ঢাকা ১১ বৈশাখ ১৪৩১, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের দিনগুলো

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫১ পিএম
মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের দিনগুলো

ভ্রমণের কথা শুনলে ছেলেরা যতটা উৎসাহ দেখায়, মেয়েরা ততটা দেখায় না। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের ভ্রমণে যেতে ভালো লাগে না। এর কারণ হলো, তারা পারিবারিক বা সামাজিক নানা প্রেক্ষাপটের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করে। তবে এই দ্বিধাকে জয় করে ভ্রমণ জগতে নারীর পদচারণার গল্পও নেহায়েত-ই কম নয়।

শুনেছি সমুদ্রের বিশালতা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। অথচ সমুদ্রের খুব কাছে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও আমার স্বপ্ন দেখার কারিগর হলেন বাবা আর মা; যারা সবসময় আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। ভ্রমণের শুরুটা হয় ২০১৮ সালে, যখন মা নিজে হাতে টাকা তুলে দেন ভ্রমণের জন্য। কখনো কল্পনাও করতে পারিনি, চকরিয়ার মতো ছোট্ট একটা জায়গা থেকে নিজেকে বরফের চাদরে মোড়ানো এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে নিয়ে যেতে পারব।

এভারেস্ট বেস ক্যাম্প, নেপাল

২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর। অবশেষে সুযোগটা পেয়ে গেলাম, এক বছর তিন মাস ধরে পরিকল্পনা করা ভ্রমণের গল্প সফল করার। মাউন্ট এভারেস্টের নাম শুনলেও কখনো ভাবিনি, এর বেস ক্যাম্প জয় করব। মাউন্ট এভারেস্ট প্রায় ৮ হাজার ৮৫০ মিটার উঁচু। এর চূড়ায় উঠতে হলে চারটি ক্যাম্প পার হতে হয়। ক্যাম্প হচ্ছে রাতে থাকার জন্য আর বেস ক্যাম্প ট্রেকিং করার জন্য। ৫ হাজার ৪০০ মিটার যাওয়ার পরে আবার ফিরে আসতে হয়। যারা সামিট করে, তাদের উপরে যেতে হয়।

অক্টোবর ১৮ তারিখ কাঠমান্ডু পৌঁছেই গাইডের সঙ্গে আলোচনা করি। তারপর শপিংয়ের জন্য বেরিয়ে পড়ি। রেন্টাল দোকান থেকে ভাড়া করি স্লিপিং ব্যাগ। ১৯ তারিখ সকালের নাশতা করেই সোজা বেরিয়ে পড়ি এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। সেখান থেকে ১০ জন যাত্রীসহ ছোট্ট একটি প্লেনে করে ৩০ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছালাম লুকলা এয়ারপোর্ট। মাত্র তিন হাজার মিটার আয়তনের এই ছোট্ট এয়ারপোর্টটি এভারেস্টের সবচেয়ে কাছের এয়ারপোর্ট, যেটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এয়ারপোর্টও বলা হয়ে থাকে। লুকলা নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক গল্প আছে। ১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিনরি যখন এভারেস্ট জয় করেন, তখন তার লুকলা পৌঁছাতে সময় লেগেছিল প্রায় এক মাস আর আমরা পৌঁছে গেলাম মাত্র ৩০ মিনিটে।

লুকলা পৌঁছানোর পরপরই শুরু হলো কাঙ্ক্ষিত পথচলা। কিছুক্ষণ পর স্থানীয় লোকজন মাঝে মাঝে হাত নাড়িয়ে শুভ কামনা ও নমস্তে বলতে লাগল। প্রথম দিন দুপুরের খাবার সারলাম একটি টি হাউসে। দীর্ঘ ১৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার পথ চলার পর অন্য টি হাউসে পৌঁছালাম। রুমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করলাম শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। এত ঠাণ্ডা ছিল যে কোনোভাবেই শরীর গরম করতে পারছিলাম না। কোনো উপায় না থাকায় এভাবেই রাত কাটাতে হলো।

পরবর্তী গন্তব্য নামচি বাজার। প্রাণবন্ত একটি শহর। ট্র্যাকারস, ট্রাভেলার্সদের জন্য এটিই মূল শহর। এই শহরে দুদিন থাকতে হলো এমন উচ্চতার সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করার জন্য। আর পরের দিনগুলো কাটল এভারেস্টকে সামনে রেখে। যতই সামনে এগোচ্ছি, ততই এভারেস্টকে দেখার আগ্রহ যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে মনের ভেতরে।

প্রতিদিনই ১৩-১৪ কিলোমিটার ট্র্যাক করে ওপরে উঠছি। কিন্তু চারদিকের এত প্রশান্তিকর জায়গা দেখে সারাদিনের কষ্ট কিছুই আর মনে আসে না। বারবার শুধু এটাই ভাবছি যে, আমি কি সত্যি সত্যিই এভারেস্ট দেখতে যাচ্ছি! মজার বিষয় হলো, যত সামনে যাবেন, দেখে মনে হবে এটি এভারেস্টের চেয়েও উঁচু।

পৃথিবীর ১৪টি সবচেয়ে বড় পর্বতের ১০টি হিমালয়ান রেঞ্জের ভেতরে আমা দাবলামকে অনেক উঁচু মনে হলেও মূলত এভারেস্ট সবার চেয়ে উঁচু। lobuche- ৫০০০ মিটার- ঐতিহাসিক একটি জায়গা। এখানে রয়েছে শেরপাদের কবর; যারা হিমালয় এক্সপ্লোরেশনে জীবন হারিয়েছে। এখানে সবাই বিশ্রাম নেয়। Altitude Sickness এর শুরুও সবার এখান থেকে। রাতের খাবার শেষ করে খেয়াল করলাম, সারা শরীরে অনেক গরম অনুভব করছি, সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। কিন্তু চিন্তার কারণ নেই। ওষুধ নেওয়ার ২০-৩০ মিনিট পর ভালো অনুভব করবেন।

পরের দিন মনে হলো, আজকে আর আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু গাইড বলল, মানিয়ে নিতে হবে, শক্ত হতে হবে, নাহলে সবকিছুই শেষ। সব পার করে অবশেষে বেস ক্যাম্পের দেখা মিলল অনেক দূরে। দেখা যাচ্ছে, সামনে অনেক বড় লাইন। একটি বড় পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তুললাম। এভারেস্টের খুব কাছে গিয়েও চূড়া দেখা একটু কষ্টকর। তবু এখান থেকে আপনি ক্যাম্প-১-এর শুরু (Khumbu Glacier) দেখতে পারবেন।

