ঢাকা ২০ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচের আগে বড় সতর্কবার্তা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়ে মিশর বন্যার ঝুঁকিতে জুলাই-আগস্ট, সতর্কবার্তা এফএফডব্লিউসির খামেনির প্রতি বাংলাদেশের শেষ শ্রদ্ধা, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে স্পিকার মোমেনার জন্মদিনে কোয়ান্টাম মঞ্চে ‘গোধূলিবেলায়’ ‘আমি ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু’—নতুন দাবি ট্রাম্পের শরীয়তপুরে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল ভাঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা মামার লাঠির আঘাতে আহত ভাগ্নের মৃত্যু টুঙ্গিপাড়ায় ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে বৃদ্ধ গ্রেপ্তার ঝিনাইদহে বাইসাইকেল বিতরণে জালিয়াতি, উপজেলা জামায়াতের আমির অব্যাহতি মিশরকে হারালেই আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ অস্ট্রেলিয়ার সোনারগাঁয় চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করায় প্রাণনাশের হুমকি ফ্রান্সে তীব্র দাবদাহে ৯০০০ মানুষের মৃত্যু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ৩২ এর ম্যাচে কি খেলবেন মোহাম্মদ সালাহ? সুরের মূর্ছনায় ফিরল বর্ষার স্নিগ্ধতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর জোর মির্জা ফখরুলের মিশরের ফুটবলারদের সঙ্গে ডালাস পুলিশের হাতাহাতি ভিসা স্বাভাবিক, তবে চীন-ভারত সমীকরণে কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ নোয়াখালীতে ইমামের সঙ্গে পালিয়েছে প্রবাসীর স্ত্রী ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান, রাতে পরীক্ষা দেবেন দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী বস্তুনিষ্ঠতাই গণমাধ্যমের একমাত্র মানদণ্ড: তথ্যমন্ত্রী কোটালীপাড়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ভ্যানচালক আটক বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণে নজর নয়াদিল্লির ভুলের কোনো সুযোগ নেই: ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ ‘ব্যাক টু অরিজিন’ থিমে অনুষ্ঠিত হলো মেরিল প্রেজেন্টস ‘মার্ভেল অব টুমরো’ সিজন ৫ একটি গাছ, দুই ভাই, এক মর্মান্তিক পরিণতি ক্যারিয়ারে আগে কখনো এতটা ভালো অনুভব করিনি: হ্যারি কেইন এনজো ফার্নান্দেজকে দলে নেওয়ার খবর ভিত্তিহীন: রিয়াল মাদ্রিদ চট্টগ্রামে গোলবারে ঝুলে জয় উদযাপন করতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু

মা, নিঃসঙ্গ দোয়েল এবং গোখরা সাপ

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৩ পিএম
মা, নিঃসঙ্গ দোয়েল এবং গোখরা সাপ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম
স্বর্ণআলো জড়ানো পুরোনো সেই ঘরগুলো নেই। যে ঘরে নিঃসঙ্গ দোয়েলের শিশুকালের গন্ধ জড়ানো, যে ঘর শৈশবের গন্ধ মাখা, যে ঘরে একটু একটু করে যৌবন ছোঁয়া, সেসব এখন নেই। ঘরে ফিরেই দোয়েল পাখিটা যে সারা বাড়ি তছনছ করে ফেলত, মাকে চিৎকার করে ডাকত, খাবার দিতে একটু দেরি হলেই সারাবাড়ি মাথায় তুলত, সেই বাড়িটা এখন আর নেই। সেই দোয়েলও এখন আর নেই। দোয়েলের সব অত্যাচার সহ্য করা সেই মা-ও নেই। দোয়েলের যৌবন তখনো নদীর ঢেউ ছোঁয়নি, ছুঁইছুঁই করছে- তখুনি মা হারিয়ে গেল। কোথায় যে হারিয়ে গেল! স্বপ্নরঙিন একটা পৃথিবীকে মুহূর্তে কালো মেঘ এসে গিলে খেল। আলোমাখা পথ অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকার তো শুধুই অন্ধকার নয়। অন্ধকারেরও যে কত রূপ থাকে- ফণাধারী সাপের কতো বিষাক্ত ছোবল থাকে! তবুও সাহসের ডানায় উড়তে থাকে দোয়েল, সরাতে থাকে অন্ধকার, বিষাক্ত ছোবলের বিষে কাতরাতে থাকে, নীল হয়ে ওঠে জীবন। তবুও ওড়ে- উড়তে থাকে।
 
কত গভীর হয়ে নিজের ঘরটা দেখতে থাকে দোয়েল- পুরো বাড়িটা দেখতে থাকে- মায়ের পায়ের প্রতিটি শব্দ খুঁটতে থাকে- মায়ের প্রতিটি নিঃশ্বাস অনুভব করতে থাকে- এঘরে-ওঘরে-মাটির উঠোনে- বাড়িজুড়ে মায়ের হেঁটে বেড়ানো- মাকে দেখে- দোয়েলের ঘরে ফেরা দেরি দেখে মায়ের উৎকণ্ঠিত মন আর দুশ্চিন্তার বিষণ্ন চোখ এখনো পথের দিকে ছুটে আসে- মা যেন এখনো দোয়েলকে খুঁজতেছে!
 
দোয়েলের বুকের ভেতর কান্নারা ঢেউ হয়ে ভেসে যায়- চোখের গভীর চোখের জলে ভারী হয়ে আসে- বোকার মতো মুখে হাত নিয়ে বসে থাকে নিঃসঙ্গ দোয়েল। যেন বোকা এক পাখি। সবাই দোয়েলকে দেখে- ভালোবাসে। ভেতরে ভেতরে দোয়েল যে অন্য এক দোয়েল হয়ে ওঠে। সেই ছোট্টবেলার দোয়েল হয়ে যায়। ভীষণ জেদি ও দুষ্টু দোয়েল হয়ে যায়, মাকে সারাক্ষণ জ্বালা-যন্ত্রণায় অবাধ্য সেই ছোট্টবেলার দোয়েল হয়ে ওঠে। সেই দোয়েল পাখিটাকে কেউ দেখে না।
 
সন্ধ্যাভাঙা রাতে কাঁচামাটির উঠোনে ভাইবোন জড়োকুড়ো হয়ে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসা, এর-ওর দিকে বই ছুড়ে ফেলা, দোয়েল মনে মনে সেই দোয়েলকে খোঁজে। মা বসে আছে পাশে- মিষ্টি শাসনে, স্বপ্ন চোখে। একগাদা পাখির শব্দের ভেতর দিয়েই মায়ের চোখে স্বপ্ন বোনে- একদিন আকাশ ছোঁবে। মা স্বপ্ন দেখে, ‘একদিন আমার দোয়েল পাখিরা আকাশ ছুঁবি। গানে গানে সবাইকে মুগ্ধ করবি।’
 
