একসময়ের ব্যাংক ও ট্যাংকের শহর কুমিল্লা এখন ‘হাসপাতালের শহর’। শুধু কুমিল্লা শহর-ই নয়, বিভিন্ন উপজেলা সদর এবং প্রত্যন্ত গ্রামেও গড়ে উঠেছে বেসরকারি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অথচ সেই পরিমাণে বাড়েনি স্বাস্থ্যসেবার মান।
কদিন পর পরই ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু বা অঙ্গহানির অভিযোগ উঠছে। সব মিলিয়ে কুমিল্লা জেলাজুড়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ৫৭৩টি। এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৫টির-ই নেই কোনো নিবন্ধন বা অনুমোদন। অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এসব প্রতিষ্ঠান।
সম্প্রতি ‘বেসরকারি অবৈধ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে’- নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের টনক নড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেলার অনিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। পাশাপাশি চালানো হচ্ছে অভিযানও।
গত এক সপ্তাহের টানা অভিযানে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্বাস্থ্য বিভাগের পর্যবেক্ষক টিমের মাধ্যমে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একজন ভুয়া ডাক্তারকে তিন মাসের জেলসহ তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযুক্তদের কাছ থেকে জরিমানাও আদায় করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক তালিকাসূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কুমিল্লায়। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৫। তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, গত পাঁচ মাসে বিভিন্ন অভিযোগে কুমিল্লায় অন্তত ৩৮টি হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের মধ্যে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪টি এবং কুমিল্লা সদর উপজেলায় ১৩টির নিবন্ধন নেই। শুধু দেবিদ্বার উপজেলা ছাড়া বাকি ১৬ উপজেলাতেই নিবন্ধনহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলায় যে ১৩৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই, এর মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ৭২টির। বাকি ৬৩টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদনই করেনি। প্রয়োজনীয় লোকবল ছাড়াই নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো চালানো হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্বাস্থ্য বিভাগের পর্যবেক্ষক টিমের সঙ্গে সরেজমিনে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ভুয়া ডাক্তার ও নার্সরা সেবা দিয়ে থাকে। এরা অনুমোদন না পেলেও অবৈধ কাগজপত্র প্রকাশ্যে রেখে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে। অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনুমোদন ছাড়াই এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মকানুন না মেনেই অপারেশন থিয়েটার, সিটিস্ক্যানসহ স্পর্শকাতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কুমিল্লা সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের ‘কালিরবাজার মডেল হাসপাতালে’ গিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক লিটন দেবনাথ চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসক সেজে রোগীদের প্রেসক্রিপশন প্যাডে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। ক্লিনিকটিতে অবৈধভাবে ফার্মেসি, অপারেশন, রোগী ভর্তি, রক্ত সঞ্চালন, অনুমোদনবিহীন রক্ত পরীক্ষা, সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কোনো চিকিৎসক বা নার্সের নিয়োগপত্র না থাকায় গত ২৪ জানুয়ারি তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় একই চিত্র বন্ধ করে দেওয়া অন্যান্য হাসপাতাল-ক্লিনিকেও।
স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. মহিউদ্দিন জানান, যেখানেই অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক, সেখানেই সেগুলো বন্ধের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- জরুরি ভিত্তিতে লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধ সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাডব্যাংক বিধি মোতাবেক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। সব বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. নাছিমা আক্তার বলেন, জেলার নিবন্ধনহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কুমিল্লা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রইস আবদুর রব বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার নামে ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠান খুলে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এটি চলতে দেওয়া যায় না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’