ভাবসম্প্রসারণ
বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসঙ্গে গাঁথা
নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা।
ভাবসম্প্রসারণ: কাজ এবং বিশ্রাম একে অন্যের পরিপূরক। কাজ আনে জীবনে সমৃদ্ধি আর বিশ্রাম আনে কাজের শক্তি ও প্রেরণা। কাজেই চলা এবং থামা এ দুয়ের মেলবন্ধনেই জীবনের ছন্দ।
কাজ ও বিশ্রাম আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তা একই প্রক্রিয়ায় দুটি দিক। কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনস্বীকার্য। চোখের পাতা যেমন চোখেরই একটা অংশ তেমনি বিশ্রামও কাজের একটা অংশ। চোখের কাজ দেখা কিন্তু চোখের পাতা সেই দেখার কাজ কখনো কখনো বন্ধ রেখে চোখকে অবসর দেয়। এতে চোখকে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। আমরা যদি কিছু সময় একটানা কাজ করি, তবে আমাদের শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কর্মক্ষমতা লোপ পায়, একঘেয়েমির ফলে আসে গভীর অবসাদ ও ক্লান্তি। এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আমরা বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলে আমাদের ক্লান্তি দূর হয়, মন প্রশান্ত হয় এবং আমাদের কর্মশক্তি ফিরে আসে। আমরা তখন নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হই। আর বিশ্রাম ছাড়া যদি আমরা ক্রমাগত কাজ করতে থাকি, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কাজের সফলতার জন্য এবং বেশি শক্তি অর্জনের জন্য কাজের সঙ্গে উপযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু দুঃখ হলেও সত্য, অনেক ধনী শ্রেণির মানুষ আছেন, তারা তাদের স্বার্থের কারণে শ্রমিকদের বেশি কায়িক পরিশ্রম দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করে থাকে। পক্ষান্তরে শোষিত গরিব অবহেলিত, শোষিত, শ্রমিক শ্রেণির মানুষ শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে ৮ ঘণ্টা কাজের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকেই নির্যাতিত হন এবং নিহত হন। অবশ্য ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়াতে ILO (International Labour Organization) সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ করার পক্ষে যুক্তি পেশ করেন এবং এ জন্য মে মাসের ১ তারিখকে ‘বিশ্ব শ্রমিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আবার সমাজে কিছু ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। আমরা ইংরেজি প্রবাদে পড়েছি- ‘Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy and wise.’ কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী কিংবা গবেষককে দেখা গেছে তারা ভালো রেজাল্টের আশায় প্রায়শ নিজের ইচ্ছায় রাত জেগে লেখাপড়া করে কিংবা কম্পিউটারে কাজ করেন। এতে অনেক সময় হিতে বিপরীতও হয়। টানা কাজের ফলে তাদের অনেকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। ফলে চিকিৎসার খরচও বেড়ে যায়। অথচ যদি নিয়মিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রুটিন মাফিক কাজ করে বিশ্রাম নেওয়া হয়, তাহলে তেমন জটিল কোনো সমস্যাই থাকবে না।
কাজ ও বিশ্রাম একে অপরের সঙ্গে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে ভাবা যায় না। তাই কাজের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রামের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আরো পড়ুন : ২টি ভাবসম্প্রসারণ, ২য় পর্ব, ৯ম, ১০ম ও এসএসসি বাংলা ২য় পত্র
গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন
নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন
ভাবসম্প্রসারণ: গ্রন্থগত বিদ্যা যা আত্মস্থ করা হয়নি এবং নিজের ধন যখন অন্যের হাতে থাকে তখন, সবই নিরর্থক। কারণ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে এগুলো যথাযথ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তখন ওই সময় কষ্ট ভোগ করতে হয়।
পৃথিবীতে মানুষের জীবনে ধন-সম্পদ ও বিদ্যার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বিদ্যা যদি গ্রন্থের ভেতরেই মলাটবদ্ধ হয়ে নির্জীব পড়ে থাকে, মানুষ যদি তা আত্মস্থ না করে কিংবা আত্মস্থ করে চলমান জীবনপ্রবাহে কাজে লাগাতে না পারে, তবে সে বিদ্যা মূলত কোনো বিদ্যাই নয়। মলাটবদ্ধ নির্জীব বিদ্যাকে মুক্ত করে এনে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হয়। তবেই সে বিদ্যা পৃথিবীর মানুষের মঙ্গলার্থে ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের ‘থ্রি ইডিয়েটস’ চলচ্চিত্রে আমির খান প্রতীকীরূপে ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে ভালোভাবে আত্মস্থ করার মাধ্যমে লেখাপড়া করে পরবর্তী সময়ে তিনি একটা ভালো চাকরি পান। কিন্তু তার দুই বন্ধু মা-বাবার চাপে জোর করে ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে পড়তে গিয়ে তেমন ভালো করতে পারেনি। আর চাতুর নামে এক বন্ধু সে শুধু না বুঝে মুখস্থ করায় তার আরও খারাপ ফলাফল হয়। অন্যদিকে নিজের অর্জিত ধনসম্পত্তি যদি অন্যের কাছে রক্ষিত থাকে, তবে প্রয়োজনের সময় রক্ষিত সম্পত্তি উদ্ধার করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। কেননা নিজের কাছে রক্ষিত ধনসম্পত্তিই প্রয়োজনমাত্র মানুষ ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং সার্থক ও সুন্দর জীবনের প্রয়োজনে বিদ্যাকে গ্রন্থের বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে আত্মস্থ করতে হবে, পরের হাতে সংরক্ষিত সম্পত্তিকে নিজের করায়ত্ত করতে হবে। বিদ্যা ও ধনসম্পদ যখন মানুষের যথার্থ প্রয়োজন মেটায় তখনই তার সার্থকতা। কিন্তু মানুষের যথার্থ প্রয়োজনের সময় যদি তা কাজে লাগানো না যায় তবে সেই বিদ্যা ও অর্থ-সম্পদের কোনো মূল্য নেই।
গ্রন্থগত বিদ্যা এবং পরহস্তের ধন জীবনের প্রয়োজনীয় সময়ে অব্যবহৃত থাকে বিধায় এগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো বিদ্যা বা ধন নহে। এ বিদ্যা
এবং ধনকে মানুষের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে অর্জন করতে হবে। আর বাস্তব জীবনে সেগুলোর প্রয়োগও করতে হবে।
আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে
ভাবসম্প্রসারণ: কাজই মানুষের পরিচয়কে ধারণ করে। তাই মুখে বড় বড় কথা বলার পরিবর্তে কাজে মনোনিবেশ করলে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হবে।
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা অনেক কথা বলতে ভালোবাসে কিন্তু কাজের সময় ফাঁকি দেয়। আবার অন্যের সমালোচনা করার বেলাতেও তারা অত্যন্ত পটু। এসব মানুষ সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তারা সভ্যতার বিকাশে কোনো ভূমিকা রাখে না বরং এর অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। নিজে কাজ করলে এবং অন্যের কাজে সহায়তা করলে আমাদের দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। বিশ্বের সব দেশেই শ্রমকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। মহামানবদের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায়, তারা কর্ম ও নিষ্ঠা দিয়ে পৃথিবীতে নিজেদের নাম স্মরণীয় করে রেখেছেন। এখন থেকে চার দশকেরও বেশি সময় আগে নিল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিন্স ও এডউইন অলড্রিন- এই তিনজন মানুষ ঐকান্তিক সাধনা, নিরলস শ্রম ও কঠোর অধ্যবসায়ের ফলে চাঁদে অবতরণ করতে পেরেছিলেন। এই দুঃসাহসিক কাজের জন্য তারা আজও মানুষের কাছে বরণীয় হয়ে আছেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তারা বিজ্ঞানকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদেরও উচিত তাদের পথকে অনুসরণ করে ভালো ও পুণ্যকর্ম করে নিজের, পরিবারের তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করা।
অর্থহীন কথা পরিহার করে কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াতেই নিজের ও দেশের উন্নতি নিশ্চিত করা যায়। তাই আত্মঅহংকার পরিত্যাগ করে কাজ ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর