জন্ম হরিজন সম্প্রদায়ের দরিদ্র পরিবারে। বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের কোতোয়ালির বান্ডেল রোডের সেবক কলোনিতে। মা-বাবা দুজনই ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। অভাব-অনটন ছিল সংসারের নিত্যসঙ্গী। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকেও করতে হয়েছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ। সেই সঙ্গে করতেন টিউশনিও। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছে শক্তি আর পরিশ্রম তাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের শিখরে। তাই তো এখন তিনি একজন আইনজীবী। গত ৯ মার্চ বার কাউন্সিলে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার তাকে গাউন পরিয়ে দেন চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আজিজ আহমেদ ভুঁইয়া।
কঠিন অধ্যবসায় আর সংগ্রামের পথ পারি দিয়ে মা-বাবার স্বপ্নপূরণ করেছেন কৃষ্ণ দাস। যিনি হরিজন সম্প্রদায়ের প্রথম আইনজীবী। পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীতে বেড়ে উঠলেও কৃষ্ণ নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। তাকে নিয়ে এখন তার সম্প্রদায়ের সবাই গর্ব করছেন। দিয়েছেন সংবর্ধনাও।
জানা যায়, ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন কৃষ্ণ। এরপর ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। ছোট থেকেই কৃষ্ণের ইচ্ছা ছিল আইনজীবী হওয়ার। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সহায়তায় তিনি চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচালনাধীন হওয়ায় তার কাছ থেকে নামমাত্র ভর্তি ফি নেওয়া হয়। পরে তার বেতনও মওকুফ করে দেওয়া হয়। কেবল পরীক্ষার ফি দিয়েই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন কৃষ্ণ। বিকেলে দুটি টিউশনিও করতেন। রাত-দিন কষ্ট করে ঘামে-শ্রমে, উপোসে জোগাড় করেছেন পড়াশোনার খরচ। আইনজীবী হয়ে এখন তিনি চট্টগ্রাম আদালতে সরকারি কৌঁসুলি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীর সঙ্গে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কর্মরত।
এ বিষয়ে কৌঁসুলি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘কৃষ্ণ দাসের মধ্যে পড়াশোনার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তাই তাকে নিয়মিত পড়াশোনায় উৎসাহ দিতাম।’
মা ছায়া দাস ছেলের এই অর্জনে খুব খুশি। ছেলের সাফল্যে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করেছি। ছেলে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। তাকে বলেছি, যেন মানুষের জন্য কাজ করে। তার বাবা বেঁচে থাকলে আজ কতোই না খুশি হতেন।’
কৃষ্ণ বলেন, ‘সমাজের পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাব। তারা যাতে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যেতে পারে। এত দূর আসার পেছনে প্রতিবেশী, সহপাঠী ও সহকর্মীদের ভালোবাসা আমার পাথেয় ছিল। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ হেয় করলেও ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি।’
হরিজন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষ্ণ দাসই প্রথম হরিজন, যিনি আইনজীবী হয়েছেন। বিষয়টি জানার পর তাকে উৎসাহিত করতে জেলা ও দায়রা জজ নিজেই গাউন পরিয়ে দিয়েছেন। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায় তাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাতে পিছিয়ে পড়া অন্যরাও উৎসাহিত হয়।
কৃষ্ণ দাস জানান, তার বাবা চিরঞ্জীব দাস চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন। ২০১৪ সালে তিনি স্ট্রোক করেন। মা ছায়া দাসও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর মা একাই সংসারের খরচ ও বাবার ওষুধের খরচ চালাতেন। কৃষ্ণকে তখন পড়াশোনা ও নিজের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবিতে স্নাতক (সম্মান) পাস করেন তিনি। এরপর চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীর সঙ্গে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীও কৃষ্ণকে আগে থেকেই পড়াশোনাসহ নানাভাবে সহযোগিতা করতেন। অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষায় প্রথমে প্রিলিমিনারি, এরপর লিখিত ও সর্বশেষ মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেন তিনি। গত ৯ মার্চ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত পরীক্ষার ফলাফলে কৃষ্ণ দাস অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এখন থেকে তিনি নিজেই মামলা পরিচালনা করতে পারবেন।
হরিজন সম্প্রদায় চট্টগ্রামের প্রধান মায়াদিন সরদার বলেন, ‘কৃষ্ণ দাস হরিজন সম্প্রদায়ের গর্ব। তার এই সাফল্যে আমরাও গর্বিত। এজন্য গত মঙ্গলবার তাকে সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে। তিনিই দেশে হরিজন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম আইনজীবী।’