দোয়েল ভাবে, ‘মা, তোমার মনে আছে, সকাল হলেই স্কুলে যাওয়ার সময় বিনা প্রয়োজনে তোমার কাছে টাকা চাইতাম, মা, আট আনা দে তো। আলুর দম খাব। তেঁতুলের টক দিয়ে আলুর দম খাতি সেই রকম লাগে! জিবেতে পানি চলে আসে। তুমি তখন একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে কখনো চার আনা, কখনো আট আনা পয়সা দিতে।’ মায়ের সেই মিষ্টি হাসি দিয়ে পয়সা দেওয়ার ছবিটা এখন দোয়েলের বুকের ভেতর ঝোড়োবৈশাখ হয়ে ওঠে। বেদনার্ত মনে বলে দোয়েল, ‘তুমি কত কষ্ট করেই না সেই পয়সা আমাকে দিতে মা! পয়সার সঙ্গে এ সংসারে তোমার তো কোনো সম্পর্ক ছিল না, পয়সা তো ছিল বাবার দখলে। সারাবাড়ি উঠোনে এখনো আমি আমাকে খুঁজি- মা তোমাকে খুঁজি- মায়ের স্বপ্নভরা চোখ খুঁজি- মায়ের শরীরের গন্ধ খুঁজি। দুঃখের গান ছাড়া আর কিছুই পাই নে।’
 
রাত গভীর হয়, শান্ত হয়ে আসে চারপাশ- নিঃসঙ্গ দোয়েল উঠোনে বসে থাকে- আঁধারের চাদর দোয়েলকে ঘিরে রাখে- মাটি স্পর্শ করে দোয়েল- যেখানে তার নিঃশ্বাস- মায়ের গায়ের গন্ধ- মায়ের চোখভরা মনভরা স্বপ্ন লেগে আছে- স্বপ্নগুলো ধরতে অন্ধকারে হাত পাতে- মেঘ ভেঙে প্রবল বৃষ্টি নামে- বুকের তামাদি মাটি হু হু করে কেঁদে ওঠে।
 
দোয়েলের মনে পড়ে, ‘মা, তুমি একবার কয়ছিলে, বাপ, বিষ্টি হয়্যা গ্যাছে। মাটি এখন নরম হয়্যা আছে। কুশোরের মাঠ থেকে চালকুমড়োর চারা তুলি আনি ঘরের পাশে লাগা দে। এখন লাগালি তাড়াতাড়ি বড় হয়্যা যাবিনি।’ দোয়েল বৃষ্টিভেজা চালকুমড়োর চারা খুঁজছে বৃষ্টিভেজা কুশোরের মাঠে। ঘন কুশোর। কুশোরের পাতায় জঙ্গলের মতো অবস্থা। সেই পাতা দুই হাতে দুই পাশে সরায়ে সরায়ে চারা খুঁজতেছে দোয়েল ও তার ভাই আলাল। হঠাৎ চোখের সামনে বিশাল একটা গোখরা সাপ। ফণা ধরে ফস ফস করতে লাগল। ভয় না পেয়ে সে কি আনন্দ তখন দোয়েল ও তার ভাইয়ের। মাথায় এক বুদ্ধি এল দোয়েলের। সাপটা ধরে বাড়ি নিয়ে যাবে। আলাল বলল, দোয়েল তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি য্যায়া একটা কলস আর গামছা নিয়ে আয়।’ দোয়েল দৌড়াতে লাগে। গোখরা সাপের সঙ্গে খেলা করছে আলাল। সাপের সামনে একটু একটু করে কাঁচামাটি গোল্লা করে ছুড়ে দেয়। রাগে গোখরা ছুড়ে দেওয়া মাটির ওপর ছোবল মারতে থাকে। যতবার মাটি ছুড়ে দেয়, ততবার গোখরা ছোবল মারে আর ফণা তুলে ফসফস করতে থাকে। আলাল তখনো বোঝেনি কী ভয়ংকর এক খেলা খেলছে সে!
 
দোয়েল দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি আসে কলসি আর গামছা নিতে। তার অতি ব্যস্ততার সঙ্গে কলসি নেওয়া দেখে মা বলল, কলসি কী করবি? কলসি নিয়ে কই যাচ্ছিস? আবার গামছাও নিচ্ছিস! কলসি গামছা এসব নিয়ে কী করবি? 
মা, সাপ ধরব। 
সাপ ধরার কথা শুনে মায়ের মন আর মুখের কী যে অবস্থা! মনে হলো সব কালো মেঘ মার মুখে নেমে এসেছে। দোয়েলের ওসব আর দেখা হয়নি। এক ভোঁ দৌড় দিয়েই ছুটতে থাকে। মার মনে তখন ভয়াবহ দুশ্চিন্তা! সাপের কামড়ে মরার জন্যি কী এসব করতেছে! আমিই-বা কী জন্যি কলাম চালকুমড়ার চারা আনি লাগাতি! মায়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে। মনের ভেতর ছটফট করতে থাকে।
 
দোয়েল এসে দেখে আলাল তখনো বিষাক্ত গোখরার সঙ্গে খেলছে। সাপের মুখের সামনে একটু পর পর একটু করে মাটি ছুড়ে দিচ্ছে, গোখরা সাপটা রাগে-ক্ষোভে ছুড়ে দেওয়া মাটিতে দংশন করছে আর ফণা তুলছে। বিষধর গোখরার সামনে কলসির খোলা মুখ রেখে, কলসির মুখে মাটির ছোট ছোট টুকরো ছুড়ে দিতে থাকে, সাপটি কলসির মুখে ছোবল মারতে মারতে কলসির ভেতরে ঢুকে পড়তেই, কলসির মুখ বিদ্যুৎ গতিতে গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে দোয়েল ও আলাল। তার পর যেন বিজয়ের আনন্দে সাপভর্তি কলসি নিয়ে বাড়িতে আসে। দোয়েল আনন্দ চিত্তে বলে, ‘মা গোখরা সাপ ধরি কলসিতে ভরি নিয়াইছি। ভয় পাসনি আবার! গামছা দিয়ে কলসির মুখ সেইরকম শক্ত করে আঁটি বাঁধি নিছি। কলসির ভেতর থেকে বার হতি পারবিনানে।’ কলসিতে সাপ! মা শুনেই তার দুচোখে আর পুরো মুখে সে কী ভয় আর বিস্ময়! যেন পুরো দুনিয়া কাঁপছে! তার মাথায় চক্কর দিচ্ছে।
 
সেই চোখ সেই মুখ দোয়েল এখনো খোঁজে। বাড়ির কোথাও সেই চোখ সেই মুখ এখন আর দেখে না। নদীর নীরব স্রোতের মতো বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে থাকে দোয়েল- মাকে কিছুতেই পায় না, কোথাও পায় না। দোয়েল কত যে নিঃসঙ্গ- তার বুকে কষ্টের কী যে শ্মশান জ্বলে- ভেতরে সমুদ্র কান্না আছড়ে পড়ে- সেই ছোট্ট দোয়েল নিজের ভেতর অবুঝের মতো মা মা করে কেঁদে বেড়ায়- কোনো সান্ত্বনা থাকে না। পাথরমূর্তির মতো শুধুই চেয়ে থাকে- যেন পাথরের চোখ! 
ঝিঙে গাছ, পুঁইশাকের গাছ আর চালকুমড়োর গাছগুলো এখনো কী সতেজ ও সবুজ। দোয়েল নিজের হাতের লাগানো গাছগুলো দেখে মায়ের চোখ যে কী খুশি হতো- সেই আনন্দ উপচে পড়া চোখ লেগে আছে দোয়েলের চোখে- মা বলত, ‘তুই গাছ লাগালি গাছভরা ফল হয়। দেখিস একদিন তোর ঘরভরা বাচ্চা হবি।’ তখন এ কথার মানে বোঝেনি দোয়েল। না বুঝেই হেসেছিল। সেই ঘরগুলোর চাল আর জাংলাভরা সবুজ সবজি এখনো চোখে লেগে আছে- সেই গাছগুলো কী দারুণ সতেজ এখনো দোয়েলের চোখে- দোয়েল নিজের ঘরে এক নিশ্চুপ পাখি! বিষণ্ন-বিবর্ণ পাখি। দোয়েল ভাবে, ‘মা যখন রান্না করত, তখন রান্না ঘরে চড়ুইয়ের উৎসব থাকত। কোত্থেকে যে এতসব চড়ুই মায়ের পাশে উড়ে আসত! সেসব চড়ুই কোথায় হারাল! মায়ের সঙ্গে কি তারাও চলে গেছে! একজীবন দুঃখকে আসন বানিয়ে তার ওপর বসে থাকে দোয়েল, দুঃখগুলো কি নদীর মতো দীর্ঘ! সমুদ্রের গভীর ঢেউয়ের মতো বয়ে চলে। দোয়েল তখন দুঃখের সমুদ্র! দোয়েলের গান শুনে সবাই খুশি হয়, মুগ্ধতায় ডোবে। পুরোনো শ্যাওলাজমা নদীতে কেউ ডুব দেয় না।
 
