কংক্রিটে গেঁথে থাকা একটি ছোট্ট নুড়ি পাথর:
কেঁচোদের উদীপ্ত উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি যেন, একটুও নড়ছে না।
ইতিহাসের ছোট্ট মাইলফলক, ছোট্ট বিজয়তোরণ
এখানে কখনও কিছুই ঘটেনি: কিছুই নড়ছে না।
বাতগ্রস্ত একটা ছোট খুঁটি
তার গা থেকে কে যেন সেই নোটিশটা চুরি করে নিয়ে গেছে
যাতে লেখা ছিল নোটিশ চুরি করা নিষেধ:
একটুও নড়ছে না।
বিদ্যুতায়িত বিজলির তার
পায়ের ক্ষতের স্বপ্নগুলোকে তারা পাহারা দিচ্ছে:
একটুও নড়ছে না।
আর তাই, কোনো একদিন কেউ যখন মুখোমুখি হলো
গড়িয়ে চলা একটা কিছু বুঝি কাছাকাছি চলে আসে,
তারা তাতে লাথি মারে।
ধ্ববি-প্রতিধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে,
ছিঁড়ে যায় মন্দিরের পর্দা
হাজার হাজার মানুষের বিস্মিত বিমুগ্ধ মুখ
হাঁ-হয়ে যায় শ্বাসরুদ্ধকর নীরব বিস্ফোরণে–
কোটি বর্ষ আগের ট্রাইলোবাইট তখনই বুঝি
চিৎকার করে ওঠে: গোল!
ভোরবেলা প্রথমে ডোরবেল, পরে ঘন ঘন কড়া নাড়া শুনে সন্দেহবশে দরজার একটা পাল্লা খুলে আমি অবাক, ভাল্লুকের চামড়ার লং কোট, মাথায় বোধহয় শেয়ালের চামড়ার কানঢাকা টুপি, হাঁটুঅব্দি বুট, সব ভেদ করে মুখটা হঠাৎ চিনতে পারি, আমার দাদা।
এবার বাড়ি এল বারো বছর পর। চলে যাওয়ার প্রথম বছর শীতকালে তিন মাসের ছুটিতে এসেছিল, তার পর এই। দাদা আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটিতে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের ওপর পিএইচডি করে সেখানেই পড়ায়।
দাদাকে এভাবে দেখে তখনো আমার ঘোর ভাঙেনি, প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে আমার পড়ার টেবিলে রিভলবারের মতো কী একটা রেখে বলল, সাবধানে রাখিস। ফুললি লোডেড। দরকার হলেই নেব।
‘এটা কী? রিভলবার?’
‘আহামাগিক।’
‘আহামাগিক মানে?’
‘এস্কিমোদের ভাষায় ‘নিশ্চয়’। তুই ‘আহাইলা’ও বলতে পারিস।’
‘এই শাদা রঙের রিভলবার তো দেখিনি কোথাও।’
‘এ হলো তিমির মাথার হাড়ের তৈরি। ইনুয়িৎদের বানানো। অ্যাঙ্কোরেজের সাপ্তাহিক হাটে পেয়েছি।’
গুলি কী করে ভরে, গুলি সিসার, না তাও তিমির হাড়ের, মনে মনে ভাবছি, তার মধ্যেই দেখি দাদা বারকতক নাক টেনে কিছু শুঁকে কপাল কুঁচকে বলল, ‘এ সেই অমানুষের গন্ধ। মানুষদের ভেতরটা পচে গেলে এমন দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়।’
দাদার কথার সঙ্গে তার চোখের তারার চাঞ্চল্য আমার চোখে পড়ল।
‘এ-শহরে অনেক মানুষ পচে আছে। অমানুষদের উৎকট গন্ধ পাচ্ছি।’ বলতে বলতে টেবিল থেকে ছোঁ মেরে রিভলবার তুলে নিয়ে দাদা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ঘণ্টাতিনেক পর যখন ফিরে এল, ঘর দুর্গন্ধে ভরে গেছে। দাদার প্যান্টে পায়ের দিকে চোরকাঁটা লেগে আছে। পকেট থেকে একমুঠো গান্ধিপোকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, শ্মশানে বা কবরে নিয়ে যা, সৎকার করতে হবে। শয়তানগুলো যেন আর পৃথিবীতে না ফেরে।
গান্ধিপোকার বিশ্রী গন্ধকে ভাবছে অমানুষের দুর্গন্ধ। দাদার মাথা ঠিক আছে!
তুমি পাগল হয়ে গেছ, একথা কি নিজের দাদাকে বলা যায়! শুধু বললাম, তোমার ভাল্লুকের চামড়ার কোটে গরম লাগছে না?
