ইলিশের নিরাপদ প্রজননে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে সব ধরনের মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এ সময় দেশব্যাপী ইলিশ পরিবহন, বেচা-কেনা, মজুত ও বিনিময় নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে এই ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন জেলেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, অন্য কোনো পেশার সুযোগ না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অলস সময় পার করছে অনেক জেলে-পরিবার। অনেকে আবার এ সময়ে জাল ও নৌকা মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অন্যদিকে পেটের তাগিদে বাধ্য হয়ে নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন তারা। এ সময় প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ে জেল-জরিমানা গুনতে হচ্ছে অনেককে।
বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের প্রতিবেদকের। দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তারা জানান, ২২ দিন কীভাবে কাটে কেউ খবর রাখে না। এ সময় কিস্তি, ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয় তাদের। অনেক জেলে নিরুপায় হয়েই নদীতে মাছ ধরতে যান। মাছ না ধরলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভুক্ত থাকতে হয়।
চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী আনন্দবাজার এলাকার জেলে মোস্তফা দেওয়ান অভিযোগ করেন, ‘২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ। এ সময় সরকার থেকে ২৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও চাল দেয় ২০ থেকে ২২ কেজি।’
জেলে সিদ্দিক প্রধানিয়া বলেন, ‘আমাদের যে চাল দেয়, এটা দিয়ে তো সংসার চলে না। চালের সঙ্গে তেল-নুন-মসলা দরকার। সেগুলা কিনব টাকা কই?’ জেলে জমির হোসেন বলেন, ‘সরকার চাল না দিয়া আমাদের টাকা দিলে ভালো হতো। নয়তো অন্য কোনো কাজ দিক।’
জেলে রওশন দেওয়ান বলেন, ‘বহু দুঃখে এখন আর নদীতে মাছ ধরি না। এখন অন্য কাজ করি। মাঝেমধ্যে জাল-নৌকায় কাজ করি। কিন্তু নদীতে জাল ফেলি না। মাছ ধরে হবে কী? আমাদের সব সময় হয়রানি করা হয়। নদীতে নামলেই টাকা দিতে হয়। পুলিশ একদিকে নৌকা ধরে, আবার টাকা দিলে ছেড়ে দেয়।’
এ বিষয়ে চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ-পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘দিন যতই যাচ্ছে, জেলেরা ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমরা প্রতিনিয়ত নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগ সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ দিন-রাত দায়িত্ব পালন করে আসছে। এর মধ্যেই জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে নামছে। আমরা একদিকে ধাওয়া করছি, তারা অন্যদিকে নামছে। এভাবে প্রতিদিন শতাধিক জেলে আটক হচ্ছে। এর মাঝে জেলেরা আমাদের ওপর হামলাও করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছি।’
এসপি আরও বলেন, ‘আমরা জেলেদের আটক না করে সচেতন করার চেষ্টা করছি। জেলেরাও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছে, তারা আর মাছ ধরবে না। আর জেলেদের কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা তাও তদন্ত করে দেখব।’
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, ‘চাঁদপুরে চারটি উপজেলা রয়েছে নদীকেন্দ্রিক। এসব এলাকায় ভিজিএফের চাল দেওয়া শেষ হয়েছে। এ বছর জেলেদের ২০ কেজির জায়গায় ২৫ কেজি চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আমরা শুরু থেকেই চাল বিতরণ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, জেলেরা আমাদের সহায়তা করবে। জেলেরা যদি ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে না নামে, তাহলে ইলিশের উৎপাদন আগের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পাবে।’
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত মোট ৭০ কিলোমিটার এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭২ জন। তাদের বাইরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত আরও জেলে আছেন ১০-১৫ হাজার। তবে তাদের মধ্যে অনেকেই মৌসুমি জেলে হিসেবে মাছ শিকার করে থাকেন। নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্যসহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়া হচ্ছে। তবে অধিকাংশ জেলের অভিযোগ, ২৫ কেজির বদলে তাদের দেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২২ কেজি চাল।
চাঁদপুর নৌ-পুলিশের তথ্যমতে, ১২ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চাঁদপুর নৌ-সীমানার বিভিন্ন স্থান থেকে ৭২৭ জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে দেড় শতাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪২ কোটি ৬৪ লাখ মিটার জাল, ৩ হাজার ৬৭১ কেজি ইলিশ ও ২৬৬টি মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়েছে। এতে ১১০টি মামলা ও ৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ১২ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মৎস্য অফিস ও কোস্টগার্ড যৌথ অভিযানে ৩৬২ জেলেকে আটক করেছে। এর মধ্যে শতাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ লাখ মিটার ৬ হাজার জাল, ৬৬৪ কেজি ইলিশ, ২৫৭টি অভিযান, ১৯০টি মামলা ও ৪৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
মা-ইলিশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাসহ ২৭ জেলায় ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
এমএ/