৈরি হয়েছে সুদীর্ঘ ওয়াকওয়ে, যেখানে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের স্পর্শ নিয়ে লেকের পাড় ধরে হেঁটে যাওয়া যাবে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। উঁচু পাহাড় কেঁটে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। এ ছাড়া রয়েছে আগত শিশু দর্শনার্থীদের জন্য চুকুলুপি চিলড্রেনস পার্ক, সেখানে ফ্লাইওভার গজনী এক্সপ্রেস ট্রেনের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে শিশু কর্নার, সুপার চেয়ার, নাগরদোলা ও মেরিগো। গজনী অবকাশে থাকছে শেরপুর জেলা ব্র্যান্ডিং কর্নার। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য এবার নতুন তৈরি করা হচ্ছে ক্যাবল কার। এছাড়াও রয়েছে ক্রিসেন্ট লেক, লেকের ওপর রংধনু ব্রিজ, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিফলক, মাটির নিচে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাতায়াতের জন্য ড্রাগন ট্যানেল। অবকাশকেন্দ্রের অন্যতম আকর্ষণ সাইট ভিউ টাওয়ার। ৮০ বর্গফুট উচ্চ এ টাওয়ারে উঠলে দেখা যাবে পুরো গজনী অবকাশের পাহাড়ি টিলার অপরূপ সৌন্দর্যময় সবুজ দৃশ্য।

রাজার পাহাড়

শেরপুর জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোট বড় টিলা, শাল গজারীর বন, পাহাড়ের নিচে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। সেখানেই আছে সুবিশাল ও রোমাঞ্চকর রাজা পাহাড়। পর্যটকদের কাছে শেরপুরে অন্যতম আকর্ষণ হলো রাজার পাহাড়। শেরপুর জেলা শহর থেকে মাত্র ৪১ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদী উপজেলার কর্নঝোড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় রাজার পাহাড়ের অবস্থান। এটি জনপ্রিয় বিনোদন স্পট। 

গারো পাহাড়ে যতগুলো পাহাড় আছে তার মধ্যে রাজার পাহাড়ের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি। এ পাহাড়ের বৈশিষ্ট সিলেট বা বান্দরবানের পাহাড়ের মতো না হলেও, সবুজের ঐশ্বর্যে সে কারও চেয়ে কোন অংশে কম নয়। রাজার পাহাড়ের উৎপত্তি নিয়ে কিংবদন্তি অনেক ঘটনা আছে। স্থানীয়দের মতে, অতীতে পাগলা দারোগা নামে এক ব্যক্তি রাজার পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস শুরু করেন। এখনও তার সন্তানেরা এই অঞ্চলে আছেন। তারাই এ পাহাড়ের কোণায় গড়ে তোলেন বিভিন্ন ফলের বাগান। পরে স্থানীয় আদিবাসীরাও এসব ফলের বাগান করা শুরু করে। 

নাকুগাঁও স্থল বন্দর

প্রতিদিন ভোর হলেই শ্রমিকরা দলে দলে ছুটে আসেন স্থলবন্দরে কাজ করতে। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা নয়াবিল ইউনিয়নে স্থাপিত দেশের অন্যতম নাকুগাঁও স্থলবন্দর এখন হাজারো শ্রমিকের কর্মস্থল। এই বন্দরটি আমদানি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন দিগন্তের পথ দেখাচ্ছে। এটি চালু হওয়ায় স্থানীয়রাসহ দেশের নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা করতে এসে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, দর্শনার্থীরাও আসেন এই বন্দর দেখতে। কারণ, বন্দরটি একেবারে ভারতের সাথে লাগোয়া। তাই দর্শনার্থীদের কমতি নেই এটি দেখার।

অর্কিট পর্যটন

প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে হলে আপনাকে আসতে হবে শেরপুরের অর্কিট পর্যটন কেন্দ্র। শেরপুর জেলা শহরের মধ্যেই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে অর্কিট পর্যটন কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের চারিদিকে রয়েছে সারি সারি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছ, মাঠ জুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাস আর আছে সান বাঁধানো পুকুর। সাদা বক পুকুরে চারপাশে বসে থাকে মাছ খাওয়ার জন্য। সবুজ বাতায়নে অর্কিড প্রাঙ্গণে খাঁচায় খেলা করছে বানর, টার্কি, খরগোশসহ দেশীয় বিভিন্ন জীবজন্তু। 

রাবার বাগান

শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় রয়েছে রাবার বাগান। সারি সারি রাবার গাছ, ফলজ, শাল, গজারী ও সেগুনবনের বিন্যাস খুব সহজেই প্রকৃতি প্রেমীদের হৃদয়ে নিশ্চিত দোলা দিয়ে যাবে । পাহাড়ি র্ঝণা ও ঝোড়ার স্বচ্ছ জল হৃদয়ে তুলবে আনন্দের হিন্দোল। পাহাড়, বনানী, র্ঝণা এতসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেও কৃত্রিম সৌন্দর্যের অনেক সংযোজন আছে তিনটি বাগানেই।

পানিহাটা-তারানি পাহাড়

ইট-পাথরের জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে ও প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে হলে আপনাকে আসতে হবে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা-তারানি পাহাড়ে। শেরপুর জেলা শহর থেকে ২৬কিলোমিটার দূরে পানিহাটা-তারানি পাহাড়। এ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সবুজ বন আর খরস্রোতা ভোগাই নদীর মিতালী আপনার মনকে উদ্বেলিত করবে। 