‘ঠাণ্ডা-গরম তুই কাকে বলিস? আমাকে যখন আলাস্কায় শীতকালে ট্রেনে ফেয়ারব্যাঙ্কস যেতে হয়, তখন রেললাইনে দশ-বারো ফুট উঁচু বরফ কেটে ট্রেন চলে। তাও সপ্তাহে দুই দিনের বেশি রেল চালানো যায় না।’
স্মৃতির মধ্যে ডুবে গিয়ে আবার বলল, তুই যদি টালকিটনা থেকে ডেনালি হয়ে ফেয়ারব্যাঙ্কস যেতে রেলপথের দুধারে দেখিস ফায়ারউইডের সবুজ গাছে গোলাপি-বেগুনি ফুল ধরে আছে, বুঝবি আলাস্কায় ভয়াবহ শীত এল বলে।
আলাস্কার কথায় দাদার উৎসাহ দেখলে কে বলবে, হঠাৎ হঠাৎ তার অদ্ভুত পাগলামি জেগে ওঠে।
আলাস্কায় আসন্ন শীতের কথায় দাদাকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখার চেষ্টায় বললাম, ফায়ারউইড কী ধরনের ফুল, দাদা? আমাদের বাংলায় এইরকম কোনো ফুল আছে?
‘ফায়ারউইড মানে কী বল তো? আমি একটা বাংলা করেছি–আগুনে আগাছা। উজ্জ্বল গোলাপি-বেগুনি রঙের ফুলের ঝাড়, চলন্ত ট্রেন থেকে দেখায় যেন গোলাপির দীর্ঘ একটা পোচ। আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ার পরও খুব দ্রুত আবার ফুটে ওঠে বলেই এ ফুলের নাম ফায়ারউইড। আলাস্কার বাসিন্দাদের বিশ্বাস, ফায়ারউইড গাছের ডগাঅব্দি ফুলে ভরে গেলে তার ছ-সপ্তাহ বাদেই ভয়াবহ শীতের আগমন। এমনিতেই ওখানকার গ্রীষ্মকালও তোদের শীতকাল। তখন টেম্পারেচার কত জানিস। ১৩ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।’
দাদা যখন আলাস্কার কথা বলে, তখন সে একেবারেই সুস্থ। তখন আর গান্ধিপোকার গন্ধকে অমানুষের দুর্গন্ধ বলে না।
দরজায় পর পর অনেকবার বেল শুনে আমি দরজা খুলে দিই। সবাই পাড়ার লোক। এরা সবাই রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী। অধিকাংশই উচ্চপদস্থ। দাদা এসেছে খবর পেয়ে দেখতে এসেছে।
‘কই হে, জগদীশের বড় ছেলে কই? দীপকে দেখতে এলাম।’ যিনি বললেন, তিনি আমার বাবার অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। কর্মজীবনে বাবার বস।
দাদা একবার মাত্র গন্ধ শুঁকে বলে উঠল, ‘ঘুষের চোঁয়া ঢেঁকুর। এর আর জীবনের অধিকার নেই।’ বলেই রিভলবার তাক করল। ভদ্রলোক সবাইকে ধাক্কা মেরে খোলা দরজা দিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়লেন। তার পেছন পেছন আরও কয়েকজন ছিটকে গেলেন।
দাদার দর্শনার্থীদের মধ্যে দুই মহিলাও ছিলেন। দুজনের চুলেই অল্প পাক ধরেছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। আরেকজন তার সহোদর, গণিতের অধ্যাপক। দুজনই অবিবাহিত। দুই বোন বহুদিন ধরে খালি জমি দেখলেই সেখানে গাছের চারা লাগান, নিজেদের পৈতৃক বাড়ির সামনে ও পেছনের অনেকখানি জমিতে সুন্দর বন সৃষ্টি করেছেন।
দুজনকেই অনেকটা এরকম দেখতে লক্ষ্য করে তাদের দিকে তাকিয়ে দাদা বলে উঠল,
‘আপনারা দুই কুমারী
এই পৃথিবীর পূজারি।’
‘আলাস্কায় কোথায় থাকেন আপনি?’
দাদাকে চুপ করে থাকতে দেখে ভাইস চ্যান্সেলরের প্রশ্নের উত্তর আমিই দিলাম–অ্যাঙ্কোরেজে। আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটিতে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের জীবন ও সংস্কৃতি পড়ান।
‘আলাস্কায় প্রচুর গাছ শুনেছি।’ গণিতের অধ্যাপকের কথায় দাদার উত্তর–অরণ্যের আনন্দ, জঙ্গলের দাপট দেখতে আলাস্কায় সবার অবশ্যই যাওয়া চাই। আপনাদের তো যেতেই হবে। আপনারা পৃথিবীর পূজারি।
‘খুব সুন্দর বলেছেন, আমরা দুই কুমারী এই পৃথিবীর পূজারি।’
অনেক দিন পর দাদা ছন্দ মিলিয়ে কথা বলল। আগে মাঝেমাঝেই বলতে শুনতাম। আমি তখন খুবই ছোট।
একদিন দাদাকে কোথাও না দেখে আমি ছাদে উঠে দেখি দাদা চোখ সরু করে কালো মেঘের কুণ্ডলীর দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে রিভলবার।
দাদা ফিসফিস করে বলল, কালো বস্তায় ভরে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের চাঁদ দেখাবে বলে নিয়ে যাচ্ছে। রাত বাড়লে কুচিকুচি করে কেটে খাবে। আকাশ ভরা উৎকট গন্ধ পাচ্ছিস না? অমানুষদের গায়ের দুর্গন্ধ! আমার রেঞ্জের মধ্যে এলেই গুলি করব।
এই রিভলবার থেকে গুলি কী করে বেরোয়, দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, নিচে ঘন ঘন ডোরবেল শুনে নেমে এসে দরজা খুললাম। একদল পুলিশ। তারা ঘরে ঢুকেই বলল, শাদা রিভলবার হাতে একজনকে এই বাড়িতেই ঢুকতে দেখেছি। সে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে? কোথায় লুকিয়ে রেখেছ লোকটাকে?
