হাত-পা ও মুখ ছিল গামছা দিয়ে বাঁধা। গলায় জবাইয়ের গভীর ক্ষত। উপড়ে ফেলা হয়েছিল দুই চোখ এবং বুকের নিচে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। এমন এক মরদেহ উদ্ধার করে আনোয়ারা থানা পুলিশ। নৃশংস এঘটনার পর পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দুই দিন পর গত বছর ১৬ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) সকালে উপজেলার বরুমছড়া কানু মাঝির ঘাট এলাকার একটি দিঘির পাশ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। দিঘীতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মরদেহটি নিখোঁজ সিএনজি চালক সাজ্জাদের মরদেহ। তাকে হত্যা করে তার সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের প্রায় আট মাস পর মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী ক্রসিং এলাকা থেকে পলাতক আসামি মো. সুমন প্রকাশ সোহরাব আলীকে (৪৪) গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭। এর মধ্য দিয়ে আলোচিত এ হত্যা মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার (৮ মে) সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন র্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফফর হোসেন।
তিনি বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পেরে হত্যা মামলার পলাতক আসামি সুমন কর্ণফুলী থানা এলাকায় র্যাব-৭ এর একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া সুমন নগরের বাকলিয়া এলাকার মো. রাজু ওরফে ওসমান গণির ছেলে। পরে তাকে আনোয়ারা থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত বছরের ১২ অক্টোবর (রোববার) ঘটনার সঙ্গে জড়িত মো. হারুন (৪২), রমজান আলী প্রকাশ আক্কর (৩৭) ও ঘটনার মূল হোতা মো. সাইফুলকে গ্রেপ্তার করে আনোয়ারা থানা পুলিশ । তাদের গ্রেপ্তারের পর ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও গামছা উদ্ধার করা হয়।
একই মাসের ১৯ অক্টোবর (রোববার) রাতে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি ভাড়া বাসা থেকে চক্রটির সক্রিয় সদস্য ও সাজ্জাদ হত্যা মামলার মূল হোতা সাইফুলের ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম (২৫)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও থানা এলাকার বাংলাদেশ কনভেনশন হলের সামনে থেকে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি লিয়াকত আলী (৪৪)কে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শিমুল চন্দ্র ও এএসআই নুরুল আফছার।
এছাড়াও, একই মামলার আরেক আসামি মো. মানিককে (৪০) গত ২৯ এপ্রিল (বুধবার) ফটিকছড়িতে সিএনজি চুরির সময় জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তিনি বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম শাকপুরা এলাকার মৃত আমির হোসেনের ছেলে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে আনোয়ারা উপজেলার বটতলী রুস্তমহাট এলাকা থেকে ভাড়ার কথা বলে সাজ্জাদকে ডেকে নেয় আন্তঃজেলা সিএনজি চোরচক্রের সদস্য সাইফুল। পরে তাকে বরুমছড়া কানু মাঝির হাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল রমজান আলী ওরফে আক্কর, হারুন, সুমন, আশরাফসহ আরও কয়েকজন। রাত পৌনে আটটার দিকে তারা সাজ্জাদকে একটি ফিশারির খামারে নিয়ে যায়। সেখানে হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাঁকে জবাই করে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ পাশের পানিতে ফেলে রেখে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
দুই দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে স্থানীয় লোকজন দিঘীতে ভাসমান মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।
লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে নিহতের বাবা মো. নাছির থানায় এসে ছেলের পরনের কাপড় দেখে মরদেহ শনাক্ত করেন। পরদিন তিনি আনোয়ারা থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামি গ্রেপ্তারের কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মো. নাছির। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের জন্য গাড়ি চালাইত। ওই রাতে ভাড়া মারতে গিয়ে আর ফেরত আসে নাই। পরে যেভাবে ওর লাশ পাইছি, কোনো বাবার পক্ষে এটা সহ্য করা সম্ভব না। আমার ছেলের হত্যাকারীদের আমি ফাঁসি চাই।’
জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, 'গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি আদালতে জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'