দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাত আর প্রধান সড়কে তীব্র যানজট- এ দুটিই যন্ত্রণার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কুমিল্লা নগরবাসীর জন্য। নির্বাচন এলেই মেয়রপ্রার্থীরা যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার বুলি ছাড়লেও নির্বাচনের পর কাজের কাজ কিছুই হয় না। ফলে সারা বছরই দুর্ভোগ পোহাতে হয় কুমিল্লা নগরবাসীকে। এ দুই যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না কিছুতেই। বরং দিন দিন তা আরও তীব্র হচ্ছে।
এদিকে কুমিল্লা নগরীতে লাইসেন্স নয়- রিকশা, ইজিবাইক বা অটোরিকশা চলে ‘টোকেনে’। প্রকাশ্য-গোপনে এসব টোকেনের টাকা যায় চাঁদাবাজসহ কথিত ‘প্রশাসন ম্যানেজকারীদের’ হাতে-বেহাতে। অন্যদিকে নগরীতে চলাচলের সাধারণ যানবাহনগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনতে না পারায় পরিবহন খাত থেকে রাজস্ব হারাচ্ছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না সড়কেও। সব মিলিয়ে কুমিল্লা সিটিতে নাগরিক সেবার মান দিন দিন কেবল নিম্নগামী হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ চান সাধারণ নাগরিকরা।
গত কয়েক দিনে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো সড়কেই যানজটের চিত্র এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। পাশাপাশি দখল হয়ে আছে ফুটপাতগুলো। যানজটে থেমে থাকে গাড়ির চাকা, হাঁটা যায় না ফুটপাতেও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর শাসনগাছা ফ্লাইওভারের নিচে ফুটপাতে পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। ফুটপাত ছাপিয়ে সড়কের অনেকাংশও এখন তাদের দখলে। একই অবস্থা কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের। এ ছাড়া বেদখল হয়ে আছে নগরের বেশিরভাগ ফুটপাত। ফলে পথচারীদের হাঁটা-চলারও সুযোগ নেই। হকারদের উপদ্রব আর যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং যানজট আরও বাড়িয়ে তুলছে।
নগরীর বাসিন্দারা জানান, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সদ্য প্রয়াত মেয়র আরফানুল হক রিফাত দেড় বছরে দায়িত্বকালীন সময়ে জলাবদ্ধতা নিয়ে কিছুটা কাজ করলেও ফুটপাত দখল ও অবৈধ অটোরিকশা স্ট্যান্ড উচ্ছেদ ও যানজট নিরসনে কোনো কাজই করতে পারেননি।
কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়, চকবাজার, রাজগঞ্জ, টমসম ব্রিজ, রানীর বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট এখন নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে অফিস সময় ও স্কুল ছুটির সময়ে যানজটের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। এসব এলাকার ফুটপাতগুলোও দখল হয়ে আছে।
নগরীর রানীবাজার এলাকায় সড়কের মধ্যে ফল বিক্রি করা নিজু মিয়া বলেন, ‘দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করার মতো পুঁজি নেই। তাই রাস্তায় ফল নিয়ে বসেছি। এখানে বসার জন্যও অনেককে চাঁদা দিতে হয়। এমনি তো আর সবাই বসতে পারে না।’
নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার বাসিন্দা সাল্লাউদ্দিন বলেন, রাস্তা হকারদের দখলে চলে গেছে। রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। বেশিরভাগ মার্কেটে পার্কিং প্লেস না থাকায় প্রতিদিন নগরে যানজট এমন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ ছুটির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে যানজট লেগে যায়। এভাবে আর কত, যানজট থেকে আমরা মুক্তি চাই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরে অবৈধ ব্যাটারিচালিত ও ইজিবাইক বেড়েই চলেছে। কুমিল্লা সিটিতে চলাচলের জন্য মাত্র ১ হাজার প্যাডেল রিকশার অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু চলাচল করছে এর কয়েক গুণ। আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্যাডেল রিকশাগুলো এখন পরিবর্তিত হয়ে পরিণত হয়েছে ‘অবৈধ’ ব্যাটারিচালিত রিকশায়। নগরীর রাস্তায় অটোরিকশা, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা যা চলছে তার সবই অবৈধ। এসব পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে ওই ‘টোকেনওয়ালারা’। রিকশা-অটোরিকশার পেছনে প্রকাশ্যে লেখা থাকে টাকার বিনিময়ে টোকেন প্রদানকারীদের নাম ও মোবাইল নম্বর।
বেশ কয়েকজন অটোরিকশা-ইজিবাইক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কোনো সমস্যা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়লে এসব পরিবহন ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব নেয় টোকেনওয়ালারা। এ জন্য মাসে টোকেনপ্রতি নেওয়া হয় সর্বনিম্ন ৩শ থেকে সর্বোচ্চ ৬শ টাকা। এই টোকেনই এসব যানবাহনের মূল চালিকাশক্তি।
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লা শাখার সহ-সভাপতি আইরীন মুক্তা অধিকারী বলেন, লাইসেন্স বা নিবন্ধনের আওতায় না আনা হলে জানা যাবে না এ শহরের সড়ক কি পরিমাণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী। লাইসেন্স নেই তাই এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দিন দিন সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজস্বও হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন। সব পরিবহনকেই শৃঙ্খলায় আনতে নিবন্ধন জরুরি।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হাবিবুর আল আমিন সাদী জানান, অটোরিকশা-ইজিবাইক অবৈধ। সিটিতে চলাচলকারী যানবাহনের লাইসেন্স না থাকার কারণে সিটি করপোরেশন রাজস্ব হারাচ্ছে। খুব অল্প সময়ের সব পরিবহনগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। যারা টোকেনের নামে চাঁদাবাজি করেন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান জানান, সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে নগরীতে চলাচলকারী পরিবহনের হালনাগাদ হয়েছে। মাত্র ১ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশার লাইসেন্স আছে, আর কোনো পরিবহনের লাইসেন্স প্রদানের আইন নাই।