‘ভদ্রভাবে কথা বলুন। সে আমার দাদা। আলাস্কা অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। বারো বছর পর কলকাতায় এসেছে।’
‘রাস্তায় রিভলবার নিয়ে কয়েকজনকে তাড়া করতে দেখেই আমরা খুঁজতে খুঁজতে এ বাড়িতে এসেছি। ডাকুন তাকে।’
দাদা নিজেই গোলমাল শুনে নেমে এল। হাতে রিভলবার।
পুলিশ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলবারটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই দাদা একবার নাক টেনে গন্ধ শুঁকে বলে উঠল, এঃ। অমানুষের গন্ধ।
একজন দীর্ঘদেহী পুলিশ অফিসার দাদার হাত থেকে রিভলবারটা কেড়ে নিয়ে বলল, যাদের তাড়া করেছিলেন, তাদের দুজন আই উইটনেস হিসেবে আমাদের সঙ্গেই আছে। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। থানায় চলো!
আই উইটনেস দুজনকে দেখেই দাদা চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল, ‘এদের চেনেন? সন্ধ্যে হলেই এরা জোনাকি খেয়ে বেড়ায়। শহরে এখনো যে-কটা গাছে জোনাকির আলো জ্বলে, তার সবই প্রায় শেষ করে এনেছে। এদের দলে অনেকে ছিল। বেশ কয়েকজন আমার রিভলবারের গুলিতে রাস্তায় লুটোচ্ছে দেখেননি আপনারা?’
পুলিশ দাদাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল।
আবার বেল শুনে দরজা খুলে দেখি, দুই পৃথিবী পূজারি। ‘তোমার দাদাকে দেখছি না তো! বলো আমরা এসেছি।’
আমার মুখে সব ঘটনা শুনে ওরা দুজনেই থানায় গেলেন। আমিও সঙ্গে গেলাম।
থানায় ভিসি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। উনি কাউকে খুন করতেই পারেন না। আলাস্কা থেকে এসে শহরে পা দিয়ে অমানুষদের দুর্গন্ধ পাচ্ছেন। রিভলবারটা পরীক্ষা করুন। তাহলেই বুঝবেন, এ কোনো মারণাস্ত্র না। ওর ভাইকে বলেছেন এটা নাকি তিমির খুলির অংশ দিয়ে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের তৈরি।
রিভলবারটা সবদিক থেকে নেড়ে চেড়ে দেখে দারোগা হো হো করে হেসে উঠলেন। তার পর একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরকে দেখে সিগারেট ঠোঁট থেকে নামিয়ে রেখে বললেন, প্রফেসর সোমকে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু অ্যারেস্ট যখন করেছি তখন একটা রিপোর্ট লিখতে হবে। আপনার নাম?
প্রশ্নটা আমাকে।
‘আমার আসল নাম রিপন। দাদা আমাকে স্কুলে ভর্তি করার সময় করে দিয়েছেন কৃপণ।’
‘দীপন সোমের ভাই কৃপণ সোম? কৃপণ কেন?’
‘ছোটবেলায় গ্রীষ্মকালে দেখেছি, বরফগুঁড়োর ওপর লাল-নীল সিরাপ ছিটিয়ে ভাঁড়ে করে বিক্রি করত। সেই সব ফেলে দেওয়া মাটির খুড়ি কুড়িয়ে জমা করতাম, কেউ চাইলে একটাও দিতাম না। তা দেখে দাদা ওই কৃপণ নাম দিয়েছে।’
থানা থেকে দুই বোনের গাড়িতে বাড়ি ফিরে ভিসি দাদাকে বললেন, সামনের শনিবার ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনারের আয়োজন করছি। আপনি চিফ গেস্ট। আলাস্কার প্রকৃতি, বিশেষ করে বিশাল জঙ্গল, হ্রদ, পাহাড়, হিমবাহ নিয়ে আপনার কথা শুনতে শহরের সব বিশিষ্টরা সেদিন ভিড় জমাবেন। যাকেই ফোনে বলছি, তিনিই কনফার্ম করছেন, আসছেন। ইউনিভার্সিটি থেকে সবার কাছে ইনভিটেশন কার্ডও পাঠানো হবে। কার্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে ছাপাবার জন্য আপনার নামটা জানতেই আপনাদের বাড়ি এসেছিলাম আজ। এখন তো জেনেই গেলাম।
দাদা চুপ করে আছে।
গণিতের অধ্যাপিকা বললেন, আপনার পরিচয় তো বিরাট। প্রফেসর, আলাস্কা অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটি, ইনুয়িৎ এস্কিমো লিখেছি, কিন্তু এ তো যথেষ্ট নয়। আরও লেখা দরকার। আপনার কর্মপরিধি নিয়ে একটু বলুন না।
‘লিখতে পারেন, শহরের অমানুষ হত্যার দায়ে পুলিশ আমাকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আরেকটা কথাও লিখতে পারেন, প্রতি শুক্রবার অ্যাঙ্কোরেজের সাপ্তাহিক হাটে ঘুরে ঘুরে এস্কিমোদের হস্তশিল্প দেখা আমার বহুদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে তাদের প্রাচীনকালের অদ্ভুত উদ্ভাবনা যদি কিছু দেখা যায়।’
ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারের দিন, শনিবার দাদার ওয়ার্ডরোবের লক ভেঙে শাদার ওপর শাদা কাজ করা পাঞ্জাবি জোর করে আমিই পরিয়ে দিলাম। একজন অতীব সুন্দরী দাদার হাতে বিরাট একটা ফুলের স্তবক তুলে দিল। আরেকজন তরুণী দাদাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়ার পর সভাঘরের হাততালি আর থামতে চায় না। তার মধ্যেই দাদা মাইকের কাছে মুখ নিয়ে বলল, এত ফুল তাদের মায়ের কোল খালি করে নিয়ে এলেন!