বেস ক্যাম্প দেখার পর খুবই বিশ্রামের দরকার। কারণ এরপর যেতে হবে কালা পাথার (৫ হাজার ৬০০ মিটার) ক্লাইম্বিংয়ের জন্য, যেখান থেকে পুরো হিমালয় রেঞ্জের ওপরে পরিষ্কার সূর্যাস্ত দেখা যায়। এতটা উঁচু থেকে জীবনের প্রথম চকচকে সূর্য দেখা। দেখে মনে হবে, এভারেস্টের ওপর আগুন জ্বলছে আর এদিকে আমার শরীর ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে যাচ্ছে।

যেই এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে আপনি উঠবেন সাত দিনে, সেই একই পথ নামতে সময় লাগবে মাত্র তিন থেকে চার দিন। কিন্তু নতুন অভিজ্ঞতার জন্য আমি হেলিকপ্টার রাইড নিলাম। মনে হলো, আজকে আমার জীবন হাতে নিয়ে ফিরতে পারলে আর কখনো হেলিকপ্টার রাইড নেব না। এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্র্যাক করার পর আমার মনে হলো,

‘The harder you work for something, 
The greater you'll feel when you achieve it.’

কলি 

 

সৌন্দর্যে ভরা রাশিয়া

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:০৮ পিএম
সৌন্দর্যে ভরা রাশিয়া
ছবিটি রাশিয়ার সোচি শহরের

আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর বিশাল এই দেশ সম্পর্কে খুব কম জানি আমরা। সম্প্রতি রাশিয়া ঘুরে এসেছেন সাবিতা বিনতে আজাদ। তার যাত্রাটা ছিল মূলত বিশ্ব যুব উৎসবে অংশগ্রহণ করা। রাশিয়ার বিখ্যাত বিশ্বকাপ করা হোস্টিং সিটি সোচিতে কনফারেন্সে যোগ দিতে। কনফারেন্সের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ছয় মাস ধরে দফায় দফায় বিভিন্ন আপডেট আর আপলোড চালিয়ে কনফারেন্স কনফারমেশন মেইল পেয়েছিলেন। দু-তিন দফা রাশিয়ান অ্যাম্বেসিতে গিয়ে ভিসাও পেয়েছিলেন। তবে পর্যটক হিসেবে রাশিয়ার ভিসাপ্রাপ্তি আর ভ্রমণ তেমন জটিল কোনো কিছু নয়। নিয়মানুযায়ী আবেদন করলে সহজেই ট্যুরিস্ট ভিসা পাওয়া যায়। এসব নিয়ে লিখেছেন সাবিতা বিনতে আজাদ

সোচি শহর
কল্পনার মতো করে শহরটা সাজিয়েছে রুশ সরকার। মূলত শহরটা তৈরি হয়েছে ৫০ হাজারের ওপর অতিথির হোস্টিংয়ের জন্য। কৃষ্ণ সাগরের পাশে এই শহর, সবুজ আর শান্ত। সমুদ্রপ্রেমী ও ক্রীড়ামোদী পর্যটকদের কাছে এই শহর অনেক পছন্দের। রাশিয়ার জাররা এ শহরে অবসর সময় কাটাতে আসতেন। গ্রীষ্মে এ শহরে পর্যটকদের ঢল নামে। মূল শহর বেশ গোছানো। বাস, ট্রেন, ট্রাম সবকিছুই নাগালের মধ্যে। মোবাইল অ্যাপস ধরে, ক্যাশ কিংবা কার্ডে পেমেন্ট করে অনায়াসে আপনি ভ্রমণ করতে পারবেন। রুশ সরকার আমাদের ফ্রি সিম আর ব্যাংক কার্ডের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবে আপনি সহজেই পাসপোর্ট আর মাইগ্রেশন কার্ড দিয়ে সিম এবং ব্যাংক কার্ড করতে পারবেন। সোচি ভ্রমণ খুব আরামদায়ক ছিল, আরও ছিল

চমৎকার খাবার আর আয়েশি হোটেল। অফুরন্ত ইভেন্ট আর এডুকেশনাল সেশন চোখের পলকে শেষ হয়ে গিয়েছিল। সোচি থেকে বিমানযোগে মস্কো চলে গিয়েছিলাম। মস্কো থেকে একদম পৃথিবীর শেষের শহর মুরমাস্ক। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার একক যাত্রা। 

মুরমাস্ক শহর

পৃথিবীর শেষ গ্রাম আর নিয়ন আলোর নর্দার্ন লাইট হান্টিং- মস্কো শহর থেকে বিমানযোগে চলে গিয়েছিলাম মুরমাস্ক। এখানে পৃথিবীর শেষ গ্রাম টেরিবার্কা গিয়েছিলেন। অসাধারণ সে অনুভূতি। মূলত চারজন রুশ মেয়ের সঙ্গে মিলে গ্রামে গিয়েছিলাম। কী অপূর্ব সুন্দর এই গ্রাম! সেখানে গিয়ে দেখেছি সি গাল, গ্রিক মিথিওলজির রেইন্ডার, স্লেজ গাড়ি টানা হাস্কি কুকুরের ফার্ম। টেরিবারকা থেকে আর্কটিক সাগরের অপরূপ সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়েছি বারবার। ঠাণ্ডা এত বেশি ছিল যে, ৫-৬টা লেয়ারের জামা কাপড় পরেও জমে গিয়েছিলাম। 

নর্দার্ন লাইট
এই শহরেই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস দেখেছি। আমি প্রফেশনাল একজন গাইড বুক করেছিলাম, আমার পরিচিত এক ভাইয়ের রেফারেন্সে যারা খুব আগ্রহী, নর্দার্ন লাইট হান্টিং করে। আমার গাইড ইয়োরাস্লভের ডেডিকেশনের গল্প বললে কম হয়ে যাবে। সারা রাত ধরে আমাদের নর্দার্ন লাইট হান্টিং চলে। রাতের আকাশে নিওন লাইটের দেখা পাওয়া মার্চ মাসে এত সহজ নয়। আমরা ২০-২১ বার গাড়ি থেকে নেমেছি। মাইলের পর মাইল ছুটেছি। অবশেষে ধাপ করে নেমে এল বরফ রাজ্যে আকাশ থেকে সেই সবুজ নিয়ন আলো। আমি তাকিয়ে দেখলাম বরফ সবুজ হয়ে গেছে, পাইন বনে নেমে এসেছে নর্দার্ন লাইট। মস্কো ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিমানের টিকিট পরিবর্তন করে পেছাব। সেন্ট পিটার্সবাগ যাব।