দোয়েল ভাবে, মা, কেন অমন আর্তনাদ করে- বুক চাপড়িয়ে পাগলের মতো কাঁদিছিলি? তুমি তো আর কোনোদিন অমন করে কাঁদনি। আমি আজও তোমার সেই কান্না বুকের ভেতর ঝড়ের মতো নিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার ভেতর পোড়ামাটির কষ্টের রং চিরকালের মতো সেই কান্না গাঁথি রয়েছে। তুমি সেদিন কেন অমন পাগলির মতো কাঁদিছিলে! জানিনে, কিচ্ছু জানি নে মা। শুধু এটুকু জানি, তামার সেই কান্না ক্রমশ গভীর হয়ে বিদ্ধ হয়ে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে- অসহায় এক আর্তনাদ আমাকে আঁছড়ে ফেলে, ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। আজও আমার ভেতর পদ্মার বুকভাঙা ঢেউয়ের মতো এক প্রশ্ন, মা তুমি সেদিন অমন করে কেন কাঁদিছিলে? কোন বেদনা তোমাকে বিদ্ধ করেছিল? কোন কষ্ট বিষাক্ত তীরের মতো তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল?
সেই কান্নাভরা মুখ সমুদ্র সমুদ্র কষ্ট হয়ে দোয়েলের বুকে আছড়ে পড়ে। এই প্রশ্নের উত্তর জানা হবে না কোনোদিন দোয়েলের। কিন্তু এই প্রশ্ন যে ক্রমশ তার ভেতর আকাশসমান কষ্টের হয়ে ওঠে- যন্ত্রণার আগুন হয়ে জ্বলে।
কেউ দেখে না সে আগুন, সে আগুনের কোনো রং নেই, কোনো রং থাকে না।

ফুটবলের উৎপত্তি প্রসঙ্গে

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
ফুটবলের উৎপত্তি প্রসঙ্গে

কংক্রিটে গেঁথে থাকা একটি ছোট্ট নুড়ি পাথর:

কেঁচোদের উদীপ্ত উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি যেন, একটুও নড়ছে না

ইতিহাসের ছোট্ট মাইলফলক, ছোট্ট বিজয়তোরণ

এখানে কখনও কিছুই ঘটেনি: কিছুই নড়ছে না

বাতগ্রস্ত একটা ছোট খুঁটি

তার গা থেকে কে যেন সেই নোটিশটা চুরি করে নিয়ে গেছে

যাতে লেখা ছিল নোটিশ চুরি করা নিষেধ:

একটুও নড়ছে না

বিদ্যুতায়িত বিজলির তার

পায়ের ক্ষতের স্বপ্নগুলোকে তারা পাহারা দিচ্ছে:

একটুও নড়ছে না

আর তাই, কোনো একদিন কেউ যখন মুখোমুখি হলো

গড়িয়ে চলা একটা কিছু বুঝি কাছাকাছি চলে আসে,

তারা তাতে লাথি মারে

ধ্ববি-প্রতিধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে,

ছিঁড়ে যায় মন্দিরের পর্দা

হাজার হাজার মানুষের বিস্মিত বিমুগ্ধ মুখ

হাঁ-হয়ে যায় শ্বাসরুদ্ধকর নীরব বিস্ফোরণে

কোটি বর্ষ আগের ট্রাইলোবাইট তখনই বুঝি

চিৎকার করে ওঠে: গোল!

গল্প আলাস্কার পাগল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
আলাস্কার পাগল
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

ভোরবেলা প্রথমে ডোরবেল, পরে ঘন ঘন কড়া নাড়া শুনে সন্দেহবশে দরজার একটা পাল্লা খুলে আমি অবাক, ভাল্লুকের চামড়ার লং কোট, মাথায় বোধহয় শেয়ালের চামড়ার কানঢাকা টুপি, হাঁটুঅব্দি বুট, সব ভেদ করে মুখটা হঠাৎ চিনতে পারি, আমার দাদা

এবার বাড়ি এল বারো বছর পর চলে যাওয়ার প্রথম বছর শীতকালে তিন মাসের ছুটিতে এসেছিল, তার পর এই দাদা আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটিতে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের ওপর পিএইচডি করে সেখানেই পড়ায়

দাদাকে এভাবে দেখে তখনো আমার ঘোর ভাঙেনি, প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে আমার পড়ার টেবিলে রিভলবারের মতো কী একটা রেখে বলল, সাবধানে রাখিস ফুললি লোডেড দরকার হলেই নেব

এটা কী? রিভলবার?’

আহামাগিক

আহামাগিক মানে?’

এস্কিমোদের ভাষায়নিশ্চয় তুইআহাইলা বলতে পারিস

এই শাদা রঙের রিভলবার তো দেখিনি কোথাও

হলো তিমির মাথার হাড়ের তৈরি ইনুয়িৎদের বানানো অ্যাঙ্কোরেজের সাপ্তাহিক হাটে পেয়েছি

গুলি কী করে ভরে, গুলি সিসার, না তাও তিমির হাড়ের, মনে মনে ভাবছি, তার মধ্যেই দেখি দাদা বারকতক নাক টেনে কিছু শুঁকে কপাল কুঁচকে বলল, ‘ সেই অমানুষের গন্ধ মানুষদের ভেতরটা পচে গেলে এমন দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়

দাদার কথার সঙ্গে তার চোখের তারার চাঞ্চল্য আমার চোখে পড়ল

-শহরে অনেক মানুষ পচে আছে অমানুষদের উৎকট গন্ধ পাচ্ছিবলতে বলতে টেবিল থেকে ছোঁ মেরে রিভলবার তুলে নিয়ে দাদা দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘণ্টাতিনেক পর যখন ফিরে এল, ঘর দুর্গন্ধে ভরে গেছে দাদার প্যান্টে পায়ের দিকে চোরকাঁটা লেগে আছে পকেট থেকে একমুঠো গান্ধিপোকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, শ্মশানে বা কবরে নিয়ে যা, সৎকার করতে হবে শয়তানগুলো যেন আর পৃথিবীতে না ফেরে

গান্ধিপোকার বিশ্রী গন্ধকে ভাবছে অমানুষের দুর্গন্ধ দাদার মাথা ঠিক আছে!

তুমি পাগল হয়ে গেছ, একথা কি নিজের দাদাকে বলা যায়! শুধু বললাম, তোমার ভাল্লুকের চামড়ার কোটে গরম লাগছে না?