দাদার সুদৃশ্য আবরণমোড়া চেয়ারের দুপাশে দুজন বিশিষ্ট অতিথি বসেছিলেন। তাদের একজন, তার সুসজ্জিত আসনে বসেই হ্যান্ড স্পিকার মুখে লাগিয়ে বলে উঠলেন, ফুল গাছেই পচে, গাছ থেকে ঝরে যায়।
দাদা গলায় উত্তেজনা নিয়ে বলল, ওদের গাছেই পচতে দিন। গাছতলায় ঝরে পড়তে দিন। মানুষ যেমন তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্যের শেষে মরে যায়, ফুলেরও তেমন স্বাভাবিক জীবনাবসান হতে দিন। আলাস্কার কোনো এস্কিমোই ফুল ছিঁড়ে নেওয়া ভাবতেই পারে না। মাইলের পর মাইল ফায়ারউইড ফুটে থাকে, কেউ তার একটাও কি কখনো ছিঁড়ে নেয়? আলাস্কায় প্রকৃতির কোলে জীবনযাপন করে কেউ সেই প্রকৃতিকেই আহত করে? না, না, না, করে না।
দাদাকে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক কিছু শুঁকতে দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দাদা চোখ ঘুরিয়ে বলতে লাগল, এখানে লোকে কারণে অকারণে মানুষ খুন করে। কেন? যাদের হৃদয়ে কোনো দয়ামায়া, করুণা নেই, অন্যের প্রতি ভালোবাসার অভাব, তারা সবকিছুকেই আঘাত করে। এখানেই তেমন কয়েকজন অমানুষের দুর্গন্ধ পাচ্ছি। এখানে আসবার আগে আমার ভাই আমার রিভলবার সরিয়ে ফেলেছে। না হলে এখনই কয়েকজনকে গুলি করতাম।
সভাঘরের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল। শহরের পুলিশ কমিশনার, একদা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী ছাত্র, তিনি প্রথম সারির শ্রোতাদের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনার এই খুনের হুমকির জন্য আপনাকে এখনই গ্রেপ্তার করা যায়। নেহাৎ এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। আমি এখানকার ছাত্র, তাই ভিসির জোড় হাত দেখে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।
দাদা কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে দাঁড়িয়ে থাকল। তার পর বলল, খুন করিনি, অমানুষদের শুধু খুনের হুমকি দিয়েছি, সেটাই একটা বড় অপরাধ! আপনারা যারা নিজেদের স্বার্থে অহরহ মানুষ খুন করছেন, জীবন্ত গাছ থেকে, স্নেহশীলা লতা থেকে শত শত ফুল ছিঁড়ে আনছেন, তারা সম্পূর্ণ নিরপরাধ!
পুলিশ কমিশনার তখনো দাঁড়িয়ে আছেন, দাদার কথাগুলো শুনে গলার স্বর না নামিয়েই বললেন, ফুল গাছেই শুকোয়, গাছতলায় ঝরে পড়ে। সেই ফুল আগেই তুলে নিলে কার কী ক্ষতি হয়? বুঝিয়ে বলুন।
দাদা দৃঢ় গলায় বলল, গাছেই পচে গাছতলাতেই ফুলকে ঝরতে দিলে সেটাই তার জীবনের সুন্দর শেষ। তাকে হত্যা করে অকালমৃত্যু ঘটানো তো পাপ। অমানুষ ছাড়া কেউ কি হত্যাকারী হয়?
একদিকে সাংবাদিকরা দাদার বক্তৃতা নোট করছে, অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা তাদের মুভি ক্যামেরায় ভিডিও করতে ব্যস্ত। কেউ কেউ মোবাইল স্টিক উঁচু করে ধরে তাতে দাদার বক্তৃতা রেকর্ড করতে উদগ্রীব।
ভিসি দাদার খুব কাছে গিয়ে মুখের সামনে হাতের তালুর আড়াল নিয়ে কানে কানে বললেন, আপনি আলাস্কায় কী কী দেখেছেন, সেখানকার ভূ-প্রকৃতি কেমন তা নিয়ে বলুন।
দাদা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আলাস্কা ট্যুরিস্টদের দেখার মতো দেশ নয়। শুধু যদি একদিন সিউয়ার্ড থেকে আলাস্কা রেলে অ্যাঙ্কোরেজ আসেন, তাতেও আলাস্কার অচেনা ভূ-প্রকৃতি, নদী, পাহাড়, অরণ্য কিছুটা দেখতে পাবেন। যদি কখনো যান, খাতায় লিখে রাখতে পারেন, সিউয়ার্ড থেকে অ্যাঙ্কোরেজ ১২৭ মাইল। প্রথমে সিউয়ার্ড থেকে কেনাই ফিওর্ড ন্যাশনাল পার্কের এক্সিট গ্লেসিয়ার দেখে পরদিন ট্রেনে চড়তে পারবেন। গার্ডউড থেকে ছোট শাখা-লাইন ১৩ মাইলের মতো নেমে, চলে গেছে হুইটিয়ার-এ। ভাবুন এখানেই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড গ্লেসিয়ার রাজ্যের প্রবেশদ্বারে। এভাবে এই ট্রেনে গার্ডউড বা হুইটিয়ারের প্রচলিত পথ না পেলে আলাস্কা রেলরোডের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করে একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন। অথবা সড়কপথে যেতে পারবেন। আমি তো সেভাবেই ঘুরেছি।
একটু থেমে আবার বলতে লাগল, ফেয়ারব্যাঙ্কস থেকে সিউয়ার্ড প্রায় ৫০০ মাইল। দীর্ঘ এই রেলযাত্রাই হতে পারে এক অবিস্মরণীয় ভ্রমণ। একবার টালাকিটনা থেকে ডেনালি ন্যাশনাল পার্ক ও ডেনালি পার্ক থেকে ফেয়ারব্যাঙ্কস–সাত দিনে দু-দফার এই রেলযাত্রার শেষে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেলিন জনসন তার ‘পোর্ট্রেট অব দ্য আলাস্কা রেলরোড’ বইয়ে কেন বলেছেন, আলাস্কায় বাস করে আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে ছেলেবেলায় যা কিছু স্বপ্ন দেখেছি তার সবই ছাড়িয়ে গেছে এই ট্রেনযাত্রা।
সবাই মুগ্ধ হয়ে দাদার কথা শুনছে। দুজন শুধু পরস্পরের কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু বলাবলি করছে।
হঠাৎ একটা বিরাটাকার স্লিফার ডগ হলে ঢুকে শ্রোতাদের পা শুঁকতে লাগল। একজন পুলিশ তার চেইন ধরে তার পেছন পেছন চলেছে। সঙ্গে আরও কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ। কুকুর যখন একজনের পা শুঁকে দাঁড়িয়ে পড়ে বারবার তার গন্ধ শুঁকতে লাগল, তখনই তাকে দুজন পুলিশ জাপটে ধরে হলের বাইরে নিয়ে গেল।
কুকুরের গন্ধ শোঁকা দেখে দাদা হাওয়ায় গন্ধ শুঁকে বলল, এখানে অর্ধেক মানুষই অমানুষের গন্ধবহ।
দাদার কথার প্রতিবাদের মধ্যেই অনেক পুলিশ অফিসার একজন বিশিষ্ট অতিথিকে নিয়ে ঢুকলেন। কাগজে প্রায়ই এর ছবি বেরোয়। টিভির খবরেও দেখা যায়।
কালো চশমা চোখে তার প্রায় গা ঘেঁষে আছে দুজন ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো। হলে ঢুকেই তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট ভিসির উদ্দেশে বললেন, অ্যাপলজি টু ইউ ম্যাডাম ভিসি, অ্যান্ড আদার প্রফেসরস। ক্যাবিনেট মিটিংয়ে আটকে গিয়ে এখানে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। আনকন্ডিশনাল অ্যাপলজি টু প্রফেসর ড. দীপন সোম ফর মাই আনঅ্যাভয়ডেবল ডিলে।
দাদাকে নাক টানতে দেখে আমি প্রমাদ গুনলাম। তার চোখের তারা দুদিকে অস্বাভাবিক ঘুরছে। দাদা হঠাৎ মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে এসে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘অমানুষ! সাংঘাতিক অমানুষ! দেশের সব বনজঙ্গল, নদনদী, সমুদ্র, পাহাড়, হিমবাহ বণিকের হাতে তুলে দিয়েছেন।’
দাদার কথার মধ্যেই ভিসি মঞ্চ থেকে দ্রুত নেমে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করে মন্ত্রী মশাইয়ের একহাত ধরে মঞ্চে ওঠার ছোট সিঁড়ির দিকে পা বাড়ানো মাত্রই দাদা চিৎকার করে বলল, ছোঁবেন না, ছোঁবেন না, ওকে ছোঁবেন না। যে হাতে আপনার পৈতৃক ভিটেয়, শহরের রাস্তার ধারে নিত্য গাছ লাগান, সেই প্রকৃতি পূজারির পবিত্র হাত অমানুষের গায়ে লাগাবেন না।
পুলিশের দল লাফিয়ে মঞ্চে উঠে দাদার দিকে হাতের রিভলবার তাক করল। ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো দুজন মন্ত্রীকে ঘিরে চারদিকে নজর তীক্ষ্ম করে রাখল।
পুলিশবাহিনী যখন দাদাকে টেনেহিঁচড়ে মঞ্চ থেকে নামাচ্ছে, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখছি, অতি বিশিষ্ট সেই অতিথি বলে উঠলেন, দাঁড়াও। প্রফেসরের মুখে আলাস্কার কথা অনেকটাই মিস করেছি, বাকিটা শুনতে চাই।
দাদা আলাস্কার বনজঙ্গল ঘুরে, সে রাজ্যে মাসের পর মাস এস্কিমোদের সঙ্গে থাকার অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতার কথা অনেকক্ষণ ধরে বলে গেল। একটানা দাদাকে বলতে শুনলাম, সুমেরু বৃত্ত পার হয়ে এস্কিমোদের গ্রাম কোল্ডফুট, তার পর ওয়াইজম্যান, আরও উত্তরে আলাস্কার সর্বোত্তর বিন্দু, বোফোর্ট সমুদ্রকূলে ইনুপিয়াৎ এস্কিমোদের আদিবাস ব্যারো গ্রাম, সেখানে তাদের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা আমার মনে আজও গেঁথে আছে।
কথার শেষে হঠাৎ হাওয়ায় গন্ধ শুঁকে, বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদা বলে উঠল, অমানুষের দুর্গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
সামনের স্পিকারে দাদার কথা হলের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত গমগম করতে লাগল। দীর্ঘশ্বাসও শোনা গেল।
মঞ্চের কয়েকজন তাকে একরকম জোর করে না থামালে দাদার কথা হয়তো আর শেষ হতো না।
ভিসি যাকে ফুলের স্তবক ও উত্তরীয় দিয়ে বরণ করে বিশেষ অতিথির আসনে বসিয়েছিলেন তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ভিসির কানে কানে বললেন, এ তো মেন্টাল কেস। যেসব রাস্তার কথা, রেলপথের কথা বলল, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সবই পাগলের প্রলাপ। ওকে নিউরোলজিস্ট দেখান বা কোনো পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। আলাস্কা থেকে একটা পাগলকে ধরে এনেছেন আপনারা?
গভীর উপত্যকার মাঝে, ন্যাড়া পাহাড়ের চূড়ায়
বর্ণিল পতাকার মতো রঙিন পোশাক পরা মানুষগুলো
লাফাচ্ছে আর সেই সঙ্গে তাদের হাওয়ায় উড়তে থাকা
বলটাও লাফিয়ে চলেছে।
এই তো শূন্যে বলটা আবার লাফিয়ে উঠল,
উৎফুল্ল রঙিন মানুষেরা বলটাকে হেড করার জন্য
ফোয়ারার মতো উছলে উঠল।
বলটা বাতাসের টানে উড়ে গেল দূরে–
রবারের মতো এপাশ-ওপাশ করা মানুষেরা
বলের পেছনে লাফাতে লাফাতে ছুটছে।
একেবারে গাছের মগডালের অতল গহ্বর পর্যন্ত
বলটা লাফিয়ে উঠে শূন্যে বাতাসে ঝুলে রইল
দর্শকেরা সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
বলটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে আবার ফিরে এলো।
ফুটবলারদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে
স্বর্গের জ্বলন্ত গহ্বর থেকে বাতাস ধেয়ে আসছে
চারপাশের পাহাড়গুলোর তীব্র ঝলমলে আলোয়
অদ্ভুত রঙ মিশিয়ে ছুড়ে দিল অন্ধকার।
তারপর ইস্পাত-কঠিন বৃষ্টি নেমে এলো।
সবার চুল কপালে সেঁটে গেছে, ভেসে যাচ্ছে ঘামে
কাদার ওপর যেন জমে আছে ঝিলমিল জল
ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে তাদের চিৎকার
বয়ে যাচ্ছে খুব সূক্ষ্ম ও ক্ষীণ আনন্দের স্রোতধারা
আটলান্টিকের গভীর নিম্নচাপের মতো উন্মত্ততায়
কুঁজো হওয়া পৃথিবীটা ডুবতে ডুবতে যাচ্ছে তলিয়ে।
উপত্যকাটা অচিন্তনীয় নীল রঙে যখন সেজেছে
উইঙ্গাররা লাফিয়ে উঠল, যেন শূন্যে সাইকেল চালাচ্ছে
আর গোলরক্ষক বাতাসে আড়াআড়ি ভাসালো শরীর
আরও একবার দেখা গেল সেই সোনালি অগ্নিযজ্ঞ
তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেঘের প্রান্তটা তুলে ধরল।
টীকা-১: ইংল্যান্ডের ছোট্ট শহর
তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের স্থান শীর্ষে। বিশ্বের খ্যাতিমান লেখকরা ফুটবল নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। এদেরই দুজন–টেড হিউজ (১৯৩০-১৯৯৮) ও মিরোস্লাভ হোলুব (১৯২৩-১৯৯৮)। হিউজ ছিলেন ইংল্যান্ডের পোয়েট লরিয়েট। এখানে অনূদিত কবিতাটিতে তার দেখা শহর স্ল্যাকে কীরকম ফুটবল খেলা হতো তার বিবরণ পাওয়া যাবে। হিউজের জীবনীকার এলেইন ফেইনস্টাইন বলেছেন, হিউজের বাবা উইলিয়াম ফুটবল খেলতেন এবং ফুটবল ম্যাচ দেখতেন।
দ্বিতীয় কবিতাটির রচয়িতা প্রখ্যাত চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুব (১৯২৩-১৯৯৮)। এখানে অনূদিত কবিতাটিতে হোলুব ইঙ্গিত করেছেন, ফুটবলের প্রতি আবেগ হয়তো আদিমকাল থেকেই চলে আসছে। এমনকি ৫০ কোটি বছরের আগের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী ট্রাইলোবাইট পর্যন্ত ফুটবলের অনুরাগী ছিল। যিশুর শেষনিশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তে জেরুজালেম মন্দিরের পর্দা ছিড়ে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করেছেন হোলুব।
গল্প থেকে ছোটগল্প হয়ে উঠার দীর্ঘ জার্নি রবীন্দ্রনাথে পরিণতি লাভ করে। ‘গল্পগুচ্ছ’ বাংলা ছোটগল্পের নির্দেশিকা পুস্তক বলা যেতে পারে।
১২৯১ থেকে ১২৯৭ পর্যন্ত–রবীন্দ্রনাথের ‘দেনা পাওনা’ (১২৯৮, হিতবাদী) প্রকাশের আগ পর্যন্ত ছোট আকারে গল্প রচনার ঝোঁক দেখা যায়।’ (‘শত বর্ষের বাঙলা ছোটগল্প: একটি রূপ-রেখা’/ উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, সাপ্তাহিক দেশ, কলকাতা।)
রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী জনপ্রিয় গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। সাধারণভাবে কৌতুক রসসৃষ্টির জন্যই তিনি পাঠকের অনেক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। সাধারণত প্রভাতকুমারের গল্পে দেখি, প্রথম দিকে গল্পটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষের দিকে এমন একটি পরিস্থিতির চমক সৃষ্টি করেন যাতে গল্পের পরিণাম তৃপ্তিদায়ক হয়। আলোচ্য গ্রন্থ ‘পিঁপড়া কাসেম’-এর লেখক সালাহ উদ্দিন পাঠান এমন করেই গল্প বলেন এবং সাজান। উপযুক্ত বয়ানের সমর্থনে তার ‘কিছুই করার ছিল না’ এবং ‘রাত-পাহারা’ থেকে সামান্য উদ্ধৃতি–
‘‘দর্শনার্থীদের একজন বলে ওঠেন, ‘লোকটি কী মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে না।’
পাশের একজন বলে, ‘এত বোঝার দরকার নাই, নিজের চিন্তা করেন, আর এখান থেকে আপনি বুঝতেও পারবেন না। নিষ্প্রাণ দেহকে আপনি কীভাবে ধরে নেবেন সেটাই হচ্ছে আসল কথা।’
পেছনের একজন বলল, ‘ভাইজান আপনে যাই কন না ক্যা, আমার মনে অয় উনি মারাই গেছেন।’
উপস্থিত আরেকজন ধমকের স্বরে বলে, ‘ঐ মিয়া বেশি বেশি কথা কও ক্যা? তুমি কি গণক নাকি?’
‘দেহেন মিয়া ভাই, আমার মামু বেটা যহন মারাত্মক এক্সিডেন্ট কইরা এইরহম আইসিইউতে আছিলো তহনো তো ডাক্তারের কোনো গ্যারান্টি দিবার পারে নাই।’ এ কথা বলেই লোকটি হু হু করে কেঁদে ওঠে। লনের শেষ মাথার ওয়ার্ডবয় জোরসে ধমক দিয়ে উঠলে লোকজনের শোরগোলের আওয়াজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়।
গল্পের আরম্ভ, যেমন–‘শনি ও মঙ্গলের–মঙ্গলই হবে বোধহয়–যোগাযোগ হলে তেলেনাপোতা আপনারাও একদিন আবিষ্কার করতে পারেন। অর্থাৎ কাজেকর্মে মানুষের ভিড়ে হাঁফিয়ে ওঠার পর যদি হঠাৎ দুদিনের জন্য ছুটি পাওয়া যায়–আর যদি কেউ এসে ফুসলানি দেয় যে, কোনো এক আশ্চর্য সরোবরে–পৃথিবীর সবচেয়ে সরলতম মাছেরা এখনো তাদের জলজীবনের প্রথম বড়শিতে হৃদয়বিদ্ধ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, আর জীবনে কখনো কয়েকটা পুঁটি ছাড়া অন্য কিছু জল থেকে টেনে তোলার সৌভাগ্য যদি আপনার না হয়ে থাকে, তা হলে হঠাৎ একদিন তেলেনাপোতা আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন।
তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে একদিন বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে, তার পর রাস্তার ঝাঁকানির সঙ্গে মানুষের গুঁতো খেতে খেতে ভাদ্রের গরমে ঘামে, ধুলো চটচটে শরীর নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক বাদে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে আচমকা।’
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তারিণী মাঝি’, ‘ডাইনী’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তনের ধারায় অগ্রগণ্য বিবেচনা করা যায়। অন্যদিকে সমাজ-বিশ্লেষণে এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণির চরিত্র-চিত্রণে পারদর্শী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ‘ফসিল’ গল্পে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
‘পিঁপড়া কাসেম’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাসেম, একজন পিঁপড়ার ডিম বিক্রেতা। কোর্ট এলাকার ফুটপাতে পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করা তার পেশা এবং রুজিরোজগারের প্রধান উৎস। গ্রামে পরিবার-পরিজন রেখে নগরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে তার জীবনচক্র ঠিক রাখে কাসেম। কিন্তু বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ, পেশাকেন্দ্রিক যোগাযোগ নেট দিয়ে প্রান্তিক জনের লোকাচার ও সংস্কৃতিতে আলোক প্রক্ষেপণ–কাসেম চরিত্রটিতে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে। এভাবে কাসেম, ‘পিঁপড়া কাসেম’-এ পরিচিতি পেয়ে যায়। যার অনুষঙ্গ আদিবাসী সুবেশ চিসিম, মাজার সংস্কৃতির জয়নাল এবং বাউল শিল্পী রেশমা আক্তার।
‘পিঁপড়া কাসেম’ গল্পের সূচনা, মধ্যভাগ ও সমাপ্তি অংশের স্তরে স্তরে লেখকের কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ গল্পটির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
‘পিঁপড়া কাসেম’ গল্প থেকে কিছু উদ্ধৃতি–
‘‘গভীরভাবে আবুল কাসেমকে অবলোকন করতে গিয় খেয়াল করি; ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ওঠা। বোঝা যাচ্ছে: এই লোকটি ভীষণ পোড়-খাওয়া মানুষ। খাটাখাটুনির আর অভাবে বয়সের তুলনায় বয়স্ক লোক বলে ভ্রম হয় তাকে। আমার ধারণ জন্মেছে: আবুল কাসেম বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোটই হবে।” (‘পিঁপড়া কাসেম, পৃষ্ঠা-৮২)
‘যাত্রাহীন বিরতি’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করা’ দণ্ডবিধির বেস্টনিকে কত প্রাঞ্জল ভাষায় মুক্ত করা যায়–এসবের মনঃসমীক্ষণ আশ্রিত তিনটি গল্প।
স্মর্তব্য, অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় ‘মামলার ফল’ রচনা করে বাঙালি পাঠকের মনে স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন।
‘মামলার ফল’-এর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে এখনকার সমাজ, কোর্টকাচারি ও আইনি লড়াই অনেক ব্যয়বহুল ও ফলাফল অনিশ্চিতের।
গল্পকার সালাহ উদ্দিন পাঠান তার আইন পেশায় নিষ্ঠাবান হয়ে এখান থেকে ঘটনা ও উপাদান সংগ্রহ করে সৃজনকল্পনায় সন্নিষ্ঠ থেকেছেন।
আলোচ্য গল্প তিনটি আর্থ-সামাজিক ও পারিবারিক-ত্রিভুজ: মাজহার হোসেন, স্ত্রী আফসানা বেগম ও একমাত্র সন্তান আবীরকে কেন্দ্র করে।
চমৎকার এক সকালের বর্ণনা টেনে ‘যাত্রাহীন বিরতি’ গল্পটির সূচনা-ভাগ। যেমন–
‘বৃষ্টিস্নাত সকালে দরোজা খুলতেই দমকা হিমেল হাওয়া চোখে-মুখে এসে ঝাপটা মারে। এতে শরীরে একধরনের প্রশান্তি লাগলেও আফসানা বেগমের মনে কোনো আরামের ছোঁয়া লাগে না বলা যায়। আর এখন যে সময় তাতে তো এ মুহূর্তটাকে কোনোভাবেই সকাল বলা যায় না। সূর্যের আলোর ছটা কিরণ ছড়ালে সকাল ধরা যায় কীভাবে!’ (‘যাত্রাহীন বিরতি’, পৃষ্ঠা-২১)
সালাহ উদ্দিন পাঠানের তিনটি আইনবিষয়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া গল্পের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ‘মামলার ফল’ গল্পের পাঠ পর্যালোচনায় আমরা এখনকার মামলা-মোকদ্দমা জর্জরিত সামাজিক গল্পের ভিন্ন প্রকৃতির পাঠ পাই। যা সমাজ পরিবর্তন ও বিবর্তনের ‘যোগ-বিয়োগ’ হিসেবে ধরে নিতে পারি।
বলা যায়, কার্যবিধি ধারা ও এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কিন্তু মানবমনের রহস্য এবং অপরাধপ্রবণতা–এ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ এবং এর স্বরূপ কী, পরিধি ও আইনি ব্যাখ্যা কী, কেমন? আদিম এ প্রবৃত্তিটির সাহিত্য পরিধি, রূপায়ণ, এর ভবিষ্যৎ দেখার প্রত্যাশা রাখা হলো।
‘লোকটা আসলে জীবন্মৃত’, ‘একটি মৃত্যুর যন্ত্রণা’, ‘যাত্রাহীন বিরতি’, ‘আবেগী সময়’, ‘কিছুই করার ছিল না’, ‘রাত-পাহারা’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করা’, ‘মৃত্তিকা ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসেছিল’, ‘সহে না যাতনা’, ‘কিছুই না’, ‘পিঁপড়া কাসেম’, ‘লাল সূর্য’, ‘সবুজ ঘাসের গালিচা’, ‘তুমি তো সেই’ এসব নিয়ে মোট ১৪টি গল্প-সমাবেশে সালাহ উদ্দিন পাঠানের ‘পিঁপড়া কাসেম’ গ্রন্থ।
পূর্বে বর্ণিত বিষয়বস্তুর গল্প ছাড়াও রোমান্টিক, মনস্তাত্ত্বিক, মুক্তিযুদ্ধ ও পারিবারিক আবহের আরও কিছু গল্প আলোচ্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে