জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে বাতিল হওয়ার পর আসনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আদালতের এই চূড়ান্ত রায়ের পর বেসরকারিভাবে নির্বাচিত আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পথ এক প্রকার বন্ধ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসন নিয়েও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ফটিকছড়ি আসন থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সরোয়ার আলমগীর ঋণখেলাপি মামলার কারণে এখনো শপথ গ্রহণ করতে পারেননি। আগামী ৯ জুলাই তার মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
আদালতের রায় আসলাম চৌধুরীর বিপক্ষে গেছে। এখন রায়ের অপেক্ষায় আছেন সরোয়ার আলমগীর। আসলাম চৌধুরীর শপথ নেওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার পর সাধারণ ভোটার এবং কর্মী-সমর্থকদের মাঝেও দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা। আবার কেউ কেউ আশাবাদী।
আসলাম চৌধুরীর মামলার রায়ের পর জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী ব্যারিস্টার শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কমনসেন্সে বলে যিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত। এখন আদালত কী বলেন তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, এই আসনে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী যেহেতু আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনেই তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই মনোনয়ন বা প্রার্থিতাই চূড়ান্তভাবে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে এর মানে এই নয় যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীকে সরাসরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং বাংলাদেশের নির্বাচনি আইন অনুযায়ী কোনো আসনে বিজয়ী প্রার্থীর প্রার্থিতা যদি শুরু থেকেই অবৈধ বা অযোগ্য ঘোষিত হয়, তবে সাধারণত নির্বাচন কমিশন ওই আসনটিকে ‘শূন্য’ ঘোষণা করে নতুন তফসিল জারি করে উপনির্বাচনের আয়োজন করে। ভোটারদের ভোটাধিকার পুনঃপ্রয়োগের সুযোগ দেওয়াটাই এখানে গণতান্ত্রিক ও আইনি রেওয়াজ। প্রায় একই ধরনের একটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তা অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।
সে সময় ওই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বিজয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনের পর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ আদালতের শরণাপন্ন হন। ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনকে ২০০৪ সালের ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার পাঁচ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হন না।
উচ্চ আদালত এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জসিম উদ্দিনের প্রার্থিতাকে শুরু থেকেই ‘অবৈধ ও অযোগ্য’ হিসেবে রায় দেন। যে কারণে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান এবং ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিএনপির মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে সরাসরি বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। আইন অনুযায়ী আসনটি শূন্য করে ২০১০ সালের এপ্রিলে সেখানে উপনির্বাচন দেওয়া হয়। ওই আসনে তখন আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন বিজয়ী হন। সীতাকুণ্ড আসনেও উপনির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে বিএনপি শুরুতে তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তখন মনোনয়ন পান বিএনপির আরেক প্রভাবশালী নেতা কাজী সালাউদ্দিন। কিন্তু পরে আসলাম চৌধুরীর সমর্থক ও কর্মীদের বিক্ষোভ মিছিল, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধসহ রাজনৈতিক চাপের মুখে কাজী সালাউদ্দিনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। নতুন করে মনোনয়ন দেওয়া হয় আসলাম চৌধুরীকে। একদম শেষ মুহূর্তে আদালতের আদেশে শর্ত সাপেক্ষ বৈধতা নিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং সীতাকুণ্ডের মানুষ তার প্রতি আস্থা রেখে বিপুল ভোটে তাকে জয়ী করেন। কিন্তু ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত হতে না পারায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। এতে সীতাকুণ্ডের জনগণও হতাশ। একই সঙ্গে এটি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যও একটি বড় নৈতিক পরাজয়।
আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর গত মঙ্গলবার সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগারহাট এলাকায় আসলাম চৌধুরীর সমর্থকরা মহাসড়কের ধারের গাছ কেটে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা এবং দেশের প্রধান লাইফলাইন খ্যাত মহাসড়কে তীব্র যান চলাচল বিঘ্নিত করার ঘটনা জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এ ঘটনায় অবশ্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ মামলা করেছে। দুজন আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে। তাতে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, আদালতের রায়ের প্রতি দলের হাইকমান্ডের সম্মান রয়েছে।
পরে অবশ্য আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন আসলাম চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের গাছ কেটে বিক্ষোভকারীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে বোঝা যায় আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীন। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর তিনি করণীয় নির্ধারণ করবেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনও বলেছে পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রীয় আইনে ঋণখেলাপি নির্বাচন করতে পারবেন না। তবুও আসলাম চৌধুরী আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালতের রায় মেনে নিতে হবে। যারা তার পক্ষে জনদুর্ভোগ তৈরির কাজ করেছেন তার দায় তাকেই নিতে হবে। যারা কষ্ট পেয়েছেন তারা সবাই তার মতোই নাগরিক। এটা ঠিক যে, অনেক সময় সাধারণ মানুষ বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু একজন ঋণখেলাপির মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এই ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ কখনোই প্রতিবাদ করবেন না। যারা কাজটি করেছেন তারা তার অনুসারী। বাস্তবতা হলো এটা অপরাধ। ঋণখেলাপি সংসদে কেন যাবেন। তিনি আগে তার ঋণ পরিশোধ করুন। এই রায় ঋণখেলাপিদের হতাশ করবে। দৃষ্টান্তমূলক এই রায়ের জন্য তিনি আদালতকে সাধুবাদ জানান।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম-৪ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন। সেই আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী আপিল করেন। তার অভিযোগ ছিল, ঋণখেলাপি হওয়ায় আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না। পরে ১৫ জুন রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয় এবং মঙ্গলবার আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে তার প্রার্থিতা বাতিল করেন।