ঠাণ্ডা-গরম তুই কাকে বলিস? আমাকে যখন আলাস্কায় শীতকালে ট্রেনে ফেয়ারব্যাঙ্কস যেতে হয়, তখন রেললাইনে দশ-বারো ফুট উঁচু বরফ কেটে ট্রেন চলে তাও সপ্তাহে দুই দিনের বেশি রেল চালানো যায় না

স্মৃতির মধ্যে ডুবে গিয়ে আবার বলল, তুই যদি টালকিটনা থেকে ডেনালি হয়ে ফেয়ারব্যাঙ্কস যেতে রেলপথের দুধারে দেখিস ফায়ারউইডের সবুজ গাছে গোলাপি-বেগুনি ফুল ধরে আছে, বুঝবি আলাস্কায় ভয়াবহ শীত এল বলে

আলাস্কার কথায় দাদার উৎসাহ দেখলে কে বলবে, হঠাৎ হঠাৎ তার অদ্ভুত পাগলামি জেগে ওঠে

আলাস্কায় আসন্ন শীতের কথায় দাদাকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখার চেষ্টায় বললাম, ফায়ারউইড কী ধরনের ফুল, দাদা? আমাদের বাংলায় এইরকম কোনো ফুল আছে?

ফায়ারউইড মানে কী বল তো? আমি একটা বাংলা করেছিআগুনে আগাছা উজ্জ্বল গোলাপি-বেগুনি রঙের ফুলের ঝাড়, চলন্ত ট্রেন থেকে দেখায় যেন গোলাপির দীর্ঘ একটা পোচ আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ার পরও খুব দ্রুত আবার ফুটে ওঠে বলেই ফুলের নাম ফায়ারউইড আলাস্কার বাসিন্দাদের বিশ্বাস, ফায়ারউইড গাছের ডগাঅব্দি ফুলে ভরে গেলে তার -সপ্তাহ বাদেই ভয়াবহ শীতের আগমন এমনিতেই ওখানকার গ্রীষ্মকালও তোদের শীতকাল তখন টেম্পারেচার কত জানিস ১৩ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস

দাদা যখন আলাস্কার কথা বলে, তখন সে একেবারেই সুস্থ তখন আর গান্ধিপোকার গন্ধকে অমানুষের দুর্গন্ধ বলে না

দরজায় পর পর অনেকবার বেল শুনে আমি দরজা খুলে দিই সবাই পাড়ার লোক এরা সবাই রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী অধিকাংশই উচ্চপদস্থ দাদা এসেছে খবর পেয়ে দেখতে এসেছে

কই হে, জগদীশের বড় ছেলে কই? দীপকে দেখতে এলামযিনি বললেন, তিনি আমার বাবার অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন কর্মজীবনে বাবার বস

দাদা একবার মাত্র গন্ধ শুঁকে বলে উঠল, ‘ঘুষের চোঁয়া ঢেঁকুর এর আর জীবনের অধিকার নেইবলেই রিভলবার তাক করল ভদ্রলোক সবাইকে ধাক্কা মেরে খোলা দরজা দিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়লেন তার পেছন পেছন আরও কয়েকজন ছিটকে গেলেন

দাদার দর্শনার্থীদের মধ্যে দুই মহিলাও ছিলেন দুজনের চুলেই অল্প পাক ধরেছে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আরেকজন তার সহোদর, গণিতের অধ্যাপক দুজনই অবিবাহিত দুই বোন বহুদিন ধরে খালি জমি দেখলেই সেখানে গাছের চারা লাগান, নিজেদের পৈতৃক বাড়ির সামনে পেছনের অনেকখানি জমিতে সুন্দর বন সৃষ্টি করেছেন

দুজনকেই অনেকটা এরকম দেখতে লক্ষ্য করে তাদের দিকে তাকিয়ে দাদা বলে উঠল,

আপনারা দুই কুমারী

এই পৃথিবীর পূজারি

আলাস্কায় কোথায় থাকেন আপনি?’

দাদাকে চুপ করে থাকতে দেখে ভাইস চ্যান্সেলরের প্রশ্নের উত্তর আমিই দিলামঅ্যাঙ্কোরেজে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটিতে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের জীবন সংস্কৃতি পড়ান

আলাস্কায় প্রচুর গাছ শুনেছিগণিতের অধ্যাপকের কথায় দাদার উত্তরঅরণ্যের আনন্দ, জঙ্গলের দাপট দেখতে আলাস্কায় সবার অবশ্যই যাওয়া চাই আপনাদের তো যেতেই হবে আপনারা পৃথিবীর পূজারি

খুব সুন্দর বলেছেন, আমরা দুই কুমারী এই পৃথিবীর পূজারি

অনেক দিন পর দাদা ছন্দ মিলিয়ে কথা বলল আগে মাঝেমাঝেই বলতে শুনতাম আমি তখন খুবই ছোট

একদিন দাদাকে কোথাও না দেখে আমি ছাদে উঠে দেখি দাদা চোখ সরু করে কালো মেঘের কুণ্ডলীর দিকে তাকিয়ে আছে হাতে রিভলবার

দাদা ফিসফিস করে বলল, কালো বস্তায় ভরে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের চাঁদ দেখাবে বলে নিয়ে যাচ্ছে রাত বাড়লে কুচিকুচি করে কেটে খাবে আকাশ ভরা উৎকট গন্ধ পাচ্ছিস না? অমানুষদের গায়ের দুর্গন্ধ! আমার রেঞ্জের মধ্যে এলেই গুলি করব

এই রিভলবার থেকে গুলি কী করে বেরোয়, দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, নিচে ঘন ঘন ডোরবেল শুনে নেমে এসে দরজা খুললাম একদল পুলিশ তারা ঘরে ঢুকেই বলল, শাদা রিভলবার হাতে একজনকে এই বাড়িতেই ঢুকতে দেখেছি সে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে? কোথায় লুকিয়ে রেখেছ লোকটাকে?

ভদ্রভাবে কথা বলুন সে আমার দাদা আলাস্কা অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বারো বছর পর কলকাতায় এসেছে

রাস্তায় রিভলবার নিয়ে কয়েকজনকে তাড়া করতে দেখেই আমরা খুঁজতে খুঁজতে বাড়িতে এসেছি ডাকুন তাকে

দাদা নিজেই গোলমাল শুনে নেমে এল হাতে রিভলবার

পুলিশ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলবারটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই দাদা একবার নাক টেনে গন্ধ শুঁকে বলে উঠল, এঃ অমানুষের গন্ধ

একজন দীর্ঘদেহী পুলিশ অফিসার দাদার হাত থেকে রিভলবারটা কেড়ে নিয়ে বলল, যাদের তাড়া করেছিলেন, তাদের দুজন আই উইটনেস হিসেবে আমাদের সঙ্গেই আছে ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট থানায় চলো!

আই উইটনেস দুজনকে দেখেই দাদা চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল, ‘এদের চেনেন? সন্ধ্যে হলেই এরা জোনাকি খেয়ে বেড়ায় শহরে এখনো যে-কটা গাছে জোনাকির আলো জ্বলে, তার সবই প্রায় শেষ করে এনেছে এদের দলে অনেকে ছিল বেশ কয়েকজন আমার রিভলবারের গুলিতে রাস্তায় লুটোচ্ছে দেখেননি আপনারা?’