মাই সাহেবা মসজিদ

শেরপুর জেলা শহরে পা রাখলে প্রথমেই যে পুরোনো ঐতিহ্য চোখে পড়বে তার নাম মাইসাহেবা মসজিদ। চোখ বন্ধ করে শেরপুরের নাম নিলেও এই মাইসাহেবা মসজিদটি ভেসে আসে দর্শনার্থীদের নজরে। আনুমানিক আড়াইশ’ বছর আগে নির্মিত হয় মসজিদটি। তবে আধুনিক সংস্করণেও রয়েছে ঐতিহ্যের ছাপ। এর দুই পাশের সুউচ্চ ২টি মিনার চোখে পড়ে অনেক দূর থেকে। মাইসাহেবা মসজিদের সুউচ্চ মিনার শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখা যায়। মসজিদ এলাকায় প্রবেশের জন্য রয়েছে বিশাল দৃষ্টিন্দন গেইট।

আরও যা রয়েছে

জরিপ শাহের মাজার, বারদুয়ারি মসজিদ, গড়জরিপা দুর্গ, হযরত শাহ কামাল (রা) এর মাজার, কসবার মোঘল মসজিদ, ঘাঘড়া লস্কর খান জামে মসজিদ, সুতানাল দীঘি, রাবার ড্যাম, বন্যহাতির অভয়ারণ্য নয়াবাড়ির টিলাও শেরপুরের পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান।

যেভাবে আসবেন এসব যাওয়ায়

রাজধানী ঢাকার মহাখালীর বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা যেকোন বাসে অথবা ঢাকার যেকোন স্থান থেকে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারে করে শেরপুর জেলায় আসা যায়। গাড়ীযোগে এ জেলায় আসতে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগে। যেহেতু শেরপুর জেলায় ট্রেনের সুবিধা নেই। সেহেতু আপনি চাইলে ট্রেনেও আসতে পারেন। এজন্য আপনাকে ঢাকার কমলাপুর থেকে ট্রেনে করে জামালপুর জেলা শহরে আসতে হবে। তারপর সেখানে থেকে সিএনজি, অটোরিক্সা বা বাসযোগেও মাত্র ৩০/৪০মিনিটের মধ্যে শেরপুর জেলায় আসতে পারবেন। এ জেলার সকল দর্শনীয়স্থানে যেতে হলে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি বা অটোরিক্সা ভাড়া করে যেতে পারবেন। শেরপুর সদর থেকে এসব দর্শনীয়স্থানে যেতে সময় লাগবে দূরত্ব ভেদে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে।

যেখানে রাত্রি যাপন করবেন

দর্শনার্থীরা শেরপুর এসে রাত্রিযাপন করতে চাইলে জেলা শহরে থাকতে হবে। কারণ, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ঘেঁষা সীমান্তবর্তী এ জেলার কোন পর্যটন কেন্দ্র বা দর্শনীয়স্থানে রাত্রিযাপনের কোন সুবিধা নেই। তবে, আপনি চাইলে স্ব স্ব উপজেলার ডাক বাংলোয় ভাড়া করে থাকতে পারবেন। তবে, জেলা শহরে বেশ কয়েকটি ভালোমানের আবাসিক হোটেল ছাড়াও রয়েছে জেলা সার্কিট হাউজ, জেলা পরিষদ, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের গেস্ট হাউজে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। জেলা সদরের ভালোমানের আবাসিক হোটেলগুলোর মধ্যে হোটেল সম্পদ, হোটেল আইসার ইন, হোটেল ফ্রিডম, হোটেল অবকাশ, হাসিম গেস্ট হাউজ অন্যতম।

এক বৃষ্টির দিনে রাতারগুলে

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
এক বৃষ্টির দিনে রাতারগুলে
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট

প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ও সেতুবন্ধন তৈরির অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ভ্রমণ। ভ্রমণ মানেই প্রশান্তি এবং আনন্দ। তাই তো যখনই সময় পাই, প্রকৃতির কাছে ছুটে যাই। কারণ প্রকৃতি আমাদের বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য লাভের আশায় আমিও মাঝে মধ্যে ব্যাকুল হয়ে উঠি। অনেক দিন ধরে আমাদের পরিকল্পনায় ছিল সিলেট ভ্রমণ। এর আগেও সিলেটে ভ্রমণ করেছি। তবে সেটা ছিল ঝটিকা সফর। শুনেছি বৃষ্টিতে সিলেট নাকি অন্য রূপে সাজে। তাই বৃষ্টির দিনেই সিলেটে রওনা হলাম।

তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে আমাদের গন্তব্য ছিল রাতারগুল। নিয়ম অনুযায়ী আমরা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কিন্তু তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। হোটেলের জানালা থেকে বাইরের রাস্তা দেখা যায়। আমাদের গাড়ি ইতোমধ্যে চলে এসেছে। তবে বৃষ্টির কারণে কেউই নামতে চাইছে না। সকাল ৭টায় বৃষ্টি কিছুটা কমলে আমরা হোটেল থেকে বের হই। পাশের একটি হোটেলে সকালের নাশতা শেষ করে গাড়িতে উঠি। আমাদের গন্তব্য ‘রাতারগুল’।

বর্ষায় বাংলার অ্যামাজন নামে পরিচিত সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুল আমাদের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। রাতারগুল আমাদের দেশের একমাত্র ‘ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট’ বা জলাবন। সিলেট থেকে দেশের একমাত্র স্বীকৃত এই সোয়াম্প ফরেস্টের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ইউনিয়নে এ জলাবনের অবস্থান।

উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী গোয়াইন নদী, দক্ষিণে বিশাল হাওর; মাঝখানে জলাবন রাতারগুল। উইকিপিডিয়ায় পাওয়া তথ্যমতে পৃথিবীতে স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশ আছে দুটি। একটা শ্রীলঙ্কায়, আরেকটি আমাদের রাতারগুলে। অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ বনের সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র অ্যামাজনের। রেইন ফরেস্ট নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের স্বাদুপানির সবচেয়ে বড় জলাবন কিন্তু এটিই।

সিলেটের স্থানীয় ভাষায় মুর্তা বা পাটিগাছ ‘রাতাগাছ’ নামে পরিচিত। সেই মুর্তা অথবা রাতাগাছের নামানুসারে এই বনের নাম হয়েছে রাতারগুল। অ্যামাজনের মতোই এখানকার গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশ বছরে চার থেকে সাত মাস পানির নিচে থাকে। ভারতের মেঘালয়ের জলধারা গোয়াইন নদীতে এসে পড়ে, আর সেখানকার এক সরু শাখা চেঙ্গী খাল হয়ে পানি পুরো রাতারগুল জলাবনকে প্লাবিত করে। বর্ষা মৌসুমের প্রায় সবসময়ই পানি থাকে বনে (মে-সেপ্টেম্বর)। শীতকালে অবশ্য সেটা হয়ে যায় আর দশটা বনের মতোই। যেন পাতা ঝরা শুষ্ক ডাঙা। আর ছোট ছোট খাল হয়ে যায় পায়ে চলা মেঠোপথ। তখন জলজ প্রাণিকুলের আশ্রয় হয় বন বিভাগের খোঁড়া বড় বড় ডোবা।

নৌকায় পর্যটকরা

বর্ষায় বড়ই অদ্ভুত এই জলের রাজ্য। এ সময় কোনো গাছের কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলোর আবার শরীরের অর্ধেকই জলে তলিয়ে যায়। এ সময় কোথাও চোখে পড়ে জেলেরা মাছ ধরছেন। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন যেন অন্ধকার লাগে পুরো বনটা। মাঝে মধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দেয় পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে চলতে হয়। তবে বর্ষায় এ বনে চলতে হয় খুব সাবধানে। কারণ রাতারগুল হচ্ছে সাপের আখড়া। বর্ষায় পানি বাড়ায় সাপেরা ঠাঁই নেয় গাছের ওপর।

বন বিভাগের তথ্যমতে, এই বনের আয়তন ৩ হাজার ৩২৫ দশমিক ৬১ একর। এর মধ্যে ৫০৪ একর বন ১৯৭৩ সালে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। বিশাল এ বনে জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও বেত, কদম, হিজল, মুর্তাসহ নানা জাতের পানিসহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে বন বিভাগ। রাতারগুল বনে সাপের মধ্যে নির্বিষ গুইসাপ, জলঢোড়া ছাড়াও রয়েছে গোখরাসহ বিষাক্ত অনেক প্রজাতি। বর্ষায় বনের ভেতর পানি ঢুকলে এসব সাপ গাছের ওপর ওঠে।

বনের ভেতর দাপিয়ে বেড়ায় মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালী, বানর, ভোঁদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। টেংরা, খলিশা, রিঠা, পাবদা, মায়া, আইড়, কালবাউস, রুইসহ আরও অনেক জাতের মাছ পাওয়া যায় এ বনে। পাখিদের মধ্যে আছে সাদা বক, কানি বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল ও বাজ। শীতে মাঝে মধ্যে আসে বিশালকায় সব শকুন। আর লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ঘাঁটি গাড়ে বালিহাঁসসহ হরেক জাতের পাখি। শুকনো মৌসুমে ডিঙি নিয়ে ভেতরে গেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আপনাকে উড়ে সরে গিয়ে পথ করে দেবে। এ দৃশ্য আসলেই দুর্লভ।

গাছের মধ্যে এখানে করচই বেশি। হিজলে ফল ধরে আছে শয়ে শয়ে। বটও চোখে পড়বে মাঝে মধ্যে। আর বনের দক্ষিণে মুর্তা (পাটি) গাছের প্রাধান্য। রাতারগুলের বেশ বড় একটা অংশে বাণিজ্যিকভাবে মুর্তা লাগিয়েছে বন বিভাগ। মুর্তা দিয়ে শীতল পাটি হয়। মুর্তা বেশি আছে নদীর উল্টো পাশে। এ ছাড়া ওদিকে শিমুল বিল হাওর আর নেওয়া বিল হাওর নামে দুটি বড় হাওর আছে।

বর্ষায় হাওরের স্বচ্ছ পানির নিচে ডুবে থাকা গাছগুলো দেখার অভিজ্ঞতা অপূর্ব। শীতকালে আবার বনের ভিন্নরূপ। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে মুর্তা ও জালি বেতের বাগান। সে সৌন্দর্য আবার অন্য রকম! বন এভাবে জলে ডুবে থাকে বছরে চার থেকে সাত মাস। বর্ষা কাটলেই দেখা যাবে অন্য চেহারা। তখন বনের ভেতরের ছোট নালাগুলো পরিণত হবে পায়ে চলা পথে। সেই পথ দিয়ে হেঁটে অনায়াসে ঘুরে বেড়ানো যায়।

রাতারগুল বনে ঢুকতে হয় ডিঙি নৌকায় চেপে। নৌকা একবার বনে ঢুকলেই আর কথা নেই। দুটি মাত্র শব্দ লাগবে আপনার ভাব প্রকাশের জন্য। আপনি হয়তো বলে উঠবেন- ‘আমি মুগ্ধ’! আর বোনাস হিসেবে পাবেন গোয়াইন নদী দিয়ে রাতারগুল যাওয়ার অসাধারণ সুন্দর পথ। এ ছাড়া নদীর চারপাশের দৃশ্যের সঙ্গে দেখবেন দূরে ভারতের মিজোরামের উঁচু সবুজ পাহাড়।

