সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা। সবেমাত্র সরকারি অফিস-আদালত খুলতে শুরু করেছে। সীতাকুণ্ড উপজেলা ভূমি অফিসের বাইরের আঙিনায় কিছু মানুষের জটলা। অফিসের কর্মচারীরা তখনো ফাইল-টেবিল মেলে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে সেখানে হাজির হলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন।
অফিসে এসই তিনি তার নির্ধারিত কক্ষে না গিয়ে বাইরে ঘুরে ঘুরে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। আঙিনাতেই একে একে সবাইকে ডেকে জানতে চান তাদের সমস্যা কী? এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে ফাইল হাতে নেন।
তাৎক্ষণিক কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে নামজারি অনুমোদন করে দেন। কোনোটার ক্ষেত্রে পরবর্তী আদেশ দিয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন। কোনোটির ক্ষেত্রে পরামর্শ, আবার বড় আকারের ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে খারিজ করে দেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) এভাবেই সকাল থেকে দুপুর প্রায় শতাধিক সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমস্যা সমাধান করেন অ্যাসিল্যান্ড আলাউদ্দিন।
সেবাগ্রহীতা মো. লিটন বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বড় ভাইয়ের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ভূমি অফিসে একটি মিছা মামলা করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ দুটি শুনানিতেই অ্যাসিল্যান্ড সমাধান করে দিয়েছেন।’
সেবাপ্রার্থী কহিনুর বেগম বলেন, ‘নামজারি অনলাইনে আবেদন করার পর অ্যাসিল্যান্ডের কাছে আসি। আমার সব কাগজপত্র ঠিক ছিল। আজ অ্যাসিল্যান্ড নিজে আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি।’ একইভাবে সেবা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন অনেকে।
এরপর দুপুর ১২টায় ভূমি সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল আলম রাজু, পৌর মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম রফিকুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম মহিউদ্দিন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা আরজু প্রমুখ।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন বলেন, ‘সবাইকে অনুরোধ করব কারও মাধ্যমে না হয়ে সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। সেবাগ্রহীতারা যেন আমার সঙ্গে কথা বলেন। তাহলে আমি সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার শতভাগ চেষ্টা করব। কিন্তু কেউ যদি কারও মাধ্যমে আসে বা দালালের আশ্রয় নেয় তাহলে ভোগান্তির জন্য তিনি নিজেই দায়ী।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দরজা সবসময় খোলা। অফিসের প্রয়োজনে সাদা গ্লাসের ভেতরে বসতে হয় আমাকে। কিন্তু কেউ যেন আমার কাছে আসতে দ্বিধা না করে। এ ছাড়া আমি সপ্তাহে দুই দিন দপ্তরের বাইরে গণশুনানি করে থাকি। সেখানে মানুষ তাদের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আসেন। তাহলেই সহজে সেবা মিলবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সীতাকুণ্ডে মানুষের জন্য ভূমি সেবাকে সবচেয়ে সহজ করতে অ্যাসিল্যান্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখানকার মানুষের জমি-জমা সংক্রান্ত ঝামেলা যেন আদালত পর্যন্ত যেতে না হয় সেজন্য কাজ করছি। স্থানীয়ভাবে বিষয়গুলো মিটিয়ে নিতে আমার নির্দেশনা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সেই লক্ষ্য কাজ করছেন। এতে আমিও আনন্দিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাতীয় ভূমি স্কোর বোর্ডের বিবেচনায় দেশে প্রথম হয়েছেন। এর আগেও তিনি ডিজিটাল জরিপের জন্য প্রথম স্থান অধিকার করেন। আমি তার এই দুই প্রাপ্তিতে অত্যন্ত আনন্দিত। আমি মাঝে মাঝেই ভূমি অফিসের কর্মচারীদের বকাঝকা করি। মানুষ স্বভাবতই অলস। তারা ঝিমিয়ে পড়ে। এতে মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই তাদের গিয়ারআপ করি। সবাইকে জাগিয়ে তুলি, যেন তারা সেবায় নিয়োজিত থাকেন।’
আলোচনা সভায় সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল আলম রাজু বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে স্মার্ট ভূমি সেবা বাস্তবায়নে সরকারের স্মার্ট অফিসাররা কাজ করে যাচ্ছেন। আমি চাই মানুষের কষ্ট লাঘব হোক। মানুষ যেন হয়রানি না হয়। দপ্তরে দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়। হাতের কাছেই যেন কাঙ্ক্ষিত সেবা মেলে এটাই কাম্য। অনুষ্ঠানের শেষে ভূমি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জানানোর লক্ষ্য উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।’
এতে ক্যাপ্টেন শামুসল হুদা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিরাজাম মুনীরা প্রথম স্থান, সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিরাজুম মুনীরা দ্বিতীয় স্থান, একই বিদ্যালয়ের খাতুনূর জান্নাত তানিশা দ্বিতীয় যুগ্ম ও বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের চৌধুরী সিথি চৌধুরী তৃতীয় হয়েছেন। অতিথিরা তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
মনির/ইসরাত চৈতী/