ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন ও বাস স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বেড়ে গেছে। সকালে বিজয় এক্সপ্রেস দুই ঘন্টা বিলম্বে ছাড়লেও পুরোদিন কোন ধরণের বিঘ্ন ঘটেনি। ভোর থেকেই নগরের রেলস্টেশনগুলোতে ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে।
সরেজমিনে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে এসে অপেক্ষা করছেন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতিতে পুরো স্টেশন এলাকায় তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কোলে শিশু—সব মিলিয়ে আনন্দঘন দৃশ্য।
চার বছর পর পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন আবু মুছা। দুই জমজ কন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে বিকেল তিনটার চাঁদপুর স্পেশাল ট্রেনে রওনা দেন তিনি। চট্টগ্রামের সদরঘাটে বসবাসকারী এই দম্পতি ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। আবু মুছা জানান, বাবা-মা না থাকায় নিয়মিত গ্রামে যাওয়া হয় না। তবে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবারের সঙ্গে গ্রামে যাওয়ার অনুভূতিই আলাদা।
একইভাবে কর্ণফুলী ইপিজেডে কর্মরত আবু বক্কর এক বছর পর স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে বরিশালের বাড়িতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “বাড়ি যাওয়ার আনন্দই আলাদা—মনে হচ্ছে আজই ঈদের দিন। বছরের অন্যান্য সময়ে ছুটি না থাকায় গ্রামে যেতে পারিনি। মা বাবা ও ভাইবোন রয়েছেন গ্রামে। তাদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির করার জন্যই বাড়ি যাওয়া। মনের মধ্যে অন্য রকম একটি অনুভূতি কাজ করছে। এমন আনন্দ বলে বুঁঝানো যাবে না।’’
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, অগ্রিম টিকিটধারীদের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্টেশন এলাকায় যাত্রীচাপ বাড়ছে। তবে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং বেশিরভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। শতভাগ অনলাইন টিকিট ব্যবস্থা চালুর ফলে ভোগান্তি কমেছে এবং ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নীতি কার্যকর হওয়ায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা স্টেশন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। টিকিট যাচাইয়ের পরই যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সকাল ১০টায় বিজয় এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ার কথা থাকলেও তা ছাড়তে ১২টা বেজে যায়। এতে যাত্রীদের দুইঘন্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় প্লাটফরমে। এছাড়া আরকোন সিডিউল বিপর্যয় ঘটেনি।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, যাত্রীচাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা হয়েছে এবং একজোড়া স্পেশাল ট্রেন চালু রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় যাত্রীসংখ্যা আরও বেড়েছে। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি চলছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর রুটে ‘চাঁদপুর-১’ ও ‘চাঁদপুর-২’ নামে দুটি স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়েছে, যা সকাল সাড়ে ৮টা ও বিকেল সাড়ে ৩টায় ছেড়ে যায়। অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলায় অভ্যান্তনীর ট্রেনে ১০৫টি বগি ও ১০টি ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বটতল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার বলেন, যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে যেতে পারছেন। তবে সকালে বিজয় এক্সপ্রেস দেরিতে পৌঁছানোর কারণে ফিরতি যাত্রায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। যাত্রীদের অগ্রীম টিকিট সংগ্রহ থাকায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করেছেন যাত্রীরা। ইঞ্জিনে একটু সমস্যা দেখা দেওয়া বিলম্ব হয়েছে। পরে ঠিক করে আবার চালু করা হয় ট্রেনটি। এ ছাড়া অন্য কোন সমস্যা হয়নি। নির্বিঘ্নে করছে ট্রেন চলাচল।
অন্যদিকে, বাস টার্মিনালগুলোতেও যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। বহাদ্দারহাট, অক্সিজেন মোড়, একেখান মোড় ও গরীবউল্লাহ শাহ এলাকায় ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। যানজট ও বাস সংকটের কারণে অনেক যাত্রীকে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারসহ যাত্রীদের জন্য ভোগান্তি আরও বেশি।
নাড়ির টানে গ্রামের পথে মানুষের এই যাত্রা আগামী কয়েক দিনও এভাবে চলবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেক যাত্রী জানিয়েছেন, সড়কের যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে তারা ট্রেনকেই বেছে নিয়েছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্টেশন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। টিকিট যাচাই করে প্লাটফরমে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের।
আবদুস সাত্তার/এসএন