আজ শুক্রবার। স্কুল নেই। পড়াশোনা নেই। কোচিং টিচার নেই। আব্বুর শাসন নেই। পিকুদের বাসার এই এক নিয়ম। শুক্রবার হলো ইচ্ছেপূরণ দিবস। দোতলার টিভি রুমটার সামনে বৃহস্পতিবার বিকেলে একটা টেবিল বসিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে একটি চেয়ার।
টেবিলে সাজানো থাকে কতগুলো গোলাপি রঙের কাগজ আর বিভিন্ন রঙের সুন্দর সুন্দর কলম। রাত ১২টার মধ্যে যার যার ইচ্ছেগুলো লিখে পাশে রাখা একটি কাচের বাক্সে ফেলতে হয়। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ একটি ইচ্ছে। শুক্রবারে সেই ইচ্ছেটি পূরণ করা হবে।
পিকুদের বাড়িটা সাততলা। একতলায় গ্যারেজ, রান্নাঘর আর দারোয়ান ও ড্রাইভার আংকেলদের থাকার ব্যবস্থা। দোতলায় ড্রইং, ডাইনিং, আড্ডামঞ্চ, টিভিরুম আর ব্যালকনি। তিনতলা থেকে সাততলা পর্যন্ত থাকার ঘর আর রিডিং রুম। আব্বুদের পাঁচ ভাইবোনদের প্রত্যেকেই একেক তলায় থাকেন।
কিন্তু সবারই আড্ডা আর বিনোদনের জায়গা হলো দোতলা। ইচ্ছেপূরণের ব্যাপারটা ছোট কাকা চালু করেছেন। তার মাথায় যা বুদ্ধি না!
পিকুর কোনো দিনই কোনো ইচ্ছে থাকে না। মনে মনে অনেক ইচ্ছের কথাই সে ভাবে। কিন্তু এখানে লিখে বাক্সে ফেলতে ইচ্ছে করে না। আর লিখলেও ওরা এগুলো পূরণ করতে দেবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই সবাই ওকে ফকির বলে। ভালো লাগে না।
ইচ্ছেপূরণের বিষয়ে সবচেয়ে আগ্রহ হচ্ছে অহনার। সে প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন ইচ্ছে ধরে এনে সবাইকে চমক লাগিয়ে দেয়। গত সপ্তাহে ওর ইচ্ছে ছিল সারা শরীরে পাখির পালক লাগিয়ে চিড়িয়াখানায় যাবে। ওকে দেখে চিড়িয়াখানার পশুরা কী করে এটাই সে দেখতে চায়।
চিড়িয়াখানার দারোয়ানরা তো প্রথমে ওকে ভেতরে ঢুকতে দিতেই চায়নি। ওরা ভেবেছে, এটা নতুন ধরনের কোনো পশু। পরে অবশ্য সে ভেতরে গিয়েছে, কিন্তু পশুরা ওর সাজুগুজুর কোনো দামই দেয়নি। ওরা নিজেদের ঘাস খাওয়া বা ঘুমানো নিয়েই ব্যস্ত ছিল। অবশ্য দুষ্টু একটি ছেলে অহনার শরীর থেকে দুটো সুন্দর পালক টান দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
অহনা শুনেছে যে, বর্মী নামক এক জায়গায় গাছে অনেক বানর বাস করে। এক সপ্তাহে অহনার ইচ্ছে হলো, কাছে থেকে সে বানর দেখবে। অতএব ইচ্ছের স্লিপে সে লিখে দিল, বর্মি গিয়ে গাছে ঝুলে ঝুলে বানর দেখতে চাই।
কী আর করা! ছোট কাকা কিছুটা বিরক্ত হলেও ইচ্ছে তো অপূর্ণ রাখা যাবে না। তিনি হারুন কাকাকে বললেন ব্যবস্থা করতে। আমাদের হারুন কাকা সব পারেন। সব মানে সব।
ছোট কাকা যদি বলেন, ‘হারুন, পিকুকে নিয়ে চাঁদের বুড়ির বাড়ি থেকে ঘুরে আস।’ হারুন কাকা দুদিন, কী তিন দিন সময় নেবেন। তারপরই চলে যাবেন চাঁদের বুড়ির বাড়ি।
হারুন কাকা অহনার জন্য একটা ছোট খাঁচা বানিয়ে আনলেন। হাতে বেঁধে তো আর গাছে ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। সেই খাঁচার ভেতর অহনাকে ঢুকিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। আশপাশে অনেকগুলো কলার কাঁদি ঝুলিয়ে দিলেন হারুন কাকা।
কলা খাওয়ার লোভে খাঁচার কাছে অনেকগুলো বানর এসেছিল। অহনার খাঁচাটায় অনেকেই ঝুলে দোল খেয়েছে। অহনা অবশ্য একটুও ভয় পায়নি। খুব সাহসী মেয়ে। একটু পরেই দুষ্টু ছেলের দল এসে অহনার খাঁচায় ঢিল ছুঁড়তে শুরু করল। তখন কী আর ভয় না পেয়ে থাকা যায়!
রাত ৩টার সময় ঘুম ভেঙে গেল পিকুর। ও চারতলার পশ্চিম পাশের রুমে থাকে। প্রতিদিন শেষ রাতে একটা অদ্ভুত পাখি এখানে আসে। অনেকক্ষণ ধরে মিষ্টি সুরে গান করে। গানের সুর শুনে পিকুর ঘুম ভেঙে যায়। আজ পাখিটি আসেনি। ওর কী কোনো অসুখ হয়েছে?
পাখিটা কী কোনো বিপদে পড়েছে? পিকু বিছানা ছেড়ে ওঠে বসল। তারপর চিন্তা করতে করতে হাঁটতে লাগল। দোতলায় এসে ইচ্ছে টেবিলে বসল। এখানে আজ কোনো ইচ্ছেই জমা পড়েনি। কী আশ্চর্য! অহনার মাথার কিলবিল করা ইচ্ছেগুলো কী শেষ হয়ে গেছে?
পিকু অনেক দিন ধরেই ভাবছে, একটা ইচ্ছের কথা লিখবে। কিন্তু সে বেশ বিব্রত। ওরা খুব অভিজাত পরিবারের লোক। তার পক্ষে এ ধরনের ইচ্ছের কথা বলা কী শোভা পায়! তাছাড়া, ছোট কাকা কী ভাববেন? আব্বু কী ভাববেন?
হারুন কাকা অবশ্য খুশিই হবেন। অনেক ভেবে একটা ইচ্ছে কাগজ হাতে নিয়ে পিকুর ইচ্ছেটা লিখে ফেলল সে। কাচের বাক্সের ভেতর ফেলে দিল ইচ্ছে কাগজ। কিন্তু এমন ভালো ইচ্ছের কথা কি একবার লিখলে চলবে? সে আবার একটি কাগজ হাতে নিল। একই ইচ্ছের কথা আবার লিখল। ভাঁজ করে বাক্সে ফেলল।
এভাবে কাগজ নিয়ে একই ইচ্ছে লিখতে লিখতে বাক্স ভরে ফেলল পিকু। ভাঁজ করা কাগজগুলো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। হাত নাড়ছে। হাসছে। ভেংচি কাটছে। গান গাইছে। হাততালি দিচ্ছে।
বিকেলে ছোট কাকা একটা লাল পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে পিকুর ঘরে এলেন। তিনি বললেন, চল পিকু, আমিও যাব তোর সঙ্গে। ওরা চলে গেল পুরান ঢাকার একটি মাঠে। সেখানে অনেকগুলো ছেলে ময়লা হাফপ্যান্ট পরে দৌড়াচ্ছে। কেউ ডাংগুলি খেলছে। কেউ ভাঙা ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলছে। কেউ ফুটবল খেলছে।
হারুন কাকা সবাইকে ডাকলেন। খেলা থামিয়ে সবাই বিরক্ত মুখ নিয়ে কাছে এল। হারুন কাকা বললেন, পিকু আজ তোমাদের সবাইকে খাওয়াবে। এখানে নয়। তোমাদের নিয়ে একটা বড় হোটেলে গিয়ে খাওয়াবে। তার আগে তোমাদের সে বল দেবে, ক্রিকেটের ব্যাট দিবে, জার্সি দেবে। ছেলেরা আনন্দে আর খুশিতে যেন ফেটে পড়ল। ওরা হাততালি দিতে শুরু করল।
নতুন জার্সি গায়ে পরে খেলা শেষ করে ঝকঝকে চেহারা নিয়ে ওরা চলে এল নামি একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। পিকু বলল, আজ তোমাদের ইচ্ছেপূরণ দিবস। তোমাদের যার যা ইচ্ছে খেতে পার। ওরা আবার লাফিয়ে উঠল।
কোথা থেকে যেন আব্বু এলেন সেখানে। তার সঙ্গে স্কুলের হেডস্যার। আব্বুর হাতে বাংলাদেশের একটি পতাকা। খাওয়া শেষ হলে তিনি ছেলেদের হাতে পতাকাটি তুলে দিলেন। বললেন, এটি আমাদের বাংলাদেশের পতাকা।
৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়ে এই পতাকাটি জয় করে এনেছে। তোমরা বড় হয়ে এ পতাকাটি উপরের দিকে উঠাবে, শক্ত হাতে ধরে রাখবে।
কলি