গারো পাহাড়ের জেলা শেরপুরে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। এ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি। তাদের প্রত্যাশা, নির্বাচনের পর তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান আর শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন সরকার ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি পাহাড়ি নারীদের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চান তারা। কারণ বারবার আশ্বাস পেলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো সরকার উদ্যোগ নেয়নি। তাই এবার নারী ভোটারদের প্রত্যাশাও বেশি।
জানা গেছে, ৫২টি ইউনিয়ন, ৪টি পৌরসভা নিয়ে শেরপুরের তিনটি সংসদীয় আসন। এর মধ্যে সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত শেরপুর-১, নকলা-নালিতাবাড়ী উপজেলা নিয়ে শেরপুর-২ ও শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী উপজেলা নিয়ে শেরপুর-৩ আসন গঠিত। তিনটি আসনেই পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, শেরপুরের তিনটি আসনে মোট ভোটার ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ৬ লাখ ৪৯ হাজার ১৫৬ জন। শেরপুর-১ আসনে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন, বিপরীতে নারী ভোটার আছেন ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৬৩ জন, শেরপুর-২ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৭৩৮ জন এবং শেরপুর-৩ আসনে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ১৬৭ জন, বিপরীতে নারী ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ২ হাজার ৮৫৫ জন।
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় যত ঘনিয়ে আসছে গারো পাহাড়ে তত বাড়ছে উচ্ছ্বাস। নারীদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। এবারের নির্বাচনে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া কথা জানাচ্ছেন তারা। নির্বাচনের পর জেলায় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেললাইন স্থাপিত হবে বলে মনে করেন তারা।
শহরের বাগরাকসা এলাকার বাসিন্দা রুবাইদা বলেন, ‘আমরা এমন প্রার্থী চাই যিনি মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। ছেলেমেয়ে উভয়ই সমান এ কথা কেবল মুখে বললে হবে না। আমরা দেখি উভয় বলতে শুধু ছেলেদেরকেই বোঝায়। কারণ মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। আমরা নিরাপত্তা চাই। এখন মেয়েরাও পিছিয়ে নেই, সব ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে মেয়েরাও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। তাই নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
পূর্বশেরী এলাকার বাসিন্দা মোছা. দোলা বলেন, ‘আমরা নারীর নেতৃত্ব চাই, কারণ আমাদের সমস্যা একমাত্র নারীরাই বুঝবে। ইতোমধ্যে অনেক পুরুষ ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য কোনো উন্নয়ন করেনি। তাই আমরা এবার শেরপুরে নারী নেতৃত্ব চাই।’
ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার বাসিন্দা ছালমা আক্তার বলেন, ‘বর্তমানে নারীরা অনেক অবহেলিত ও বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারীদের উন্নয়নে সুযোগ দেওয়া হোক। নির্বাচন-পরবর্তীতে নারীর নিরাপত্তার পাশাপাশি জেলার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হোক।’
একই উপজেলার ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা লাভলী বেগম বলেন, ‘দুই-তিনবার আমরা কোনো ভোট দিতে পারিনি। এবার আশা করছি, নিজের ইচ্ছায় নিজের ভোট দিতে পারব। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে আমাদের নিরাপত্তা চাই, যেন আমরা খুব সহজেই ভোট দিতে পারি। আমরা আমাদের পছন্দমতো যোগ্য ব্যক্তিকেই ভোট দেব, যারা আমাদের জেলার উন্নয়ন করবে, নারীদের নিরাপত্তা দেবে।’
শ্রীবরদী উপজেলার খ্রিস্টানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেমা মৃ বলেন, ‘আমাদের জীবনমান উন্নয়নে আগের সময়ের সরকারগুলো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অনেক লোক ছিল, কিন্তু আমাদের উন্নয়ন হয়নি। আমাদের অনেকেই আদিপেশা হিসেবে এখনো কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ি রাস্তা-ঘাটের তেমন উন্নয়ন হয়নি। আমরা কী ভোট দেই না? ভোট দিলেও আমাদের উন্নয়ন নেই, না দিলেও নেই। আমাদের এখানে অনেক সমস্যা আছে। যারা এগুলো দেখবে, তাদেরকেই ভোট দেব।’
নালিতাবাড়ী উপজেলার চারআলী এলাকার বাসিন্দা সাবিকুন বলেন, ‘দীর্ঘ সময়েও এখানকার নারীদের জন্য কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। আমাদের মেডিকেল কলেজ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় নেই, রেললাইন নেই, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন নেই। আগের সরকার কাজ করেছে, কিন্তু খুব বেশি না। আমাদের জেলায় শুধু নেই আর নেই। ভোটের সময় অনেকেই আশ্বাস দেয়। ভোট শেষ হলে তাদের কোনো খোঁজ থাকে না। এবার আমরা আর প্রতিশ্রুতি চাই না, বাস্তবায়ন চাই।’
একই উপজেলার বাসিন্দা হালিমা বেগম বলেন, আমরা চাই কোনো উপজাতি মা-বোনসহ আমাদের নিরাপত্তা ব্যাঘাত না ঘটুক। আমরা আমাদের নিরাপত্তা চাই। সেটা কর্মক্ষেত্রে কিংবা চলাফেরায়। আমরা সবাইকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে চাই।’
শেরপুর বিকশিত নারী নেত্রী নেটওয়ার্কের সদস্য অ্যাডভোকেট আশরাফুন্নাহার রুবী বলেন, ‘একটা দেশের উন্নয়নের জন্য শ্রমবাজারের উন্নয়ন দরকার। আপনারা দেখেন, সব জায়গায় কিন্তু নারীরা অনেকাংশে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হবে, ওই সংসদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে- নারী-পুরুষ উভয়ই যে কাজ করতে পারবে এমন কাজে নারীদের সক্ষম করে গড়ে তোলা। তাহলে আমাদের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।’