এ তো গেল রাতারগুলের বর্ণনা। এখন আলোচনা করব আমাদের ভ্রমণ নিয়ে। আমরা সিলেটের সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে রাতারগুলে এসে পৌঁছেছি, তা বুঝতেই পারলাম না। আমরা যখন স্পটে এসে পৌঁছেছি, তখন বৃষ্টি ছিল না। এসে দেখি অনেক পর্যটক এসেছে। বিদেশিরাও আছেন তাদের মধ্যে। দেখে মনে হলো, রাতারগুল ইতোমধ্যে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। যাই হোক, রাতারগুল বনের মধ্যে প্রবেশ করতে হলে নৌকা নিয়ে যেতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দারাই নৌকা ভাড়া দেন। ভাড়া একটু বেশি। তবে এত দূরে খরচ করে এসে ভাড়ার কথা চিন্তা করলে হবে না।

বৃষ্টির ভরা মৌসুমে রাতারগুল পানিতে টইটুম্বুর। হাওরের অথই পানি দেখে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয়ে নৌকাতে উঠতে চাইল না। আমরা দুটি নৌকা নিয়ে রওনা হলাম। এখানে বাচ্চারাও নৌকা চালায়। পড়ালেখার পাশাপাশি অবসরে তারা নৌকা ভাড়া দিয়ে আয় করে। আমাদের নৌকা যখন হাওরের মাঝখানে, ঠিক তখন আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। বুঝতে বাকি নেই যে বৃষ্টি হবে। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু।

আমাদের মতো অনেকেই রওনা হয়েছে রাতারগুলের উদ্দেশে। কারও কারও কাছে ছাতা ছিল বলে রক্ষা। তবে আমাদের কাছে কোনো ছাতা ছিল না। তাই স্থির করলাম বৃষ্টিতে ভিজেই রাতারগুল দেখব। ঝুম বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে হাওরের জলে নৌকার ওপর গলা ছেড়ে গান ধরলেন আমাদেরই এক বন্ধু। আমাদের নৌকার মাঝি ছিল ছোট দুটি ছেলে। ওরাও গান ধরল। আমরা প্রবেশ করলাম রাতারগুলে। আহা, কী রূপ! চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না এই যে আমাদের বাংলাদেশ। সত্যি বাংলার রূপ পৃথিবীর সব রূপের চেয়ে সেরা। অনেকটা সময় আমরা নৌকায় করে বনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এরপর উঠলাম ওয়াচ টাওয়ারে। সেখানে উঠে পুরো রাতারগুলের ভিউটা চমৎকারভাবে দেখা যায়। বৃষ্টি ভেজা রাতারগুল সত্যি চমৎকার। আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা ছিলাম। এরপর আবারও নৌকায় করে ফিরে আসলাম গাড়ির কাছে। গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম সিলেট শহরের উদ্দেশে। চমৎকার একটি দিন কাটিয়ে গেলাম রাতারগুলে আর হৃদয়টা রেখে গেলাম হাওরের জলে।

যেভাবে যেতে হবে
রাতারগুল যাওয়া যায় বেশ কয়েকটি পথে। তবে যেভাবেই যান, যেতে হবে সিলেট থেকেই।

প্রথম উপায়: সিলেট থেকে জাফলং-তামাবিল রোডে সারিঘাট হয়ে সরাসরি গোয়াইনঘাট পৌঁছানো। এরপর গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে। ভাড়া ৯০০-১৫০০ এর মধ্যে (আসা-যাওয়া), আর সময় লাগে দুই ঘণ্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে ঘণ্টাপ্রতি লাগবে ৫০০-৮০০ টাকা।

দ্বিতীয় উপায়: সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে গোয়াইনঘাট পৌঁছানো, ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। ওসমানী এয়ারপোর্ট-শালুটিকর হয়ে যাওয়া এ রাস্তা বর্ষাকালে খুবই সুন্দর। এরপর একইভাবে গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে। ভাড়া ৮০০-১৫০০ টাকার মধ্যে (আসা-যাওয়া), আর সময় লাগে দুই ঘণ্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে মাঝি ঘণ্টাপ্রতি নেবে ৪০০-৫০০ টাকা।

আরও একটি উপায়ে পৌঁছাতে পারেন রাতারগুল। সেটা হচ্ছে সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে মোটরঘাট (সাহেব বাজার হয়ে) পৌঁছাতে হবে। ভাড়া নেবে ২০০-৩০০ টাকা, আর সময় লাগবে ঘণ্টাখানেক। এরপর মোটরঘাট থেকে সরাসরি ডিঙি নৌকা নিয়ে বনে চলে যাওয়া যায়। এতে ঘণ্টাপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা লাগবে। এই তৃতীয় পথটিতেই সময় ও খরচ সবচেয়ে কম।

কিছু সতর্কতা
রাতারগুল বা তার আশপাশে খাবারের হোটেল বা থাকার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার গোয়াইনঘাট বা সিলেট থেকে নিয়ে যেতে পারেন। আরেকটা বিষয়, নৌকায় বেড়ানোর সময় পানিতে হাত না দেওয়াই ভালো। জোঁকসহ বিভিন্ন পোকামাকড় তো আছেই, বর্ষায় বিষাক্ত সাপও পানিতে বা গাছে দেখতে পাওয়া যায়। সাঁতার না জানলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখা জরুরি। এ ছাড়া ছাতা, বর্ষাতি কিংবা রোদ টুপিও সঙ্গে নিতে হবে। এখানে বেড়ানোর নৌকাগুলো অনেক ছোট। এক নৌকায় পাঁচজনের বেশি উঠবেন না।

জাহ্নবী

বাংলাদেশের সুন্দর ঝরনা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৪ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৪ পিএম
বাংলাদেশের সুন্দর ঝরনা
বান্দরবানের থানচির নাফাখুম জলপ্রপাত

বাংলাদেশে ঝরনার অভাব নেই। বর্ষাকালে এই ঝরনাগুলোর রূপ হয়ে ওঠে আরও সুন্দর। চাইলে আপনিও দেখে আসতে পারেন দৃষ্টিনন্দন এসব ঝরনা। আজ থাকছে দেশের দৃষ্টিনন্দন কিছু ঝরনার কথা। লিখেছেন আবুল হাসান

তিনাপ সাইতার ঝরনা
বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত তিনাপ সাইতার বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে অবস্থিত। অনেকের কাছে পাইন্দু সাইতার নামে পরিচিত। তিনাপ সাইতার হার্ড ট্রেকিংয়ের জন্য একটি আদর্শ জায়গা। ধৈর্য এবং শারীরিক সামর্থ্য থাকলেই কেবল তিনাপ সাইতারের অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তিনাপ সাইতার দেখতে হলে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে আবার একই পথে ফিরে আসতে হয়।

নাফাখুম জলপ্রপাত
বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে অবস্থিত নাফাখুম জলপ্রপাত পানি প্রবাহের পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জলপ্রপাত হিসেবে আখ্যায়িত। অনেকে এই জলপ্রপাতকে বাংলার নায়াগ্রা নামে আখ্যায়িত করেন। মারমা ভাষায় খুম মানে জলপ্রপাত। নাফাখুম যেতে হলে থানচি বাজার থেকে সাঙ্গু নদী পথে নৌকা দিয়ে রেমাক্রি যেতে হয়। আর রেমাক্রি থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটলে তবেই দেখা মিলে প্রকৃতির এই অনিন্দ্য রহস্যের।

আমিয়াখুম জলপ্রপাত
বান্দরবানের অবস্থিত আমিয়াখুম জলপ্রপাত অনেকের কাছে পরিচিত বাংলার ভূস্বর্গ হিসেবে। কেউ কেউ আবার এই আমিয়াখুমকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাত মনে করেন। সবুজ পাহাড় আর পাথরের মধ্য দিয়ে সাদা রঙের ফেনা ছড়িয়ে জলধারা বয়ে চলে। প্রবহমান জলের শব্দতরঙ্গ আর ঝরনার বুনো সৌন্দর্য আজীবন মনের গেঁথে থাকার জন্য যথেষ্ট।

ধুপপানি ঝরনা
রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ওড়াছড়িতে রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর ধুপপানি ঝরনা। ২০০০ সালের দিকে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই স্থানে আরাধনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে ঝরনাটি সবার কাছে পরিচিতি লাভ করে। ধুপপানি ঝরনা নামের অর্থ সাদা পানির ঝরনা। এই ঝরনাটি ভূমি থেকে প্রায় ১৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ধুপপানি ঝরনার আশপাশে হরিণ, বুনো শূকর, বনবিড়াল এবং ভাল্লুকসহ বেশ কিছু বন্য প্রাণী বসবাস করে। প্রায় ২ কিলোমিটার দূর থেকেও এই ঝরনার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যায়।

সাইংপ্রা ঝরনা
বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলাযর কির্স তং পাহাড়ের গা বেয়ে চলা সাইংপ্রা ঝরনা এক অনন্য আদিম সৌন্দর্যের ধারক। এই ঝরনা দেখতে যাওয়া মোটেও সহজ নয়। পিচ্ছিল ট্রেইল ধরে হাঁটার সময় প্রতি মুহূর্তে থাকতে হয় সর্বোচ্চ সতর্কতায়। যদিও চারপাশের অপরূপ প্রকৃতি যাত্রাপথে মোটেও হতাশ করে না। আর অনিন্দ্য সুন্দর এই সাইংপ্রা ঝরনার রয়েছে মোট তিনটি ধাপ।

বাকলাই ঝরনা
অভিযাত্রীদের মতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনার নাম বাকলাই। ঝরনাটির উচ্চতা প্রায় ৩৮০ ফুট। বান্দরবনের থানচি উপজেলার বাকলাই গ্রামে অবস্থিত এই ঝরনায় যাওয়ার পথ বেশ দুর্গম। ফলে বান্দরবান শহর থেকে ঝরনা দেখে ফিরে আসতে ৪-৫ দিন সময় লেগে যায়। তাই পাহাড়ের দুর্গম পথে ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া বাকলাই ঝরনায় যাওয়া মোটেও উচিত নয়।

জাদিপাই ঝরনা
বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় অবস্থিত জাদিপাই ঝরনা বাংলাদেশের প্রশস্ততম ঝরনার মধ্যে অন্যতম। আর বর্ষাকালে এই জলপ্রপাতের পানি প্রবাহের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায় তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণকারীরা জাদিপাই ঝরনার রূপ দেখতে আসেন। কেওক্রাডং থেকে প্রায় ২৫০০ ফুট নিচে জাদিপাই ঝরনার অবস্থান হওয়া সেখান থেকে হেঁটে ঝরনায় যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।

দামতুয়া জলপ্রপাত
দামতুয়া ঝরনা থেকে কয়েক শ গজ উপরে দামতুয়া জলপ্রপাতে অবস্থান। আর দামতুয়া জলপ্রপাতের ধাপগুলো যেন প্রকৃতির হাতে গড়া একেকটি অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শন। দামতুয়া জলপ্রপাত দেখতে হলে বান্দরবানের আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে থানচির নতুন রাস্তা ধরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার এগিয়ে গাইডের সাহায্যে পাহাড়ি বনের আরও গভীরে যেতে হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু থানচি রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় চারপাশের অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়ি দৃশ্য কল্পনাকে হার মানায়।

খৈয়াছড়া ঝরনা
সীতাকুণ্ডের মিরসরাইয়ে অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝরনা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝরনাগুলোর একটি। ঝরনার ৯টি ধাপের নান্দনিক সৌন্দর্য দেখে ভ্রমণপিয়াসী মানুষ মুগ্ধ হয়। গ্রামের সবুজ শ্যামল আঁকাবাঁকা মেঠো পথ আর পাহাড়ের হাতছানিতে অনন্য খৈয়াছড়ার আবেদন উপেক্ষা করা কঠিন বলেই প্রকৃতিপ্রেমীরা খৈয়াছড়া ঝরনাকে বাংলাদেশের ঝরনা রানি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হামহাম জলপ্রপাত
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বনাঞ্চলের গভীরে একদল পর্যটক গাইড শ্যামল দেববর্মাকে সঙ্গে নিয়ে হামহাম জলপ্রপাত আবিষ্কার করেন। ২০১০ সাল প্রকাশিত ঝরনাটি স্থানীয়দের কাছে চিতা ঝরনা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৪০ ফিট উচ্চতা হতে নেমে আসা ঝরনার বুনো সৌন্দর্য দেখার আশায় প্রতি বর্ষায় সারা দেশ থেকে ভ্রমণকারীরা হামহামের উদ্দেশে যাত্রা করে।

জাহ্নবী

বর্ষায় পর্যটন

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:৪৩ পিএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:৪৪ পিএম
বর্ষায় পর্যটন
বর্ষায় কক্সবাজারের সৌন্দর্য অন্যরকম। ছবি: প্রশান্ত রায়

বৃষ্টির মৌসুমে প্রকৃতি যেন তার আপন রূপ মেলে ধরে। বাংলার চিরায়ত সবুজ শ্যামল সৌন্দর্য মেলে ধরে বর্ষা। বর্ষায় ঘুরে দেখার জন্য দেশের কিছু জায়গা সম্পর্কে জানাচ্ছেন মোহনা জাহ্নবী

সিলেট
পানি আর সবুজ পাহাড়বেষ্টিত সুন্দর একটি জেলা সিলেট। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ভরা এ জেলায় রয়েছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। যেমন- জাফলং, বিছানাকান্দি, লোভাছড়া, লক্ষণছড়া, ডিবির হাওড়, হাকালুকি হাওড়, লালাখাল, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা, পান্থুমাই ঝরনা, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর, জৈন্তা হিল রিসোর্ট ইত্যাদি।

মৌলভীবাজার
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার দরুন চা বাগান তার পরিপূর্ণ সৌন্দর্য মেলে ধরে। চা বাগান ছাড়াও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, হাকালুকি হাওড়, হামহাম জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ক্যামেলিয়া লেক ইত্যাদি এ জেলার পর্যটন স্থান। 

সুনামগঞ্জ
বর্ষা মৌসুম হাওড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ জেলায় জনপ্রিয় টাঙ্গুয়ার হাওড় ছাড়াও রয়েছে আরও কিছু দর্শনীয় স্থান। যেমন- বারেক টিলা, যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান, নীলাদ্রি লেক ইত্যাদি।

হবিগঞ্জ
বৃষ্টির দিনে হবিগঞ্জজুড়ে বিস্তৃত বনাঞ্চল আরও নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। হবিগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- রেমাকালেঙ্গা অভয়ারণ্য, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, লক্ষ্মীবাউর জলাবন, সাগরদী ঘি ইত্যাদি।

সিরাজগঞ্জ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল এবং সমৃদ্ধতম জলাভূমি চলনবিল তিনটি জেলাজুড়ে বিস্তৃত। জেলা তিনটি হচ্ছে নাটোর, পাবনা এবং সিরাজগঞ্জ। বর্ষায় চলনবিল পানিতে ভরপুর থাকে। তখন তার সৌন্দর্য বেড়ে যায় বহু গুণ। 

কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জে রয়েছে মিঠামইন হাওড়, ইটনা হাওড়, নিকলী হাওড়, অষ্টগ্রাম হাওড় ইত্যাদি। হাওড়ের মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের ফলে বিগত কয়েক বছর এর জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে অনেক গুণ। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জে আরও রয়েছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি, কবি চন্দ্রাবতী মন্দির, এগারসিন্দুর দুর্গ, ইটনা শাহী মসজিদ, সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ি, এমনকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ ময়দান শোলাকিয়া।

বরিশাল
ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাজার। তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় বসে এই পেয়ারা বাজার। বৃষ্টি নামলে পেয়ারা বাজারের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে ভ্রমণের জন্য এটি খুব উপযুক্ত স্থান।

ভোলা
ভোলা বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপবেষ্টিত জেলা, যা কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ নামেও পরিচিত। জেলাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জল-স্থলের অপূর্ব সুন্দর ল্যান্ডস্কেপের জন্য বর্ষা মৌসুমে ভোলা জেলা আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে। ভোলার কিছু দর্শনীয় স্থান হচ্ছে- মনপুরা দ্বীপ, চর কুকরিমুকরি, তালুকদার জমিদার বাড়ি ইত্যাদি।

বর্ষায় বিছানাকান্দি

খুলনা
এ জেলাকে বলা হয় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। বৃষ্টির সঙ্গে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করার আগ্রহে সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য বর্ষা মৌসুমকেই বেশি উপযুক্ত মনে করেন প্রকৃতি ও ভ্রমণপ্রেমী মানুষ। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এ জেলায় রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। ভূতিয়ার পদ্মবিল, পুটনী দ্বীপ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ও শ্বশুরালয়, বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড, করমজল পর্যটন কেন্দ্র, কটকা সমুদ্র সৈকত ইত্যাদি।

বাগেরহাট
বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষা এ জেলায় রয়েছে কচিখালী সমুদ্র সৈকত, দুবলার চর, মোংলা বন্দর, খাঞ্জেলী দিঘি, যা বর্ষা মৌসুমে ঘুরে দেখার জন্য উপযুক্ত স্থান। 

শেরপুর
শেরপুর জেলাও বন পাহাড়ে ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর একটি প্রাকৃতিক জেলা। বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে গজনী অবকাশ কেন্দ্র, বনরানী ফরেস্ট রিসোর্ট, মধুটিলা ইকোপার্ক প্রভৃতি স্থান তার আপন সৌন্দর্য মেলে ধরে।

নেত্রকোনা
বিরিশিরি আর সোমেশ্বরী নদীর জন্য জনপ্রিয় জেলা নেত্রকোনা। বর্ষায় সোমেশ্বেরী নদী নবযৌবনা হয়ে ওঠে। একদিকে সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ পানি, অন্যদিকে গাঢ় সবুজ পাহাড় মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। নেত্রকোনায় আরও রয়েছে কমলারানীর দিঘি, ডিঙ্গাপোতা হাওড়, সাত শহীদের মাজার ইত্যাদি।

ফেনী
ফেনী জেলায় রয়েছে বেশ কিছু ছোট-বড় দিঘি। বর্ষায় সেসব দিঘি পানিতে টইটম্বুর হয়ে থাকে। তার মধ্যে পরীর দিঘি, বিজয়সিংহ দিঘি, রাজাঝির দিঘি, শমসের গাজীর দিঘি অন্যতম। 

রাঙামাটি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচুর্যে ভরা রাঙামাটি দেশের বৃহত্তম জেলা এবং সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে পুরো জেলাটিই একটি কৃত্রিম হ্রদের ওপর অবস্থিত, যা কাপ্তাই হ্রদ নামে পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে ঘোরার কথা মনে হলেই পাহাড়, ঝরনা, হ্রদ এসবের কথা মনে পড়ে। আর রাঙামাটি জেলায় এগুলো সবই আছে। ঝরনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- হাজাছড়া, কমলক, মুপ্পোছড়া, ধূপপানি এবং শুভলং। আর যে জায়গাটির কথা না বললেই নয়, তা সাজেক ভ্যালি। সাজেক ভ্যালির মেঘ ভেসে বেড়ানো পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য পর্যটকদের বারবার সেখানে টেনে নিয়ে যায়। 

খাগড়াছড়ি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর খাগড়াছড়ি জেলায় রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক লেক মাতাই পুখিরি, হার্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক, মানিকছড়ি মং রাজবাড়ি, তৈদুছড়া ঝরনা, পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুঠির, স্বর্গের সিঁড়ি বা হাতিমাথা, নিউজিল্যান্ড পাড়া, রিসাং ঝরনা, আলুটিলা গুহা, মায়াবিনী লেক প্রভৃতি।

বান্দরবান
পাহাড়, নদী আর ঝরনা মিলে অপূর্ব সুন্দর জেলা বান্দরবান। বর্ষায় ঝরনা আর নদীগুলো যখন পানিতে ভরপুর থাকে, পাহাড় আরও সবুজ হয়ে ওঠে, তখন তা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বান্দরবানের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- দেবতাখুম, সাতভাইখুম, আমিয়াখুম জলপ্রপাত, ঋজুক ঝরনা, জাদিপাই ঝরনা, মিলনছড়ি, ডিম পাহাড়, মারায়নতং, তিন্দু, দামতুয়া ঝরনা, আলীর 
সুড়ঙ্গ, চিংড়ি ঝরনা, নীলাচল, নীলগিরি, মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র, শৈলপ্রপাত ঝরনা, স্বর্ণমন্দির, কেওক্রাডং, বগালেক, সাইরু হিল রিসোর্ট, নাফাখুম প্রভৃতি।

চট্টগ্রাম
পাহাড় আর সমুদ্রে ঘেরা চট্টগ্রাম জেলায় রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দর্শনীয় স্থান হচ্ছে- গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত, বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত, মহামুণি বৌদ্ধ বিহার, রাঙ্গুনিয়া চা বাগান, ফয়েস লেক, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, পারকি সমুদ্র সৈকত, বাওয়াছড়া লেক, প্রজাপতি পার্ক, হাজারিখিল অভয়ারণ্য, বাঁশখালী ইকোপার্ক, সোনাইছড়ি ট্রেইল, সুপ্তধারা ঝরনা, সহস্রধারা ঝরনা, খৈয়াছড়া ঝরনা, ঝরঝরি ঝরনা, কমলদহ ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা ও ট্রেইল, ভাটিয়ারী লেক, ওয়ার সিমেট্রি, চন্দ্রনাথ পাহাড়, মহামায়া লেক, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক, কুমিরাঘাট ইত্যাদি।

জাহ্নবী

টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সুনামগঞ্জের সব পর্যটনকেন্দ্র খুলল

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ০৪:৫০ পিএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৪, ০৪:৫৪ পিএম
টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সুনামগঞ্জের সব পর্যটনকেন্দ্র খুলল
টাঙ্গুয়ার হাওর। ছবি : খবরের কাগজ

সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সব পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। 

রবিবার (২৩ জুন) দুপুরে এ ঘোষণা দেয় তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালমা পারভীন জানান, সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং যাদুকাটাসহ নদনদীতে প্রবল স্রোত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে কোনো পর্যটক এসে যাতে খারাপ পরিস্থিতি বা বিপদে না পড়েন এসব বিষয় মাথায় রেখে ও পর্যটকদের নিরাপত্তা বিবেচনায় টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সব পর্যটন স্পট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গত কয়েকদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় যেহেতু বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে তাই আজ থেকে আবারও টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সব পর্যটন স্পট খুলে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ও বিশ্বম্ভপুর উপজেলার দুর্গাপুর, শক্তিয়ারখলা ও আনোয়ারপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাহিরপুরের সঙ্গে সুনামগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 

এ অবস্থায় গত মঙ্গলবার (১৮ জুন) বন্যা পরিস্থিতিতে কোনো পর্যটন যাতে খারাপ পরিস্থিতিতে না পড়েন এবং বন্যা পরিস্থিতিতে এসে তাহিরপুরের আটকা না পড়েন তাই তাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সব পর্যটন স্পট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। 

দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী/সালমান/

পর্যটন সূচকে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ১২:১৭ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৪, ১২:১৭ পিএম
পর্যটন সূচকে বাংলাদেশ

গত মাসে অর্থাৎ ২০২৪ সালের মে মাসে ‘ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচক ২০২৪’ প্রকাশ করেছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করে থাকে। চলতি বছর ১১৯টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে ভারত ৩৯। এরপর শ্রীলংকা ৭৬, পাকিস্তান ১০১, নেপাল ১০৫। এই সূচকে বাংলাদেশের পরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে জিম্বাবুয়ে, হন্ডুরাস, নাইজেরিয়া, বেনিন, আইভোরিকোস্ট, মালাউয়ি, অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, সিয়েরা লিওন ও মালি।

সূচক তৈরিতে পাঁচটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে- সহায়ক পরিবেশ, ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক নীতি, অবকাঠামো ও সেবা, পর্যটন ও ভ্রমণের সম্পদ এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব। এই সূচক তৈরিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামকে সহায়তা করেছে যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়। সূচক তৈরিতে নিজেদের সংগ্রহ করা তথ্য ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সূচকের প্রথম পাঁচটি দেশ হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, জাপান, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার প্রথমে জাপান- সূচক ৩। এরপর চীন- সূচক ৮, সিঙ্গাপুর- সূচক ১৩, দক্ষিণ কোরিয়া- সূচক ১৪, ইন্দোনেশিয়া- সূচক ২২, মালয়েশিয়া- সূচক ৩৫।

তার অর্থ এশিয়ার দেশগুলো পর্যটনে অনেক পিছিয়ে রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায়। কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, এশিয়ার সর্বশেষ সূচকে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের পরে এশিয়ার আর কোনো দেশ নেই। কিন্তু কেন বাংলাদেশ পর্যটন সূচকে এতটা পিছিয়ে? কেন সম্ভাবনা থাকার পরও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিকাশ হচ্ছে না। বাংলাদেশের পর্যটনে মূল সমস্যা কোথায়?

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার। ২০২২ সালে এসেছিল ৫ লাখ ২৫ হাজার ৬৫৬ জন। ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬, ২০২০ সালে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫১৮, ২০১৯ সালে ৬ লাখ ২১ হাজার ১৩১ এবং ২০১৮ সালে ছিল ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ জন।

বিদেশি পর্যটক যে হারে বাড়ছে, তাতে একটা সংশয় রয়ে যায়। সংশয়টা কী? ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে ৫৫ লাখ বিদেশি পর্যটক আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ড। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশি পর্যটক বাড়ার হার মোটেও সন্তোষজনক নয়। 
পর্যটনের সঙ্গে কিছু বিষয় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত- পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক, যানবাহন, নিরাপত্তা, বিশ্রাম, বিনোদন, টয়লেট, খাবারের মান ও মূল্য, থাকার জায়গা ইত্যাদি।

যদিও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আপাতত দেশের পাঁচটি পর্যটন কেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ চলছে। এরপর আরও কিছু স্পটকে উন্নত করা হবে।

দেশের ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসে ভারত থেকে। এরপর এশিয়ার মধ্যে চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জাপানের পর্যটকরা আসেন বাংলাদেশে। এশিয়ার বাইরে থেকে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, তুরস্ক এবং রাশিয়া থেকে পর্যটক বেশি আসেন।

অন্যদিকে ২০২১ সালে ৩ হাজার ৯২৩ বাংলাদেশি গিয়েছিলেন মালদ্বীপ ভ্রমণে। আর ২০২২ সালে মালদ্বীপ বেড়াতে যান ১৬ হাজার ৮০৭ জন বাংলাদেশি। ২০২৩ সালে ২৮ হাজার ৩৩৬ বাংলাদেশি। মালদ্বীপের ১৫তম পর্যটক উৎস এখন বাংলাদেশ। যদিও বছরে কতজন বাংলাদেশি বিদেশে ঘুরতে যান, সেটার চূড়ান্ত হিসাব নেই। তবে স্থলবন্দর দিয়ে বছরে ২০ লাখ বাংলাদেশি যাচ্ছেন ভারতে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন খাতে সবচেয়ে বেশি জিডিপি আসে মালদ্বীপের- দেশটির জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার সাড়ে ১২ শতাংশ, নেপালের ৬ শতাংশ, ভুটানের সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ভারতের সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তবে দেশের পর্যটনের বড় আয় আসে দেশের ভেতরে থাকা পর্যটক থেকে- বিদেশি পর্যটক থেকে নয়।

অথচ কোনো বিদেশি পর্যটক যদি ১ হাজার ডলার নিয়ে বাংলাদেশে আসেন, তিনি ৮০০ ডলারই খরচ করেন আবাসন, খাবার ও ভ্রমণের কাজে। বাকি ২০০ ডলার শপিংয়ে খরচ করেন। এই শপিংয়ে তিনি বাংলাদেশি পণ্যই কেনেন। ফলে ১ হাজার ডলারের প্রায় সবটাই রয়ে যায় দেশে।

মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। ‘দেউলিয়া’ হয়ে পড়া শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত পর্যটনের ওপর ভর দিয়ে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অথচ কী নেই বাংলাদেশে? পাহাড়, সমুদ্রসহ পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো সবই আছে। নেই প্রচার, নেই পরিকল্পনা, নেই বিদেশি পর্যটকদের জন্য সুযোগসুবিধা, নেই পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা এবং নেই পর্যটনবান্ধব নীতি। এত নেইয়ের মধ্যে থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বছরে ৫৫ লাখ বিদেশি পর্যটক কি আমরা আনতে পারব?

জাহ্নবী