সেন্ট পিটার্সবার্গ 
মস্কো এসে চলে গেলাম সেন্ট পিটার্সবাগ। ইতালির ভেনিসের মতো সুন্দর এই শহর। এখানকার সবকিছু ৩০০ বছর আগের করা। এখনো অনেক আধুনিক। যা দেখি তাতেই অবাক হয়েছি। জারদের কী স্থাপত্যশৈলী! কী সেই রাজপ্রাসাদ। স্টেট হেরমিটেজ, কাজান ক্যাথেড্রাল, চার্চ অব দ্য সেভিয়ার অন ব্লাড, কি অবাস্তব স্থাপত্য তবু কত বাস্তব। নদীগুলোর বরফ ভাঙতে শুরু করেছে। আমার মনেও গ্রীষ্মের উষ্ণতা লেগেছে। নিজেকে বহমান নদী মনে হচ্ছে। আমি রাস্তায় ঘুরতাম, ঘুরতাম নদীর ধারে, বাসে, ট্রামে। আর মেট্রো! সে এক এলাহিকাণ্ড। পৃথিবীর গভীরতম মেট্রো বোধহয় এই সেন্ট পিটার্সবার্গে। 

মস্কো 
সব শেষে আসি মস্কো ভ্রমণে। আমি দফায় দফায় মস্কো এসেছি এই ভ্রমণে, মস্কো ছিল আমার বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা। মস্কোর মেট্রো সিস্টেম আমার মাথা খারাপ করে ছেড়েছে। একবার এক ঘণ্টার জন্য হারিয়েও গিয়েছিলাম। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে হোস্টেলে ফিরেছি। পুরো শহর যেন পাতালপুরী। মাটির ওপরে যত না কিছু মাটির নিচে তার কয়েকগুণ বেশি এলাহিকাণ্ড! কী নেই! শপিংমল থেকে শুরু করে সবকিছুই। পরে জানতে পারলাম মেট্রোগুলো এত গভীরে করেছে। যাতে যুদ্ধ লাগলে এগুলোকে বাংকার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। মস্কোর আকাশ খুব সুন্দর আর পরিষ্কার। 

কোথায় থাকবেন
আমার মতো বাজেট ট্রাভেলার হলে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো হোস্টেল। বেশ সস্তা। সব সুযোগ-সুবিধা পাশাপাশি একটা রান্নাঘরও পেয়ে যাবেন। সবচেয়ে দারুণ কথা এখানে আপনি একা নন। দুনিয়াজুড়ে দেশ-বিদেশের বন্ধু বানানোর চমৎকার জায়গা এই হোস্টেলগুলো। আমি যেহেতু বেশির ভাগ একাই ভ্রমণ করেছি তাই আমি হোস্টেলগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছি। এগুলো নিরাপদ, সস্তা আর মূল শহরেই হয়। 

কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবেন
যদি আপনার একটা ফোন থাকে আর তাতে ইন্টারনেট থাকে, সঙ্গে রাশিয়ান একটা কার্ড পান তাহলে এ দেশ আপনার! যেকোনো জায়গায় কার্ড দিয়েই পেমেন্ট করে বাসে, ট্রামে, মেট্রোতে প্লেনের টিকিট কেটে চলতে পারবেন। আর ফোনে অ্যাপস আছে ট্রান্সলেটর, ম্যাপ, ট্যাক্সির ম্যাপ। সব ব্যবহার করে আপনি আরামে থাকতে পারবেন। 

সতর্কতা
রাশিয়ার ইমিগ্রেশন শেষে তারা একটা মাইগ্রেশন কার্ড দেয়। এটা হারিয়ে গেল পাসপোর্ট হারানোর মতোই কঠিন অবস্থা হবে। এটা একদম শেষ পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকা লাগবে। রাশিয়ার মানুষ দারুণ। ভাষা না বোঝা একটা সমস্যা, এক্ষেত্রে গুগল ট্রান্সলেটর আপনাকে সাহায্য করবে। ভ্রমণে আপনি মানেই বাংলাদেশ, এমন কিছু করবেন না যেটা আপনার দেশকে হেয় করে। রাশিয়ানরা বাংলাদেশিদের খুব ভালোবাসে।

কলি

 

ঈদে ঢাকাবাসীর ঘুরে বেড়ানো

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৫৭ পিএম
ঈদে ঢাকাবাসীর ঘুরে বেড়ানো

ঈদের ছুটিতে বেশির ভাগ মানুষই গ্রামে চলে যায় বলে ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা থাকে। তাই ঈদের ছুটিতে ঢাকায় বেড়ানোর ভালো সুযোগ। ঢাকা বা এর আশপাশে একাধিক জনপ্রিয় বেড়ানোর স্থান রয়েছে, ঈদের দিন অথবা পরের যেকোনো দিন চাইলেই আপনি পরিবার নিয়ে ঘুরতে পারবেন। জেনে নিন প্রিয় মানুষকে নিয়ে যেতে পারেন এমন কিছু জায়গার অবস্থান ও পরিচিতি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সৈয়দ শিশির 

ঈদের ছুটিতে বিশেষ করে বিকেলে ফাঁকা ঢাকায় পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন নগরবাসী। আমাদের প্রিয় রাজধানীতে আছে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সুন্দর ও নির্মল কিছু জায়গা। দূরে কোথাও না গিয়ে অনেকেই খুঁজেন আশপাশে অবসর কাটানোর ঠিকানা। তেমনি কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের কথা জেনে নেওয়া যাক-

ফ্যান্টাসি কিংডম
রাজধানীর অদূরে সাভারের ঢাকা-আশুলিয়া মহাসড়কের পাশে জামগড়া এলাকায় অবস্থিত ফ্যান্টাসি কিংডম পার্ক। প্রায় ২০ একর জায়গায় স্থাপিত এটি। পার্কটিতে ওয়াটার কিংডম, ফ্যান্টাসি কিংডম, রিসোর্ট আটলান্টিকা, এক্সট্রিম রেসিং (গো-কার্ট) ও হেরিটেজ কর্নার নামে বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও শিহরণ জাগানো রাইড রোলার কোস্টার এ পার্কের জনপ্রিয় রাইডগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। হেরিটেজ কর্নারে রয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর রেপ্লিকা। এখানে রয়েছে তিন তারকা মানের রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এবং অন্যান্য দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পার্কটি খোলা রাখে। চাইলে মতিঝিল থেকে মঞ্জিল পরিবহন ও হানিফ মেট্রো সার্ভিসে যেতে পারেন।

নুহাশ পল্লী
নুহাশ পল্লী ঢাকার অদূরে গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে ৪০ বিঘা জমিতে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত বাগানবাড়ি। এটি নুহাশ চলচ্চিত্রের শুটিং স্পট ও পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র। এখানে ঢুকে নামাজের ঘরের পাশেই দেখবেন তিনটি পুরোনো লিচুগাছ নিয়ে একটি ছোট্ট বাগান। এর উত্তর পাশে জাম বাগান আর দক্ষিণে আম বাগান।

এখানকার নানা স্থাপনা আর অসংখ্য ফলজ ও বনজ গাছের গায়ে সেটে দেওয়া আছে পরিচিতি ফলক, যা দেখে গাছ চেনা যাবে সহজেই। উদ্যানের পূর্ব দিকে রয়েছে খেজুর বাগান। বাগানের এক পাশে ‘বৃষ্টি বিলাস’ নামে একটি বাড়ি রয়েছে। নুহাশ পল্লীর আরেক আকর্ষণ ‘লীলাবতী দীঘি’। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নুহাশ পল্লী দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন খোলা থাকে। ১২ বছরের উপরে জনপ্রতি টিকিট লাগবে ২০০ টাকা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গুলিস্তান থেকে প্রভাতী-বনশ্রী বাসে হোতাপাড়া বাজারে নেমে সেখান থেকে টেম্পুতে করে যেতে পারবেন এ পল্লীতে।

জাতীয় চিড়িয়াখানা 
ঢাকার যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনোদন কেন্দ্র হচ্ছে জাতীয় চিড়িয়াখানা। ঈদ এলেই এখানে প্রাণীপ্রেমীদের ভিড় লেগে যায়। তাই ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ থেকে শুরু করে চেনা-অচেনা বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখতে পাবেন। দুই বছরের ঊর্ধ্বের বয়সী সবাইকে ৫০ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হবে। আর চিড়িয়াখানার ভেতরে অবস্থিত প্রাণী জাদুঘরে প্রবেশমূল্য ১০ টাকা।

আহসান মঞ্জিল
ঢাকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি স্পট আহসান মঞ্জিল। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার নবাবদের আবাসিক ভবনগুলোর মধ্যে বিখ্যাত স্থান এটি। ওয়াইজঘাটে এসে বুলবুল ফাইন আর্টস একাডেমির সামনে গেলেই ঐতিহাসিক ভবনটি নজর কাড়বে। এটি ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাচারি ছিল। ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের বহু স্মরণীয় ঘটনাসহ অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্মৃতি বিজড়িত এ ‘আহসান মঞ্জিল’। এর তোষাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষে থাকা তৈজসপত্র এবং নওয়াব এস্টেটের পুরোনো অফিস অ্যাডওয়ার্ড হাউস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করা হয়েছে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে।

লালবাগ কেল্লা
মুঘল আমলে নির্মিত একটি অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত লালবাগ কেল্লা। প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ে মুখরিত থাকে লাল ইটের দর্শনীয় এ কেল্লা। এর তিনটি বিশাল দরজার মধ্যে যে দরজাটি বর্তমানে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত- সেটি দিয়ে ঢুকলে বরাবর সোজা চোখে পড়বে পরী বিবির সমাধি। এর চত্বরে আরও রয়েছে দরবার হল ও হাম্মামখানা, উত্তর-পশ্চিমাংশে শাহি মসজিদ। ঢাকায় এত পুরোনো মসজিদ খুব কমই আছে। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার থেকে টেম্পুযোগে যাওয়া যায় লালবাগ কেল্লায়। এ ছাড়া নিউমাকের্ট এলাকা থেকে সরাসরি রিকশায় যাওয়া যায় লালবাগ কেল্লায়।

জিন্দা পার্ক 
পূর্বাচল হাইওয়ের কাছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত জিন্দা পার্কে সারা দিন সবুজের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসতে পারেন কিংবা থেকে যেতে পারেন রাতেও। প্রায় ১৫০ একর জমির ওপর অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা জিন্দা পার্ক। পার্কটি গাছপালা, পাখপাখালি, জলাধারে ভরপুর। এটি এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে। জিন্দা পার্কে বিশাল লেকে নৌবিহারেরও ব্যবস্থা ছাড়াও রয়েছে বিশাল লাইব্রেরি, ট্রি হাউস। জলাধারের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই পার্কে আছে পরিবেশবান্ধব সাঁকো। জিন্দাপার্কের ভেতরে খাবারের সুব্যবস্থা রয়েছে। কুড়িল বিশ্বরোডে পূর্বাচল হাইওয়ে অর্থাৎ ৩০০ ফিট রোড দিয়ে গেলে সবচেয়ে সহজ উপায়ে যেতে পারবেন এ পার্কে। চাইলে ঢাকা থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পাড় হয়ে ভুলতা যাবেন তারপর বাইপাস হয়ে জিন্দা পার্ক যেতে পারেন। প্রতিদিন সকাল ৯টায় খোলা হয় এ পার্ক এবং সপ্তাহে প্রতিদিনই খোলা থাকে।

বিশেষ পরামর্শ
সাধারণত সরকারি ছুটির দিনগুলোয় এসব স্থান খোলা থাকে। তবে সংস্কার কাজ ও অন্যান্য সমস্যার কারণে অনেক সময় কর্তৃপক্ষ সেগুলো বন্ধ রাখতে পারে। তাই বাসা থেকে বের হওয়ার আগে খোলা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নেবেন।ৎে

বেড়াতে যাওয়ার আগে একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখবেন- নিজের এবং প্রিয়জনদের নিরাপত্তা সবার আগে। কোনো নিরিবিলি এলাকায় গেলে চেষ্টা করুন সন্ধ্যার আগেই চলে আসতে।

কলি

ঘুরে আসুন ঐতিহাসিক সোনারগাঁ

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৪, ০৫:২৮ পিএম
ঘুরে আসুন ঐতিহাসিক সোনারগাঁ

ঢাকার খুব কাছেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবেষ্টিত বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁ। এখানে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বরে রয়েছে একাধিক পিকনিক স্পট। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী সেখানে ভ্রমণে যান। সোনারগাঁ বেড়ানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন সৈয়দ শিশির 

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন। এগুলো হলো লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, ঐতিহাসিক পানাম নগরসহ আরও অনেক কিছু।  

লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর

সোনারগাঁয়ে গেলে প্রথমেই আপনি যা দেখবেন তা হলো- আবহমান গ্রামবাংলার লোক সংস্কৃতির ধারাকে পুনরুজ্জীবন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য গড়ে ওঠা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন যা, সোনারগাঁ জাদুঘর নামে পরিচিত। এটি একটি জাতীয় জাদুঘর। বাংলাদেশের লোকশিল্পের সংরক্ষণ, বিকাশ ও সর্বসাধারণের মধ্যে লোকশিল্পের গৌরবময় দিক তুলে ধরার জন্য ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকার বিশাল এলাকা নিয়ে এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যেমন- পাঞ্জাবি, শাড়ি, ধুতি, শার্ট, প্যান্ট ইত্যাদি। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী, যেমন বাদ্যযন্ত্র, খেলনা, আসবাবপত্র ইত্যাদি। এখানকার জয়নুল আবেদীন স্মৃতি জাদুঘরটি বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীনের স্মরণে নির্মিত। এ জাদুঘরে জয়নুল আবেদীনের বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় এ জাদুঘরের টিকিট কাটার নিয়মে অনেক ক্যাটাগরি রয়েছে, যার মধ্যে একটি হচ্ছে ছাত্রছাত্রী। তাদের জন্য প্রবেশমূল্য মাত্র ৩০ টাকা। জাদুঘরটির ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সের টিকিট বা প্রবেশমূল্য সর্বসাধারণের জন্য ৫০ টাকা। তবে বিদেশি দর্শকদের জন্য ১০০ টাকা। এ ছাড়া এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য প্রতিটি বাস ৩০০ টাকা, কোস্টার ২০০ টাকা, কার/জিপ বা মাইক্রোবাস ১০০ টাকা। সিএনজি ও মোটরসাইকেল ২৫ টাকা এবং বাইসাইকেলের জন্য ১০ টাকা দিতে হয়। 

নির্ধারিত ফিয়ের বিনিময়ে লেক এবং নৌ বিহার ভ্রমণের জন্য জনপ্রতি ৩০ মিনিট ২০ টাকা এবং শুটিং স্পটের জন্য সারা দিন ৩ হাজার ৪৫০ টাকা দিতে হয়। একই সঙ্গে বড়শিতে মাছ ধরতে ১ হাজার ৭৫০ টাকা ফি দিতে হয়। এখানকার সরদার বাড়িতে প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের জন্য এবং বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য ২০০ টাকা। এখানে শীতকালীন এবং গ্রীষ্মকালীন- এ দুই সিজনে দুই ধরনের সময়সূচি রয়েছে।

সোনারগাঁ জাদুঘরের সময়সূচি ২০২৩ অনুসারে, শীতকালীন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর গ্রীষ্মকালীন অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা। জাদুঘরটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে।

পানাম নগর

জাদুঘর থেকে বেরিয়ে ঠিক উত্তর দিকে গেলেই আপনি দেখতে পাবেন ঐতিহাসিক পানাম নগর। পানামের অট্টালিকা আপনাকে স্বাগত জানাবে। চারদিকে পরিখা বেষ্টিত দুই দিকে ফটকসমৃদ্ধ ইমারতরাজী শোভিত নাচঘর, নহবতখানা, দরবার কক্ষ। এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল।

একটু উত্তর দিকে দেখা যাবে পঙ্খীরাজ সেতু (পানাম সেতু) ও নীলকুঠি। ঈশা খাঁর সময়কালে এ নগর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। সোনারগাঁয়ে রাজদণ্ড বা রাজকার্য পরিচালিত হতো এই পানাম নগর থেকেই। এ নগরই যে প্রাচীন বাংলার রাজা-বাদশাহদের বাসস্থান ছিল তার প্রমাণ এ অঞ্চলের স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায়। পানাম গড়ে উঠেছিল বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে। যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের স্বাক্ষর হয়ে আছে।

এ নগরীতে আরও রয়েছে খাজাঞ্চিখানা, ঠাকুর ঘর, গুপ্তপথ, মঠ, মন্দির, পোদ্দার বাড়ি, ৪০০ বছরের প্রাচীন টাকশাল বাড়ি, বিনোদন পিকনিক স্পট, ট্যুরিস্ট হোম এবং প্রাচীন বিদ্যাপীঠ সোনারগাঁ জি আর ইনস্টিটিউশন।

কারুশিল্প গ্রাম

এখানকার কারুশিল্প গ্রামে বৈচিত্র্যময় লোকজ স্থাপত্য গঠনে বিভিন্ন ঘরে কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। দোচালা, চৌচালা ও উপজাতীয় মোটিফে তৈরি এ ঘরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অজানা, অচেনা, আর্থিকভাবে অবহেলিত অথচ দক্ষ কারুশিল্পীরা বাঁশ-বেত, কাঠ খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশিকাঁথা, একতারা, পাট, শঙ্খ, মৃৎশিল্প ও ঝিনুকের সামগ্রী ইত্যাদি কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে কিংবা প্রাইভেটকারে সোনারগাঁয়ে যাওয়া যায়। সময় লাগে বাসে এক থেকে দেড় ঘণ্টা এবং প্রাইভেটকারে এক ঘণ্টা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা হয়ে উত্তরদিকে গেলেই দেখতে পাবেন পর্যটন নগরী সোনারগাঁ। গুলিস্তান হকি স্টেডিয়ামের পাশে বাস কাউন্টার রয়েছে। এখান থেকে ঢাকা-মেঘনা সড়কের দোয়েল সার্ভিস, স্বদেশ পরিবহন, মেঘালয়, বোরাক বাসে চড়ে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। বাস ভাড়া ৪৫-৫৫ টাকা। যদি বাসে যান তাহলে চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড নেমে রিকশা করে উত্তর দিকে পর্যটক নগরী সোনারগাঁ লোক ও কারু শিল্প ফাউন্ডেশন (সোনারগাঁ জাদুঘরে) যেতে হবে। রিকশা ভাড়া নেবে ৩০-৪০ টাকা।

যেখানে থাকবেন

সোনারগাঁয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত থাকার পরিকল্পনা করেন না বেশির ভাগ পর্যটক। ঢাকার খুব কাছাকাছি বলে এক দিনে ঘোরাঘুরি শেষে আবার বাসায় ফিরে যান। কিন্তু যারা দূর থেকে বেড়াতে আসেন তারা অনেক সময় থেকে যেতে চান। তাদের জন্য এখানে থ্রি স্টার মানের ‘সোনারগাঁ রয়্যাল রিসোর্ট’ রয়েছে। এটি লোকশিল্প জাদুঘরের পাশেই খাসনগর দিঘীরপাড় এলাকায় অবস্থিত। রাত যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। তবে থাকতে হলে আগেই বুকিং দিতে হবে।

এ ছাড়া একটি রেস্ট হাউস আছে। সেটি এমএ সাত্তার কেন্দ্রীয় গণবিদ্যালয় (বেইস)। এখানে অনেকগুলো মনোরম কক্ষ রয়েছে। জাদুঘর সংলগ্ন খাসনগর দীঘিরপাড় ইছাপাড়া গ্রামে এর অবস্থান। এ ছাড়া সরকারি অতিথিদের জন্য জাদুঘর ও উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব গেস্ট হাউস বাংলো রয়েছে।

কলি

দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩৪ পিএম
দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। এটির দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার, যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে কক্সবাজারের তিনটি বিচই পর্যটকরা বেশি পছন্দ করেন। সেগুলো হলো কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী। আমাদের দেশের ভ্রমণপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ হলো কক্সবাজার। অনেকেই আছেন যাদের প্রতি বছরই কক্সবাজার না গেলে ভালোই লাগে না।

তারপরও এমন অনেকেই আছেন যারা কক্সবাজার যাওয়ার প্ল্যান করেও এখনো যেতে পারেননি। তাদের জন্য এই লেখাটি।

কক্সবাজার নাম কীভাবে হলো

কক্সবাজারের নামকরণের পেছনে ছোট্ট একটি ইতিহাস না বললেই নয়। এর প্রাচীন নাম ছিল পালংকী। একসময় এটি প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। প্যানোয়া শব্দটির অর্থ হলুদ ফুল। অতীতে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকাগুলো এই হলুদ ফুলে ঝকঝক করত। স্থানীয় বাসিন্দারা এই সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে একজন ইংরেজ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স অষ্টাদশ শতকে পালতোলা কাঠের জাহাজে করে এখানে এসে নামেন। ১৭৯৯ সালে তিনি এখানে একটি বাজার স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে হিরাম কক্সের নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় কক্সবাজার।

কক্সবাজার নিয়ে কিছু কথা

কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণে-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং চট্টগ্রাম প্রশাসনিক বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। এর আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৯১ দশমিক ৮৬ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে হারবাংয়ের সুউচ্চ পাহাড় থেকে দক্ষিণে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে নাফ নদীর কোল ঘেঁষে সাবরংয়ের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত এর অবস্থান। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন।

চট্টগ্রাম শহর থেকে কক্সবাজার ১৫২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের পাশে অবস্থিত মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কক্সবাজারে রয়েছে দর্শনীয় বেশ কয়েকটি স্থান। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী, শাহপরী ও সেন্ট মার্টিন কক্সবাজারকে করেছে আরও আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মাতা মুহুরী, বাঁকখালী, রেজু, কুহেলিয়া ও নাফ নদী।

পর্যটন, বনজসম্পদ, মাছ, শুঁটকি, শামুক, ঝিনুক ও সিলিকাসমৃদ্ধ বালুর জন্য কক্সবাজারের অবস্থান তাই ভ্রমণবিলাসী পর্যটকদের কাছে সবার শীর্ষে। সমুদ্রতটের অপার সম্ভাবনাময় এ দ্বীপখণ্ডটিতে তাই সমৃদ্ধির আশায় ছুটে এসেছে মগ, পর্তুগিজ, আরব, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজরা। কালের বিবর্তনে এখানে লেগেছে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ছোঁয়া। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কক্সবাজারকে মহকুমায় উন্নীত করেন। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজারকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তর করা হয়। ২০০২ সালে আটটি উপজেলা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কক্সবাজার জেলা গঠিত হয়। এগুলো হলো কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, উখিয়া ও টেকনাফ।

কীভাবে যাবেন

সড়ক, ট্রেন এবং বিমানপথে কক্সবাজার যাওয়া যায়। সড়কপথে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪১৪ কিলোমিটার। ঢাকার ফকিরাপুল, আরামবাগ, মতিঝিলসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সরাসরি কক্সবাজারের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার এসি, নন-এসি স্লিপার বাস পাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে এক থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যাওয়ার সরাসরি বাস সার্ভিস চালু আছে।

এ ছাড়া বর্তমানে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত দুটি ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার এক্সপ্রেসে যাওয়া যায়। ট্রেনে ভাড়া পড়বে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নন-এসি চেয়ার ৬৯৫ টাকা ও এসি চেয়ার ১ হাজার ৩২৫ টাকা। শিশুদের ক্ষেত্রে ভাড়া কিছুটা ছাড় পাওয়া যায়। আর ট্রেনের টিকিট অনলাইনে কাটার ক্ষেত্রে ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

আর বিমানপথে যাওয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বিমান বাংলাদেশ ছাড়াও নভো এয়ার, ইউএস বাংলা, এয়ার এস্ট্রা প্রভৃতি সরাসরি ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাত্রী পরিবহন করছে। সেগুলোর ভাড়া ৪ হাজার ৫০০ থেকে শুরু হয়। তবে বিভিন্ন সিজনে নানা রকম অফারে অনেক সময় কমেও বিমানে কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সব ক্ষেত্রেই আগে থেকে টিকিট কেটে রাখা ভালো। বিশেষত বাস ও বিমানে আগে থেকে টিকিট কাটলে সাশ্রয়ী ভাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কিছু কিছু অনলাইনেও বিশেষ ছাড়ে টিকিট বিক্রি করা হয়।

কোথায় থাকবেন

কক্সবাজারে থাকার জন্য পাঁচ তারকা সমমানের অনেক হোটেল ও রিসোর্ট আছে। এ ছাড়া চার তারকা, তিন তারকাসহ বিভিন্ন মানের হোটেলও আছে। বিচের আশপাশের বেশির ভাগ হোটেলই ভালো মানের। বেশির ভাগ হোটেল ও রিসোর্ট কলাতলী বিচ ও লাবণী পয়েন্টের আশপাশে অবস্থিত। ইনানী বিচের আশপাশে থাকার জন্যও সম্প্রতি বেশ কিছু হোটেল গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া এর বাইরে আছে ইকো রিসোর্ট। এসব হোটেল ও রিসোর্টে পিক টাইম এবং অফ-পিক টাইম অনুযায়ী রুমের ভাড়া ভিন্ন হয়। সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল পিক টাইম এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অফ-পিক টাইম হিসেবে ধরা হয়।

অফ-পিক টাইমে রুম ভাড়া হোটেল ভেদে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। হোটেল ভাড়া দরদাম করে নিলে অনেক কমে পাওয়া যায়। তবে পিক সিজন বা ছুটির দিনে আগে থেকেই হোটেল রুম বুকিং করে যাওয়া ভালো। নইলে পরিবার নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বর্তমানে অনলাইনে অনেক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কোনো অ্যাডভান্স টাকা ছাড়াই হোটেল রুম বুকিং করা যায়।

কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থান

হিমছড়ি, ইনানী বিচ, ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক, সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপ, মহেশখালী, সোনাদিয়া দ্বীপ, এয়ারপোর্ট এলাকা, বার্মিজ মার্কেট, শুঁটকি মার্কেট, হিলটপ সার্কিট হাউস ও এর পাশের রাডার স্টেশন, লাইট হাউস, আগ্গা মেধা বৌদ্ধ ক্যাং ও মাহাসিংদোগী বৌদ্ধ ক্যাং, মাথিনের কূপ, গোলাপ চাষ প্রকল্প, বদর মোকাম মসজিদ, চিংড়ি প্রসেসিং জোন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, লবণ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা, রামকোট তীর্থধাম, কানা রাজার সুড়ঙ্গ, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, লামার পাড়া বৌদ্ধবিহার, কুতুবদিয়া দ্বীপের বাতিঘর, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ বিচ ইত্যাদি।

সতর্কতা

একটু সতর্কতার অভাবে প্রতি বছর অনেক পর্যটক সমুদ্রের পানিতে গোসল করতে গিয়ে প্রাণহানির শিকার হচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। সৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী বিচ পর্যন্ত গুপ্ত খাল রয়েছে এবং বেশির ভাগ পর্যটক ভাটার সময় নেমে এই গুপ্ত খালে পড়ে প্রাণ হারান। তাই ভাটার সময় সৈকতে গোসল করা পরিহার করা উচিত। ভাটা ও জোয়ারের সময় অনুযায়ী সৈকতে লাল ও সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হয়। যখন সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হবে তখন গোসল করা নিরাপদ।

আর গোসলের সময় বিচের বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো। প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে রাখতে পারেন। আর যেকোনো সমস্যায় বিচের ট্যুরিস্ট পুলিশ বা লাইফ গার্ডের সদস্যদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তারা ট্যুরিস্টদের যেকোনো সমস্যার সমাধানে বেশ আন্তরিক।

কলি

ভাষাশহিদের জাদুঘর ভ্রমণ

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০৯ পিএম
ভাষাশহিদের জাদুঘর ভ্রমণ

ঢাকা শহরের অদূরেই মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামটি আমাদের ভাষা শহিদ রফিক উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি। এখানেই তার জন্ম। আমরা এক সকালে বন্ধুরা মিলে এই ভাষার মাসে গিয়েছিলাম ভাষা শহিদ রফিক উদ্দিনের স্মৃতিকে উৎসর্গীকৃত ভাষা শহিদ রফিক উদ্দিন জাদুঘরে।

আমাদের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল বন্ধু জিলাল আহমেদ, একজন নিবেদিতপ্রাণ কলেজ শিক্ষক এবং দারুণভাবে শিক্ষানুরাগী। তার বাসায় আছে একটি বেশ বড়সড় ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। আর সে এমন একজন শিক্ষক যে নাকি নিজের গাটের পয়সা খরচ করে ক্লাসের ছাত্রদের দর্শনীয় স্থান দেখাতে নিয়ে যায়। আরেক বন্ধু বজলুল করিম চৌধুরী ওরফে বাবর হলো মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক; যে নাকি বিনা পয়সায় রোগী দেখার জন্য বিখ্যাত।

সেই প্রথম প্রস্তাব করে রফিকউদ্দিনের মেমোরিয়াল জাদুঘর দেখতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ খুব ভালোভাবে চেনে না। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তারেক ভাই যোগ দেওয়ার পর বলল, আগে তো বের হই। আর সঙ্গে আছে সব বিষয়ের ব্যবস্থাপক অনুজপ্রতিম তেজেন রায়। কিন্তু রাস্তা কে চেনে? কুছ পরোয়া নেহি।

সঙ্গে আছে জ্যান্ত এটলাস শাহজাহান। অ অঞ্চলের এমন কোনো স্থান নেই যার আদ্যোপান্ত সে জানে না। আর আমি মূর্খ তো আছিই। জিলাল আর বাবরের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল সকাল ১০টা নাগাদ। সঙ্গে কিছু হালকা খাবার। কিন্তু জ্যান্ত এটলাস শাহজাহানের এটলাসগিরিতে তেমন কোনো কাজ হলো না। দুই তিনবার রাস্তা ভুলভাল করে শেষে পৌঁছে গেলাম পারিল তথা রফিকনগর গ্রামে। চমৎকার রাস্তা। কোথাও কোনো ট্রাফিক জ্যাম নেই। ঢাকা থেকে আসতে হলে ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে ধরে হেমায়েতপুরে নেমে বাম দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে সহজেই ব্যাটারিচালিত রিকশা বা গাড়িতে করে অনায়াসে রফিকনগর পৌঁছে যাওয়া যায়। তবে অটোতে যেতে হলে অটোরিকশাওলাকে এখনো পারিল গ্রামই বলতে হবে।

পারিল গ্রামে শহিদ রফিকউদ্দিন জাদুঘরটি একটি সুরম্য এবং অত্যন্ত সুন্দর ভবন, খোলামেলা জায়গায় রাস্তার পাশেই নির্মিত হয়েছে। এর একপাশে এবং সামনে বিস্তৃর্ণ আবাদি জমি। আমরা যখন গেছি তখন সরিষা মৌসুম চলছে। চারদিকে হলুদ সরিয়া ফুলের রং ভবনটির আরও সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। পারিল গ্রামেই রফিকউদ্দিনের সব ভাইবোন বসবাস করতেন। তারা ছিলেন পাঁচ ভাই দুই বোন। রফিকউদ্দিন ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়।

এর মধ্যে এখনো সর্বকনিষ্ঠ ভাইটি বেঁচে আছেন। তিনি একজন সমাজসেবক। তাদের ভাইবোনের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই এই গ্রামেই বসবাস করেন। তারা গর্ববোধ করেন তাদের পরিবারের নিকট পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃত ও সম্মানিত। শহিদ রফিকের নামানুসারে পারিল গ্রামটি এখন ‘রফিকনগর’ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

ভাষা আন্দোলনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার জন্য তাকে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ভাষা শহিদ রফিকউদ্দিন ১৯২৬ সালে ৩০ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুল লতিফ এবং মায়ের নাম রাফিজা খাতুন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। স্কুলজীবন শেষ করে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনা না করে ঢাকায় এসে বাবার প্রেসের ব্যবসা দেখাশোনা শুরু করেন এবং জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে ব্যবসা এবং পড়ালেখা দুটোই চালাতে থাকেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রতিবাদ মিছিল চলাকালে ঢাকা মেডিকেলের সামনে যখন পাকিস্তানি পুলিশ মিছিলের ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ করে তখন শহিদ রফিক মাথায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনিই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ। তাকে পুলিশ পাহারায় আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তার কবরটি আর চিহ্নিত করা যায়নি। ২০১০ সালে রফিকের গ্রামের বাড়িতে জেলা পরিষদ শহিদ রফিকউদ্দিন স্মরণে এই গ্রন্থাগার-জাদুঘর নির্মাণ করে। তবে জাদুঘরটিতে রফিকের স্মৃতি স্মারক বলতে তেমন কিছুই নেই।

তার ব্যবহার করা পাঞ্জাবি আর টেবিল চেয়ার ছাড়া আর কিছুই নেই। বাইরে এবং ভিতরে শহিদ রফিকের দুটো ম্যূরাল তৈরি করা হয়েছে। এমনকি ৯ হাজার সংগৃহীত বইয়ের মধ্যে মাত্র দুটো বই শহিদ রফিককে নিয়ে লেখা। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য পর্যাপ্ত বই আছে। যেখানে পাঠকরা ইচ্ছামতো তাদের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনো একজন পাঠকও সারা দিনে এখানে আসে না। এ তথ্যটি জানালেন ভাষা শহিদ রফিকের ভাইয়ের ছেলে ফরহাদ হোসেন খান।

আরেকটি বিষয় একজন গ্রন্থাগারিক নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও গ্রন্থাগারের বইগুলো একেবারে এলামেলো অবস্থায় আলমারিতে সাজানো, অনেক ক্ষেত্রে যেভাবে খুশি সেভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে। লেখকের নাম অনুযায়ী বা বিষয়ভিত্তিকভাবে বইগুলো সাজিয়ে রাখলে পাঠকদের সুবিধা হতো। তবে পাঠক কিন্তু কদাচিৎ দু-একজন আসে। এদের কেউ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বা কলেজে পড়ে। দেশের বাড়িতে বন্ধের সময় এলে গ্রামের এসব ছাত্ররা এই গ্রন্থাগারের বই বাসায় নিয়ে পড়ে। আমরা ওখানে থাকতেই এ ধরনের একজন ছাত্র দেখলাম বেশ কিছু বই নিয়ে এসেছে ফেরত দেওয়ার জন্য।

ছাত্রটি জানাল, সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র। ছুটিতে এসেছে বাড়িতে। তাই বই নিয়ে গিয়েছিল এই গ্রন্থাগার থেকে। তাকে জিলাল বলল, তোমরা শিক্ষিত হয়েছ, তোমরা তো গ্রামের অন্যদের প্রভাবিত করতে পার, বলতে পার বই পড়ার জন্য। ছেলেটা জানাল, সে বলে। বন্ধু শাহজাহান প্রস্তাব করল, একদিন আমরা বইগুলো সাজিয়ে দিয়ে যাই। সবাই রাজি হলো। তবে সেটি আর হয়ে ওঠে কি না তা অনিশ্চিত। ভাষা শহিদ রফিকের ভাতিজা জানাল, মেমোরিয়ালের প্রাঙ্গণে ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী মেলা হয়, রফিক মেলা। মেলাটি ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত চলে।

সে মেলায় নৃত্য, সংগীত, আঁকা, বইপড়া, আবৃত্তিসহ নানা সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর কর্মসূচি পালন করা হয়। ওই সময় বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং রক্তদান কর্মসূচি পালিত হয়ে থাকে। সে মেলায় সরকারি কর্মকর্তারা আসেন। শহিদ রফিকের বাড়িতে সরকার কর্তৃক নির্মিত শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। তখন একটু লোকজনের ভিড় হয়। এ ছাড়া এ সুরম্য ভবন এবং বিপুল গ্রন্থরাজি সারা বছর অবহেলায়ই পড়ে থাকে। তবে আমাদের বিশ্বাস সরকারি উদ্যোগে এই জাদুঘর কাম গ্রন্থাগারের প্রচার প্রচার চালালে এখানে অবশ্যই বিপুল পরিমাণ ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগমন ঘটবে।

এতে মানুষ আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানবে এবং নিঃসন্দেহে দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের সরিষা ফুলগুলোর রং আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল শেষ সূর্যের রৌদ্রের আভায়। ফিরে আসার সময় আমাদের সবাইকেই একটু বিষণ্নতায় গ্রাস করেছিল।

বায়ান্নর আগুনরাঙা বিকালটা কী এমনই ছিল, রফিকের মাথায় গুলিবিদ্ধ লাশটি যেদিন এমনই এক বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হোস্টেলের পাঁচ নম্বর কক্ষের সামনে নিথর হয়ে পড়েছিল?

কলি