পুলিশ দাদাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল

আবার বেল শুনে দরজা খুলে দেখি, দুই পৃথিবী পূজারিতোমার দাদাকে দেখছি না তো! বলো আমরা এসেছি

আমার মুখে সব ঘটনা শুনে ওরা দুজনেই থানায় গেলেন আমিও সঙ্গে গেলাম

থানায় ভিসি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে উনি কাউকে খুন করতেই পারেন না আলাস্কা থেকে এসে শহরে পা দিয়ে অমানুষদের দুর্গন্ধ পাচ্ছেন রিভলবারটা পরীক্ষা করুন তাহলেই বুঝবেন, কোনো মারণাস্ত্র না ওর ভাইকে বলেছেন এটা নাকি তিমির খুলির অংশ দিয়ে ইনুয়িৎ এস্কিমোদের তৈরি

রিভলবারটা সবদিক থেকে নেড়ে চেড়ে দেখে দারোগা হো হো করে হেসে উঠলেন তার পর একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরকে দেখে সিগারেট ঠোঁট থেকে নামিয়ে রেখে বললেন, প্রফেসর সোমকে ছেড়ে দিচ্ছি কিন্তু অ্যারেস্ট যখন করেছি তখন একটা রিপোর্ট লিখতে হবে আপনার নাম?

প্রশ্নটা আমাকে

আমার আসল নাম রিপন দাদা আমাকে স্কুলে ভর্তি করার সময় করে দিয়েছেন কৃপণ

দীপন সোমের ভাই কৃপণ সোম? কৃপণ কেন?’

ছোটবেলায় গ্রীষ্মকালে দেখেছি, বরফগুঁড়োর ওপর লাল-নীল সিরাপ ছিটিয়ে ভাঁড়ে করে বিক্রি করত সেই সব ফেলে দেওয়া মাটির খুড়ি কুড়িয়ে জমা করতাম, কেউ চাইলে একটাও দিতাম না তা দেখে দাদা ওই কৃপণ নাম দিয়েছে

থানা থেকে দুই বোনের গাড়িতে বাড়ি ফিরে ভিসি দাদাকে বললেন, সামনের শনিবার ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনারের আয়োজন করছি আপনি চিফ গেস্ট আলাস্কার প্রকৃতি, বিশেষ করে বিশাল জঙ্গল, হ্রদ, পাহাড়, হিমবাহ নিয়ে আপনার কথা শুনতে শহরের সব বিশিষ্টরা সেদিন ভিড় জমাবেন যাকেই ফোনে বলছি, তিনিই কনফার্ম করছেন, আসছেন ইউনিভার্সিটি থেকে সবার কাছে ইনভিটেশন কার্ডও পাঠানো হবে কার্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে ছাপাবার জন্য আপনার নামটা জানতেই আপনাদের বাড়ি এসেছিলাম আজ এখন তো জেনেই গেলাম

দাদা চুপ করে আছে

গণিতের অধ্যাপিকা বললেন, আপনার পরিচয় তো বিরাট প্রফেসর, আলাস্কা অ্যাঙ্কোরেজ ইউনিভার্সিটি, ইনুয়িৎ এস্কিমো লিখেছি, কিন্তু তো যথেষ্ট নয় আরও লেখা দরকার আপনার কর্মপরিধি নিয়ে একটু বলুন না

লিখতে পারেন, শহরের অমানুষ হত্যার দায়ে পুলিশ আমাকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল আরেকটা কথাও লিখতে পারেন, প্রতি শুক্রবার অ্যাঙ্কোরেজের সাপ্তাহিক হাটে ঘুরে ঘুরে এস্কিমোদের হস্তশিল্প দেখা আমার বহুদিনের অভ্যাস বিশেষ করে তাদের প্রাচীনকালের অদ্ভুত উদ্ভাবনা যদি কিছু দেখা যায়

ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারের দিন, শনিবার দাদার ওয়ার্ডরোবের লক ভেঙে শাদার ওপর শাদা কাজ করা পাঞ্জাবি জোর করে আমিই পরিয়ে দিলাম একজন অতীব সুন্দরী দাদার হাতে বিরাট একটা ফুলের স্তবক তুলে দিল আরেকজন তরুণী দাদাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়ার পর সভাঘরের হাততালি আর থামতে চায় না তার মধ্যেই দাদা মাইকের কাছে মুখ নিয়ে বলল, এত ফুল তাদের মায়ের কোল খালি করে নিয়ে এলেন!

দাদার সুদৃশ্য আবরণমোড়া চেয়ারের দুপাশে দুজন বিশিষ্ট অতিথি বসেছিলেন তাদের একজন, তার সুসজ্জিত আসনে বসেই হ্যান্ড স্পিকার মুখে লাগিয়ে বলে উঠলেন, ফুল গাছেই পচে, গাছ থেকে ঝরে যায়

দাদা গলায় উত্তেজনা নিয়ে বলল, ওদের গাছেই পচতে দিন গাছতলায় ঝরে পড়তে দিন মানুষ যেমন তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্যের শেষে মরে যায়, ফুলেরও তেমন স্বাভাবিক জীবনাবসান হতে দিন আলাস্কার কোনো এস্কিমোই ফুল ছিঁড়ে নেওয়া ভাবতেই পারে না মাইলের পর মাইল ফায়ারউইড ফুটে থাকে, কেউ তার একটাও কি কখনো ছিঁড়ে নেয়? আলাস্কায় প্রকৃতির কোলে জীবনযাপন করে কেউ সেই প্রকৃতিকেই আহত করে? না, না, না, করে না

দাদাকে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক কিছু শুঁকতে দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম দাদা চোখ ঘুরিয়ে বলতে লাগল, এখানে লোকে কারণে অকারণে মানুষ খুন করে কেন? যাদের হৃদয়ে কোনো দয়ামায়া, করুণা নেই, অন্যের প্রতি ভালোবাসার অভাব, তারা সবকিছুকেই আঘাত করে এখানেই তেমন কয়েকজন অমানুষের দুর্গন্ধ পাচ্ছি এখানে আসবার আগে আমার ভাই আমার রিভলবার সরিয়ে ফেলেছে না হলে এখনই কয়েকজনকে গুলি করতাম

সভাঘরের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল শহরের পুলিশ কমিশনার, একদা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী ছাত্র, তিনি প্রথম সারির শ্রোতাদের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনার এই খুনের হুমকির জন্য আপনাকে এখনই গ্রেপ্তার করা যায় নেহাৎ এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আমি এখানকার ছাত্র, তাই ভিসির জোড় হাত দেখে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হলো

দাদা কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে দাঁড়িয়ে থাকল তার পর বলল, খুন করিনি, অমানুষদের শুধু খুনের হুমকি দিয়েছি, সেটাই একটা বড় অপরাধ! আপনারা যারা নিজেদের স্বার্থে অহরহ মানুষ খুন করছেন, জীবন্ত গাছ থেকে, স্নেহশীলা লতা থেকে শত শত ফুল ছিঁড়ে আনছেন, তারা সম্পূর্ণ নিরপরাধ!

পুলিশ কমিশনার তখনো দাঁড়িয়ে আছেন, দাদার কথাগুলো শুনে গলার স্বর না নামিয়েই বললেন, ফুল গাছেই শুকোয়, গাছতলায় ঝরে পড়ে সেই ফুল আগেই তুলে নিলে কার কী ক্ষতি হয়? বুঝিয়ে বলুন

দাদা দৃঢ় গলায় বলল, গাছেই পচে গাছতলাতেই ফুলকে ঝরতে দিলে সেটাই তার জীবনের সুন্দর শেষ তাকে হত্যা করে অকালমৃত্যু ঘটানো তো পাপ অমানুষ ছাড়া কেউ কি হত্যাকারী হয়?

