চারদিকে ছোট-বড় খানাখন্দ। কোথাও বড় আকারের গর্ত; আবার কোথাও সড়কের অধিকাংশ ধসে গেছে। কোথাও একেবারে নিচু, কোথাও আবার টিলার মতো। দু-এক জায়গায় ইটের চিহ্ন থাকলেও বেশির ভাগ জায়গার মাটিতে কংক্রিটের গড়াগড়ি। দেখেশুনে না চললে পা পিছলে যাওয়ার শঙ্কা আছে। এমন বেহাল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ওকন্যারা গ্রামের কালা গাজী সড়কের। গেল ২৩ বছরেও গ্রামীণ এই সড়কটিতে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। বছরের পর বছর অবহেলিতই থেকে গেছে ৫ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম এই সড়কটি। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষকসহ এলাকার কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। সেই সঙ্গে দীর্ঘসময়েও উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগায় স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।
বাসিন্দাদের অভিযোগ- জনপ্রতিনিধি যায়, জনপ্রতিনিধি আসে। কেউ এই সড়কের ধার ধারেন না। ফলে দিনের পর দিন এখানকার বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিতেই এ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। তখন ঘরবন্দি হওয়া ছাড়া মানুষের কোনো উপায় থাকে না। সড়কটির দ্রুত সংস্কার করে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড়লিয়া ইউনিয়নের ওকন্যারা গ্রামের কালা গাজী সড়কটি বড়লিয়া হাসপাতালসংলগ্ন আশকর শাহ মাজার থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে আশিয়া বাংলা বাজারে। এক কিলোমিটারের কম হলেও সড়কটির আশপাশে রয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। এসব বাড়িঘরে অন্তত ৫ হাজার মানুষের বসবাস। এ সড়কটি বড়লিয়া ইউনিয়ন ও আশিয়া ইউনিয়নকে যুক্ত করেছে। ফলে দুই ইউনিয়নের মানুষের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়কের এক পাশে আছে আশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, আশিয়া বাংলা বাজার ও একটি কিন্ডারগার্টেন। অপর পাশে আছে বড়লিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১টি মাদ্রাসা। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে এই সড়কটি অবহেলিত। ২৩ বছর আগে সড়কটিতে ইট বসানো হয়। এরপর আর কোনো কাজ করা হয়নি। প্রায় দুই যুগ পার হলেও আর একটিও নতুন ইট বসেনি এই সড়কে। ফলে এলাকার স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, বয়স্ক নারী, পুরুষ চলাচলে পোহাচ্ছেন সীমাহীন দুর্ভোগ। বিশেষত সড়কটি কোনো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী বলে অসুস্থ রোগী কিংবা অন্তঃসত্ত্বাদের হাসপাতালে নিতে চরম কষ্টে পড়তে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কের রুগ্নদশা সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিরা জানলেও মাথা ঘামান না। তারা এই সড়ক এড়িয়ে চলেন। সড়কের কারণে যোগাযোগ স্থাপন যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি বাড়িতে অতিথি এলেও বদনাম হয়। সড়কের জন্য এলাকা নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই।’
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘কোনো সরকারের আমলেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আমাদের ইউনিয়নে এ রকম সড়ক আর নেই। সব সড়কই পাকা হয়ে গেছে। আমরা সাবেক এমপিকে কয়েকবার বলেছি সড়কের উন্নয়ন করতে। তিনি কোনো সাড়া দেননি। বর্ষা এলে সড়কটি খুঁজে পাওয়া যায় না। ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসতে প্রায় সময় হোঁচট খেয়ে আহত হয়। পরে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় হাজার টাকা।’
আশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদিল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্কুলে যেতে আমাদের ভালো লাগে। মন চায় ভালো করে পড়াশোনা করি। কিন্তু এই ভাঙাচোরা সড়ক আমাদের মন খারাপ করে দেয়। একবার এ রাস্তায় হাঁটলেই স্কুলে যাওয়ার বা স্কুল থেকে ফেরার ইচ্ছে মরে যায়।’
এলাকার বয়োবৃদ্ধ নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘সড়কটি বেহাল অনেক বছর ধরে। আমার ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন থেকে এই দশা। আর এখন ছেলে বড় হয়ে গেছে। তাও সেই দশা। কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এখানে। আমার দুই ছেলে বিদেশে থাকে। বাড়ির সব বাজার আমাকেই করতে হয়। কিন্তু এই সড়কে কোনো গাড়ি চলে না। আমি হাঁপানির রোগী। বাজার থেকে একবার এই সড়কে এলেই আমার প্রাণটা বেরিয়ে আসে।’
এ বিষয়ে বড়লিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীনুল ইসলাম শানু খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কটির বেহালের ব্যাপারে আমি অবগত আছি। নানা কারণে সড়কটির উন্নয়ন করা হয়নি। আগের সংসদ সদস্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সড়কটি সংস্কার করে দেবেন। কিন্তু তিনি এইবার নির্বাচিত হননি। বর্তমান সংসদ সদস্য মোহাহেরুল ইসলাম চৌধুরীও সড়কটির সংস্কারের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এটি এখনো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা অনুরোধ করব, অনুমোদন হবে এরপর কাজ হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘১ শতাংশ থেকে পাওয়া টাকায় ওই সড়কের উন্নয়ন সম্ভব না। এই বছর আমরা পুরো ইউনিয়নের জন্য ১ শতাংশে টাকা পেয়েছি মাত্র ১১ লাখ টাকা। সেই টাকায় ওই সড়কের কিছুই হবে না।’