১৯৭১ সালে পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও পাকবাহিনী এসে পৌঁছেছিল। তারা তাণ্ডব চালায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে। ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মানুষ ভয়ে আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরের আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে চলে যায়। জীবনের মায়া তো সবারই আছে। মাইলের পর মাইল হেঁটে, কেউবা নৌকায় করে অন্য এলাকায় গোপনে চলে যায়।
আমি ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ১১তম ব্যাচে ট্রেনিং করেছি ২৮ দিন। ট্রেনিংয়ের জন্য প্রথমে নৌকাযোগে ইটনা থেকে সাচনা, তাহিরপুর, টেকেরঘাট হয়ে ভারত যাই। টেকেরঘাট থেকে গিয়েছি বালাট।
তখনকার সময়ে তৎকালীন রিক্রুটিং অফিসার ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভাই। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তৎকালীন ময়মনসিংহ-১৮ আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করার দায়িত্ব ছিল তার। সেখানে হামিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে ভারতে ট্রেনিং করতে যাওয়ার পথে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।
১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকের ঘটনা। তারিখ মনে নেই। বাংলাদেশের জয় বাংলা বাজারে রাত্রিযাপন করি। ভারতে গিয়ে এলাকার অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তৈরি অস্থায়ী ক্যাম্পে নিকলী, বাজিতপুর, ইটনা, অষ্টগ্রামসহ ময়মনসিংহ জেলার ৮০০ তরুণ ছিলেন। তাদের দাঁড় করিয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য বাছাই করা হয়েছে। আমি ছোটখাটো মানুষ। তবে আমার সাহস ছিল অনেক। মনোবল নিয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। সেই অস্থায়ী ক্যাম্পে যে খিচুড়ি খেতে দিয়েছে, মুখে দিলেই বালু। না চিবিয়ে শুধু গিলতে হতো সেই খাবার। এরপর সেখান থেকে চেরাপুঞ্জি হয়ে শিলং ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছি।
একটা লুঙ্গি, একটা গামছা আর গেঞ্জি পরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। মেঘালয়ের ইকুয়ান ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। সেখানে অনেক ঠাণ্ডা ছিল। পাতলা গামছায় মাথা মুড়িয়ে রাতে তাঁবুতে ঘুমাতাম। চিনা জোঁকের কামড়ে সকালে উঠে দেখতাম গেঞ্জি লাল হয়ে গেছে। সারা দিন ট্রেনিংয়ের পরে যখন ঘুমাতাম, ক্লান্তিতে তখন হুঁশ থাকত না। আমাদের ট্রেনিং শেষে শিলং আসার পর দেওয়া হয়েছিল অস্ত্র। আমি রাশিয়ান অস্ত্র পেয়েছিলাম। ইন্ডিয়ান অস্ত্রও ছিল, যা অনেকেই পেয়েছে। আমি এসএলআর পেয়েছিলাম। আর ৫০ রুপি দিয়ে দিয়েছিল খরচের জন্য। সেখান থেকে পুনরায় বালাট এসেছি। ২৮ দিনের ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। আমরা যে সীমান্ত দিয়ে এসেছি, টেকেরঘাট তাহিরপুর সুনামগঞ্জ এলাকায় তুমুল যুদ্ধ চলছিল। তখন ৫ নং সেক্টরে আমরা যুদ্ধ করেছি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে।
জুলাই মাস। যুদ্ধ চলার সময়ে সুনামগঞ্জ থেকে কিছুদিন পর নিজের এলাকা দেখতে নৌকাযোগে খালিয়াজুড়ি এসেছিলাম। প্রত্যেক নৌকায় ১০ জন করে মুক্তিযোদ্ধার টিম। একসঙ্গে এসেছিলাম। তখন নৌকার দাঁড় বেয়ে হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। খাওয়াদাওয়ার কোনো ঠিক ছিল না। তখন খাবারের জন্য খুব কষ্ট হয়েছে। কয়েকজন আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাসহ সবার খোঁজ নিই। কিন্তু কে কোথায় আছে, কেউ বলতে পারেনি। পাকিস্তানিরা হাওর এলাকায় স্পিডবোটে দিনের বেলা গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজত। তখন ইটনার দেওয়ান আব্দুর রহিম ছিল পাকিস্তানিদের পক্ষে। আমরা নিজের এলাকায় নৌকাযোগে ঘুরে আবার সুনামগঞ্জ ফিরে যাই। এরপর তিন মাস কেটেছে অনেক কষ্টে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিত। লুকিয়ে রাখত আমাদের।
ঠিকমতো খাওয়া জোটেনি কপালে। শুধু রাতের বেলা লাল আটার শুকনা রুটি গুড় দিয়ে বা পানিতে ভিজিয়ে খেতাম। কেউ যদি ভাত খাওয়াত, আমরা গিয়ে রাতে খেয়ে আসতাম। হামিদ ভাই বলেছিলেন সবখানে ঘুরে পরিস্থিতি জানানোর জন্য। আমরা কয়েকজন ইটনা ও মিঠামইনের কয়েকটা গ্রাম ঘুরে ফিরে যাই। সুনামগঞ্জ এলাকায় পানির মধ্যে দুই দিন দুই রাত কাটিয়েছি। সেখানে পাকিস্তানিরা মেঘের মতো গুলি ছুড়তে থাকে। আমাদের কাছে তো বেশি পরিমাণে শক্তিশালী অস্ত্র নেই। আমরা নীরব থেকেছি। মাঝেমধ্যে ফায়ার করেছি। এভাবেই যুদ্ধ চলতে থাকে। একপর্যায়ে ৫ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। হানাদার পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে বাঙালিদের কাছে।*
*বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন: তাসলিমা আক্তার মিতু