একদিকে সাংবাদিকরা দাদার বক্তৃতা নোট করছে, অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা তাদের মুভি ক্যামেরায় ভিডিও করতে ব্যস্ত কেউ কেউ মোবাইল স্টিক উঁচু করে ধরে তাতে দাদার বক্তৃতা রেকর্ড করতে উদগ্রীব

ভিসি দাদার খুব কাছে গিয়ে মুখের সামনে হাতের তালুর আড়াল নিয়ে কানে কানে বললেন, আপনি আলাস্কায় কী কী দেখেছেন, সেখানকার ভূ-প্রকৃতি কেমন তা নিয়ে বলুন

দাদা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আলাস্কা ট্যুরিস্টদের দেখার মতো দেশ নয় শুধু যদি একদিন সিউয়ার্ড থেকে আলাস্কা রেলে অ্যাঙ্কোরেজ আসেন, তাতেও আলাস্কার অচেনা ভূ-প্রকৃতি, নদী, পাহাড়, অরণ্য কিছুটা দেখতে পাবেন যদি কখনো যান, খাতায় লিখে রাখতে পারেন, সিউয়ার্ড থেকে অ্যাঙ্কোরেজ ১২৭ মাইল প্রথমে সিউয়ার্ড থেকে কেনাই ফিওর্ড ন্যাশনাল পার্কের এক্সিট গ্লেসিয়ার দেখে পরদিন ট্রেনে চড়তে পারবেন গার্ডউড থেকে ছোট শাখা-লাইন ১৩ মাইলের মতো নেমে, চলে গেছে হুইটিয়ার- ভাবুন এখানেই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড গ্লেসিয়ার রাজ্যের প্রবেশদ্বারে এভাবে এই ট্রেনে গার্ডউড বা হুইটিয়ারের প্রচলিত পথ না পেলে আলাস্কা রেলরোডের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করে একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন অথবা সড়কপথে যেতে পারবেন আমি তো সেভাবেই ঘুরেছি

একটু থেমে আবার বলতে লাগল, ফেয়ারব্যাঙ্কস থেকে সিউয়ার্ড প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ এই রেলযাত্রাই হতে পারে এক অবিস্মরণীয় ভ্রমণ একবার টালাকিটনা থেকে ডেনালি ন্যাশনাল পার্ক ডেনালি পার্ক থেকে ফেয়ারব্যাঙ্কসসাত দিনে দু-দফার এই রেলযাত্রার শেষে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেলিন জনসন তারপোর্ট্রেট অব দ্য আলাস্কা রেলরোডবইয়ে কেন বলেছেন, আলাস্কায় বাস করে আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে ছেলেবেলায় যা কিছু স্বপ্ন দেখেছি তার সবই ছাড়িয়ে গেছে এই ট্রেনযাত্রা

সবাই মুগ্ধ হয়ে দাদার কথা শুনছে দুজন শুধু পরস্পরের কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু বলাবলি করছে

হঠাৎ একটা বিরাটাকার স্লিফার ডগ হলে ঢুকে শ্রোতাদের পা শুঁকতে লাগল একজন পুলিশ তার চেইন ধরে তার পেছন পেছন চলেছে সঙ্গে আরও কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ কুকুর যখন একজনের পা শুঁকে দাঁড়িয়ে পড়ে বারবার তার গন্ধ শুঁকতে লাগল, তখনই তাকে দুজন পুলিশ জাপটে ধরে হলের বাইরে নিয়ে গেল

কুকুরের গন্ধ শোঁকা দেখে দাদা হাওয়ায় গন্ধ শুঁকে বলল, এখানে অর্ধেক মানুষই অমানুষের গন্ধবহ

দাদার কথার প্রতিবাদের মধ্যেই অনেক পুলিশ অফিসার একজন বিশিষ্ট অতিথিকে নিয়ে ঢুকলেন কাগজে প্রায়ই এর ছবি বেরোয় টিভির খবরেও দেখা যায়

কালো চশমা চোখে তার প্রায় গা ঘেঁষে আছে দুজন ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো হলে ঢুকেই তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট ভিসির উদ্দেশে বললেন, অ্যাপলজি টু ইউ ম্যাডাম ভিসি, অ্যান্ড আদার প্রফেসরস ক্যাবিনেট মিটিংয়ে আটকে গিয়ে এখানে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল আনকন্ডিশনাল অ্যাপলজি টু প্রফেসর . দীপন সোম ফর মাই আনঅ্যাভয়ডেবল ডিলে

দাদাকে নাক টানতে দেখে আমি প্রমাদ গুনলাম তার চোখের তারা দুদিকে অস্বাভাবিক ঘুরছে দাদা হঠাৎ মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে এসে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘অমানুষ! সাংঘাতিক অমানুষ! দেশের সব বনজঙ্গল, নদনদী, সমুদ্র, পাহাড়, হিমবাহ বণিকের হাতে তুলে দিয়েছেন

দাদার কথার মধ্যেই ভিসি মঞ্চ থেকে দ্রুত নেমে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করে মন্ত্রী মশাইয়ের একহাত ধরে মঞ্চে ওঠার ছোট সিঁড়ির দিকে পা বাড়ানো মাত্রই দাদা চিৎকার করে বলল, ছোঁবেন না, ছোঁবেন না, ওকে ছোঁবেন না যে হাতে আপনার পৈতৃক ভিটেয়, শহরের রাস্তার ধারে নিত্য গাছ লাগান, সেই প্রকৃতি পূজারির পবিত্র হাত অমানুষের গায়ে লাগাবেন না

পুলিশের দল লাফিয়ে মঞ্চে উঠে দাদার দিকে হাতের রিভলবার তাক করল ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো দুজন মন্ত্রীকে ঘিরে চারদিকে নজর তীক্ষ্ম করে রাখল

পুলিশবাহিনী যখন দাদাকে টেনেহিঁচড়ে মঞ্চ থেকে নামাচ্ছে, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখছি, অতি বিশিষ্ট সেই অতিথি বলে উঠলেন, দাঁড়াও প্রফেসরের মুখে আলাস্কার কথা অনেকটাই মিস করেছি, বাকিটা শুনতে চাই

দাদা আলাস্কার বনজঙ্গল ঘুরে, সে রাজ্যে মাসের পর মাস এস্কিমোদের সঙ্গে থাকার অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতার কথা অনেকক্ষণ ধরে বলে গেল একটানা দাদাকে বলতে শুনলাম, সুমেরু বৃত্ত পার হয়ে এস্কিমোদের গ্রাম কোল্ডফুট, তার পর ওয়াইজম্যান, আরও উত্তরে আলাস্কার সর্বোত্তর বিন্দু, বোফোর্ট সমুদ্রকূলে ইনুপিয়াৎ এস্কিমোদের আদিবাস ব্যারো গ্রাম, সেখানে তাদের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা আমার মনে আজও গেঁথে আছে

কথার শেষে হঠাৎ হাওয়ায় গন্ধ শুঁকে, বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদা বলে উঠল, অমানুষের দুর্গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে

সামনের স্পিকারে দাদার কথা হলের মাথা থেকে মাথা পর্যন্ত গমগম করতে লাগল দীর্ঘশ্বাসও শোনা গেল

মঞ্চের কয়েকজন তাকে একরকম জোর করে না থামালে দাদার কথা হয়তো আর শেষ হতো না

ভিসি যাকে ফুলের স্তবক উত্তরীয় দিয়ে বরণ করে বিশেষ অতিথির আসনে বসিয়েছিলেন তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ভিসির কানে কানে বললেন, তো মেন্টাল কেস যেসব রাস্তার কথা, রেলপথের কথা বলল, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সবই পাগলের প্রলাপ ওকে নিউরোলজিস্ট দেখান বা কোনো পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান আলাস্কা থেকে একটা পাগলকে ধরে এনেছেন আপনারা?

স্ল্যাকে১ ফুটবল খেলা চলছে

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
স্ল্যাকে১ ফুটবল খেলা চলছে

গভীর উপত্যকার মাঝে, ন্যাড়া পাহাড়ের চূড়ায়

বর্ণিল পতাকার মতো রঙিন পোশাক পরা মানুষগুলো

লাফাচ্ছে আর সেই সঙ্গে তাদের হাওয়ায় উড়তে থাকা

বলটাও লাফিয়ে চলেছে

 

এই তো শূন্যে বলটা আবার লাফিয়ে উঠল,

উৎফুল্ল রঙিন মানুষেরা বলটাকে হেড করার জন্য

ফোয়ারার মতো উছলে উঠল

বলটা বাতাসের টানে উড়ে গেল দূরে

রবারের মতো এপাশ-ওপাশ করা মানুষেরা

বলের পেছনে লাফাতে লাফাতে ছুটছে

একেবারে গাছের মগডালের অতল গহ্বর পর্যন্ত

বলটা লাফিয়ে উঠে শূন্যে বাতাসে ঝুলে রইল

দর্শকেরা সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,

বলটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে আবার ফিরে এলো 

 

ফুটবলারদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে

স্বর্গের জ্বলন্ত গহ্বর থেকে বাতাস ধেয়ে আসছে

চারপাশের পাহাড়গুলোর তীব্র ঝলমলে আলোয়

অদ্ভুত রঙ মিশিয়ে ছুড়ে দিল অন্ধকার

তারপর ইস্পাত-কঠিন বৃষ্টি নেমে এলো  

 

সবার চুল কপালে সেঁটে গেছে, ভেসে যাচ্ছে ঘামে

কাদার ওপর যেন জমে আছে ঝিলমিল জল 

ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে তাদের চিৎকার

বয়ে যাচ্ছে খুব সূক্ষ্ম ক্ষীণ আনন্দের স্রোতধারা

আটলান্টিকের গভীর নিম্নচাপের মতো উন্মত্ততায়

কুঁজো হওয়া পৃথিবীটা ডুবতে ডুবতে যাচ্ছে তলিয়ে

উপত্যকাটা অচিন্তনীয় নীল রঙে যখন সেজেছে

উইঙ্গাররা লাফিয়ে উঠল, যেন শূন্যে সাইকেল চালাচ্ছে

আর গোলরক্ষক বাতাসে আড়াআড়ি ভাসালো শরীর

আরও একবার দেখা গেল সেই সোনালি অগ্নিযজ্ঞ

তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেঘের প্রান্তটা তুলে ধরল

 

টীকা-: ইংল্যান্ডের ছোট্ট শহর

টেড হিউজ ও মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
টেড হিউজ ও মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা
ছবি: সংগৃহীত

তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের স্থান শীর্ষে বিশ্বের খ্যাতিমান লেখকরা ফুটবল নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন এদেরই দুজনটেড হিউজ (১৯৩০-১৯৯৮) মিরোস্লাভ হোলুব (১৯২৩-১৯৯৮) হিউজ ছিলেন ইংল্যান্ডের পোয়েট লরিয়েট এখানে অনূদিত কবিতাটিতে তার দেখা শহর স্ল্যাকে কীরকম ফুটবল খেলা হতো তার বিবরণ পাওয়া যাবে হিউজের জীবনীকার এলেইন ফেইনস্টাইন বলেছেন, হিউজের বাবা উইলিয়াম ফুটবল খেলতেন এবং ফুটবল ম্যাচ দেখতেন

দ্বিতীয় কবিতাটির রচয়িতা প্রখ্যাত চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুব (১৯২৩-১৯৯৮) এখানে অনূদিত কবিতাটিতে হোলুব ইঙ্গিত করেছেন, ফুটবলের প্রতি আবেগ হয়তো আদিমকাল থেকেই চলে আসছে এমনকি ৫০ কোটি বছরের আগের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী ট্রাইলোবাইট পর্যন্ত ফুটবলের অনুরাগী ছিল যিশুর শেষনিশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তে জেরুজালেম মন্দিরের পর্দা ছিড়ে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করেছেন হোলুব

 

কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ
বই

গল্প থেকে ছোটগল্প হয়ে উঠার দীর্ঘ জার্নি রবীন্দ্রনাথে পরিণতি লাভ করেগল্পগুচ্ছবাংলা ছোটগল্পের নির্দেশিকা পুস্তক বলা যেতে পারে

১২৯১ থেকে ১২৯৭ পর্যন্তরবীন্দ্রনাথের ‌‘দেনা পাওনা’ (১২৯৮, হিতবাদী) প্রকাশের আগ পর্যন্ত ছোট আকারে গল্প রচনার ঝোঁক দেখা যায়’ (‘শত বর্ষের বাঙলা ছোটগল্প: একটি রূপ-রেখা’/ উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, সাপ্তাহিক দেশ, কলকাতা)

রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী জনপ্রিয় গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সাধারণভাবে কৌতুক রসসৃষ্টির জন্যই তিনি পাঠকের অনেক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন সাধারণত প্রভাতকুমারের গল্পে দেখি, প্রথম দিকে গল্পটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষের দিকে এমন একটি পরিস্থিতির চমক সৃষ্টি করেন যাতে গল্পের পরিণাম তৃপ্তিদায়ক হয় আলোচ্য গ্রন্থপিঁপড়া কাসেম’-এর লেখক সালাহ উদ্দিন পাঠান এমন করেই গল্প বলেন এবং সাজান উপযুক্ত বয়ানের সমর্থনে তারকিছুই করার ছিল নাএবংরাত-পাহারাথেকে সামান্য উদ্ধৃতি

‘‘দর্শনার্থীদের একজন বলে ওঠেন, ‘লোকটি কী মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে না

পাশের একজন বলে, ‘এত বোঝার দরকার নাই, নিজের চিন্তা করেন, আর এখান থেকে আপনি বুঝতেও পারবেন না নিষ্প্রাণ দেহকে আপনি কীভাবে ধরে নেবেন সেটাই হচ্ছে আসল কথা

পেছনের একজন বলল, ‘ভাইজান আপনে যাই কন না ক্যা, আমার মনে অয় উনি মারাই গেছেন

উপস্থিত আরেকজন ধমকের স্বরে বলে, ‘ মিয়া বেশি বেশি কথা কও ক্যা? তুমি কি গণক নাকি?’

