দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় সংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে ১৬টি পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দুদকের কর্মচারী নিয়োগের জন্য পৃথক, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড এবং স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস গঠন করাসহ ১৬টি পরামর্শ বাস্তবায়ন করলে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন হাইকোর্ট।
১৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের একটি মামলায় তিতাস গ্যাসের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান সরকার ও টেকনিশিয়ান আব্দুর রহিমের সাজা বাতিল করে দেওয়া রায়ে ১৬ পরামর্শসহ কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একক বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করা হয়। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে দুদকের অন্যতম আইনজীবী খুরশীদ আলম খান খবরের কাগজকে বলেন, প্রকাশিত রায়ে অনেক কিছুই আছে, যা সরকার বা জাতীয় সংসদ বাস্তবায়ন করবে। তবে রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর কমিশনের সভা এবং কমিশনের লিগ্যাল উইংসের সঙ্গে আলোচনা করবে। নিশ্চয়ই কমিশন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
হাইকোর্টের ১৬ পরামর্শের মধ্যে রয়েছে- ১. দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস গঠন করা; যে প্রক্রিয়ায় অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ করা হয়, সেই প্রক্রিয়ায় দুদকের কর্মকর্তা নিয়োগ করা; ২. দুদকের অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও পৃথক, স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড গঠন করা; ৩. দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণ দাখিল করা এবং বাধ্যতামূলকভাবে সম্পত্তির হিসাব জনসমক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা; 8. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য নির্বাচন করা; ৫. সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের জন্য পৃথক প্রসিকিউশন প্যানেল গঠন করা এবং প্রতি ৩ বছর পরপর উক্ত প্যানেল পুনর্গঠন করা।
৬. দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান/তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হলে অভিযোগকারীকে ৩০ দিনের মধ্যে অনুসন্ধানের ফলাফল এবং অনুসন্ধান শেষে মামলা দায়েরের ১৫ দিনের মধ্যে মামলার এজাহারের কপিসহ অভিযোগকারীকে অবহিত করা; ৭. একইভাবে দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণ করা না হলে বা সত্যতা পাওয়া না গেলে এর কারণ উল্লেখ করে প্রতিটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগকারীকে অবহিত করা; ৮. অনুসন্ধানের ফলাফলে অভিযোগকারী সংক্ষুব্ধ হলে এ বিষয়ে হলফনামাসহ কারণ উল্লেখ করে অভিযোগটি অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্ট জেলার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দায়ের করা; ৯. দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে সত্যতা না পেলে কিংবা সত্যতা পেয়েও কমিশন তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের না করলে অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট জেলার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন; ১০. দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষ জজ নিয়োগ প্রদান করা; বিশেষ জজ আদালতকে পুনর্গঠন করে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিতে সক্ষম করে তোলার উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনালে রূপান্তর করে ‘দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল’ নামকরণ করা।
১১. দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য নির্ধারিত পদসমূহে কমিশনের বাইরের কোনো কর্মকর্তাকে পদায়ন না করা; ১২. দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ, মামলা, তদন্ত, অনুসন্ধানের বিষয় ও ফলাফল মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক পর্যায়ে জনসমক্ষে প্রকাশ করা; তা ছাড়া দুর্নীতিবাজ কোনো ব্যক্তির দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের ফলাফল কিংবা তার সম্পত্তির তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে কমিশন কর্তৃক জনগণকে অবহিত করা; এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওয়েবসাইটে ধারাবাহিকভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করা; ১৩. যেকোনো তথ্যের জন্য কোনো ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে বিধি মোতাবেক দরখাস্ত আনয়ন করলে তাকে দরখাস্ত প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে ফলাফল অবহিত করা; সে ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া।
১৪. দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ১৭ (ক) ধারার আওতা ও পরিধি বৃদ্ধি করা এবং ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স ১৯৮৬ (জুলাই, ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত)-এ বর্ণিত ১ থেকে ২৫ নং টেবিলে বর্ণিত (সাংবিধানিক দায়মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত) ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তফসিল বর্ণিত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা’সংক্রান্ত বিধান সংযুক্ত করা; ১৫. দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিটি অনুসন্ধান এবং তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করা; ১৬. The Code of Criminal Procedure, 1898; দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪; দুর্নীতি কমিশন বিধিমালা, 2009; Criminal Law Amendment Act, 1958; Prevention of Corruption Act, 1947; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯; অপরাধ-সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধিসমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন করা।
রায়ের কপি আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে ই-মেইলে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রায় ও আদেশের অনুলিপি জাতীয় সংসদের সব সদস্য এবং অধস্তন আদালতের সব বিচারককে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়েছে।
আ.রহিম