দেহেন মিয়া ভাই, আমার মামু বেটা যহন মারাত্মক এক্সিডেন্ট কইরা এইরহম আইসিইউতে আছিলো তহনো তো ডাক্তারের কোনো গ্যারান্টি দিবার পারে নাই কথা বলেই লোকটি হু হু করে কেঁদে ওঠে লনের শেষ মাথার ওয়ার্ডবয় জোরসে ধমক দিয়ে উঠলে লোকজনের শোরগোলের আওয়াজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়

গল্পের আরম্ভ, যেমন–‘শনি মঙ্গলেরমঙ্গলই হবে বোধহয়যোগাযোগ হলে তেলেনাপোতা আপনারাও একদিন আবিষ্কার করতে পারেন অর্থাৎ কাজেকর্মে মানুষের ভিড়ে হাঁফিয়ে ওঠার পর যদি হঠাৎ দুদিনের জন্য ছুটি পাওয়া যায়আর যদি কেউ এসে ফুসলানি দেয় যে, কোনো এক আশ্চর্য সরোবরেপৃথিবীর সবচেয়ে সরলতম মাছেরা এখনো তাদের জলজীবনের প্রথম বড়শিতে হৃদয়বিদ্ধ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, আর জীবনে কখনো কয়েকটা পুঁটি ছাড়া অন্য কিছু জল থেকে টেনে তোলার সৌভাগ্য যদি আপনার না হয়ে থাকে, তা হলে হঠাৎ একদিন তেলেনাপোতা আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন

তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে একদিন বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে, তার পর রাস্তার ঝাঁকানির সঙ্গে মানুষের গুঁতো খেতে খেতে ভাদ্রের গরমে ঘামে, ধুলো চটচটে শরীর নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক বাদে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে আচমকা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরতারিণী মাঝি’, ‘ডাইনীবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুঁইমাচাবাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তনের ধারায় অগ্রগণ্য বিবেচনা করা যায় অন্যদিকে সমাজ-বিশ্লেষণে এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণির চরিত্র-চিত্রণে পারদর্শী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তারপ্রাগৈতিহাসিক’ ‘ফসিলগল্পে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন

 পিঁপড়া কাসেমগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাসেম, একজন পিঁপড়ার ডিম বিক্রেতা কোর্ট এলাকার ফুটপাতে পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করা তার পেশা এবং রুজিরোজগারের প্রধান উৎস গ্রামে পরিবার-পরিজন রেখে নগরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে তার জীবনচক্র ঠিক রাখে কাসেম কিন্তু বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ, পেশাকেন্দ্রিক যোগাযোগ নেট দিয়ে প্রান্তিক জনের লোকাচার সংস্কৃতিতে আলোক প্রক্ষেপণকাসেম চরিত্রটিতে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে এভাবে কাসেম, ‘পিঁপড়া কাসেম’- পরিচিতি পেয়ে যায় যার অনুষঙ্গ আদিবাসী সুবেশ চিসিম, মাজার সংস্কৃতির জয়নাল এবং বাউল শিল্পী রেশমা আক্তার

পিঁপড়া কাসেমগল্পের সূচনা, মধ্যভাগ সমাপ্তি অংশের স্তরে স্তরে লেখকের কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ গল্পটির প্রধান বৈশিষ্ট্য

পিঁপড়া কাসেমগল্প থেকে কিছু উদ্ধৃতি

‘‘গভীরভাবে আবুল কাসেমকে অবলোকন করতে গিয় খেয়াল করি; ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ওঠা বোঝা যাচ্ছে: এই লোকটি ভীষণ পোড়-খাওয়া মানুষ খাটাখাটুনির আর অভাবে বয়সের তুলনায় বয়স্ক লোক বলে ভ্রম হয় তাকে আমার ধারণ জন্মেছে: আবুল কাসেম বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোটই হবে” (‘পিঁপড়া কাসেম, পৃষ্ঠা-৮২)

যাত্রাহীন বিরতি’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করাদণ্ডবিধির বেস্টনিকে কত প্রাঞ্জল ভাষায় মুক্ত করা যায়এসবের মনঃসমীক্ষণ আশ্রিত তিনটি গল্প

স্মর্তব্য, অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়মামলার ফলরচনা করে বাঙালি পাঠকের মনে স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন

মামলার ফল’-এর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে এখনকার সমাজ, কোর্টকাচারি আইনি লড়াই অনেক ব্যয়বহুল ফলাফল অনিশ্চিতের

গল্পকার সালাহ উদ্দিন পাঠান তার আইন পেশায় নিষ্ঠাবান হয়ে এখান থেকে ঘটনা উপাদান সংগ্রহ করে সৃজনকল্পনায় সন্নিষ্ঠ থেকেছেন

আলোচ্য গল্প তিনটি আর্থ-সামাজিক পারিবারিক-ত্রিভুজ: মাজহার হোসেন, স্ত্রী আফসানা বেগম একমাত্র সন্তান আবীরকে কেন্দ্র করে

চমৎকার এক সকালের বর্ণনা টেনেযাত্রাহীন বিরতিগল্পটির সূচনা-ভাগ যেমন

বৃষ্টিস্নাত সকালে দরোজা খুলতেই দমকা হিমেল হাওয়া চোখে-মুখে এসে ঝাপটা মারে এতে শরীরে একধরনের প্রশান্তি লাগলেও আফসানা বেগমের মনে কোনো আরামের ছোঁয়া লাগে না বলা যায় আর এখন যে সময় তাতে তো মুহূর্তটাকে কোনোভাবেই সকাল বলা যায় না সূর্যের আলোর ছটা কিরণ ছড়ালে সকাল ধরা যায় কীভাবে!’ (‘যাত্রাহীন বিরতি’, পৃষ্ঠা-২১)

সালাহ উদ্দিন পাঠানের তিনটি আইনবিষয়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া গল্পের সঙ্গে শরৎচন্দ্রেরমামলার ফলগল্পের পাঠ পর্যালোচনায় আমরা এখনকার মামলা-মোকদ্দমা জর্জরিত সামাজিক গল্পের ভিন্ন প্রকৃতির পাঠ পাই যা সমাজ পরিবর্তন বিবর্তনেরযোগ-বিয়োগহিসেবে ধরে নিতে পারি

বলা যায়, কার্যবিধি ধারা এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে কিন্তু মানবমনের রহস্য এবং অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ এবং এর স্বরূপ কী, পরিধি আইনি ব্যাখ্যা কী, কেমন? আদিম প্রবৃত্তিটির সাহিত্য পরিধি, রূপায়ণ, এর ভবিষ্যৎ দেখার প্রত্যাশা রাখা হলো

লোকটা আসলে জীবন্মৃত’, ‘একটি মৃত্যুর যন্ত্রণা’, ‘যাত্রাহীন বিরতি’, ‘আবেগী সময়’, ‘কিছুই করার ছিল না’, ‘রাত-পাহারা’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করা’, ‘মৃত্তিকা ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসেছিল’, ‘সহে না যাতনা’, ‘কিছুই না’, ‘পিঁপড়া কাসেম’, ‘লাল সূর্য’, ‘সবুজ ঘাসের গালিচা’, ‘তুমি তো সেইএসব নিয়ে মোট ১৪টি গল্প-সমাবেশে সালাহ উদ্দিন পাঠানেরপিঁপড়া কাসেমগ্রন্থ

পূর্বে বর্ণিত বিষয়বস্তুর গল্প ছাড়াও রোমান্টিক, মনস্তাত্ত্বিক, মুক্তিযুদ্ধ পারিবারিক আবহের আরও কিছু গল্প আলোচ্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে