পরাধীনতার দেয়াল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করা ইসলামের মৌলিক চেতনা। শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। ইসলাম কখনো পরাধীনতাকে প্রশ্রয় দেয়নি। মানুষকে স্বাধীন রাখতে চায় ইসলাম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাধীনতার শিকল ভেঙে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলাদেশিরা। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে এদিন অভ্যুদয় ঘটে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বিশ্ব মানচিত্রে খচিত হয় বাংলাদেশের নাম। এদিন গর্ব ও গৌরবের দিন। আনন্দ ও সুখের দিন। এদিন নিয়ে দেশের কয়েকজন খতিবের ভাবনা এবং তাদের কাজকর্ম তুলে ধরা হলো—
‘মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে মসজিদও এতিমখানা করা হোক’
—মুফতি ইয়াহইয়া মাহমুদ
খতিব, বাইতুল মারুফ জামে মসজিদ, রামপুরা
১৬ ডিসেম্বর এক অবিস্মরণীয় দিন। এদিনে পাক হানাদার জালেম বাহিনীর বিরুদ্ধে মজলুম বাংলাদেশিদের সম্মিলিত প্রয়াসে বিজয় অর্জিত হয়। এদিন আমার অন্তরে অন্যরকম একটা আনন্দের অনুভূতি বয়ে যায়। এ বিজয় আমাদের গর্বের। কিন্তু আল্লাহ যে বিজয়ের কথা বলছেন, সে বিজয় যদি আমরা না পাই—আমাদের সবকিছুই বৃথা। ক্ষণিকের এ বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতে মুক্তি বা চিরকালীন বিজয় নিয়েও ভাবতে হবে।
যারা দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং শহীদ হয়েছেন—বিজয় দিবসে তাদের স্মরণে দোয়া করা, ইসালে সওয়াব করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এই দিবসকে কেন্দ্র করে গুনাহের আয়োজন দেখলে বড় কষ্ট লাগে।
যারা এই দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন, সরকার যদি তাদের স্মরণে বিশাল মসজিদ নির্মাণ করত এবং সে মসজিদে হাজারও মানুষ নামাজ পড়ত, এর সওয়াব তাদের রুহে পৌঁছত। বা এদের নামে যদি বড় এতিমখানা করত; তাহলে এতিমদের লালন-পালনের সওয়াব আল্লাহ তাদের রুহে পৌঁছাতেন। আমার মন চায়, আমার মন কাঁদে—তাদের জন্য ইসালে সওয়াবের কাজ করতে। এমনটা করা সম্ভব হলে আমার মনটা আনন্দিত হতো। কিন্তু আমার তো ক্ষমতা নেই।
‘ঈমানের পর অন্যতম বড় নেয়ামত হলো স্বাধীনতা’
—মাযহারুল ইসলাম
খতিব, আম্বরশাহ শাহী জামে মসজিদ, কারওয়ান বাজার
ঈমানের পর অন্যতম বড় নেয়ামত হলো, স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বসবাস করা। স্বাধীনতার জন্য বিজয় লাভ করা নেয়ামত। বিজয় দিবস বা কোনো দেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে বিজয়োল্লাস করা ইসলাম সমর্থন করে।
বিজয় দিবসে গরিব-অসহায়ের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করার পাশপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যারা বিজয় অর্জন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন বা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন—তাদের জন্য মসজিদে মসজিদে দোয়া করা। শুধু বিজয় উৎসবকেন্দ্রিক দোয়া নয়; সব সময় দোয়া করা। তাদের ত্যাগেই আমরা স্বাধীনতা ভোগ করছি।
এ ছাড়া খতিবদের জন্য অবশ্য করণীয় হলো—বিজয় দিবসের তাৎপর্য, এর গুরুত্ব, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের আলোচনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশপ্রেমে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে বিজয় পালন করেছেন, তা-সহ আনন্দ-উৎসবের ইসলামের বিধান নিয়ে আলোচনা করা। ইসলামে আনন্দ উদযাপন করা বৈধ, তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন শরিয়তের সীমা লঙ্ঘিত না হয়। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) এত বেশি খুশি হয়েছিলেন, তিনি খুশিতে অনেককে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকনির্দেশনা মেনে ইসলামি বিধান মোতাবেক বিজয় উদযাপন করা।
‘স্বাধীনতা মানুষের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়’
—মুফতি মিনহাজ উদ্দিন
ইমাম ও খতিব, চকবাজার শাহী মসজিদ
মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ এবং জানবাজ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আমার বিশ্বাস, এ নির্ভীক ত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রজন্মের বিবেকের বাতিঘরে আলোর দিশারী হবে। মহান এ মুক্তির সংগ্রাম ও অর্জিত বিজয় বিশ্বব্যাপী আগত-অনাগত সমস্ত জালিমের বিরুদ্ধে হকপন্থি নিপীড়িতদের পক্ষে একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতার সংগ্রামে শাহাদাতবরণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। তবে একজন দায়িত্বশীল মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত—কবরের জগতে মহান আল্লাহ যেন তাদের শান্তির ব্যবস্থা করে দেন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, সে জন্য ইসালে সওয়াব, কোরআনের তেলাওয়াত ও দোয়া-মাগফেরাত করা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর নয় এমন সমস্ত কর্মকাণ্ড বর্জন করা।
বিজয়ের এই দিনে আমরা শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়ার ব্যবস্থা করে থাকি। মাদ্রাসার বাচ্চাদের নিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনার, বক্তৃতার আয়োজন করি। আমরা মানুষের মধ্যে সত্যিকারের দেশপ্রেম জাগ্রত করা ও দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরির লক্ষ্যে জুমার বয়ানে কথা বলি।
‘দেশপ্রেম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উত্তম আদর্শ’
—মুফতি ওসমান গণি সালেহী
খতিব, টাউন হল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের বিজয়ের দিন। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো, তার ভূখণ্ড ও মাতৃভূমিকে সম্মান করা এবং ভালোবাসা। এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উত্তম আদর্শ। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মাতৃভূমি পবিত্র মক্কা ছেড়ে হিজরত করে মদিনায় পাড়ি জমাচ্ছিলেন, তখন তার চোখে অশ্রুর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল।
যারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, স্বাধীনতা, মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন; বিজয় দিবসে তাদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা উচিত। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা অভাবগ্রস্ত আছেন, তাদের সহযোগিতা করা উচিত। আমি জুমার দিনে মসজিদে দেশপ্রেম নিয়ে আলোচনা করি এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলি। শুধু আমি নই; দেশের লক্ষাধিক মসজিদের মিম্বার থেকে উচ্চারিত হয় বিজয়ের ধ্বনি।
কোরআনে বিজয় দিবসের বেশ কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সেগুলোর ওপর আমল করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর আট রাকাত নামাজ পড়েছিলেন, শত্রুদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করেছিলেন, আমরাও যখন পৃথিবীতে কোনো বিজয় লাভ করব, আমরাও এমনটি করব। আমরা প্রতিশোধ নেব না। ইউসুফ (আ.) ভাইদের প্রতি প্রতিশোধ নেননি, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। নবিজিও মক্কা বিজয়ের পর প্রতিশোধ নেননি, ক্ষমা করে দিয়েছেন।
‘মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের শান্তি সমৃদ্ধির দোয়া করা উচিত’
—মুফতি সফিউল্লাহ আদম
খতিব, আন নুরানী জামে মসজিদ এরশাদনগর, টঙ্গী
১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ বিজয় অর্জিত হয়। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ লাভ করি। আমরা মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করি, মানবজীবনে সব অর্জন আল্লাহতায়ালা কর্তৃক প্রদত্ত। যেকোনো সফলতা শুধু তাঁরই দয়া-অনুগ্রহের দ্বারা লাভ হয়। তেমনই পরাধীনতার শিকল ভেঙে জালেমকে পরাজিত করা ও বিজয় লাভ করা—নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। তাই এই বিজয় যেন আমাদের আরও বেশি আল্লাহমুখী করে; তাঁর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনে সহায়ক হয়। পাশাপাশি বিজয়ের সঠিক চেতনা ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণসাধনে আত্মনিয়োগ করা। মনে রাখতে হবে, শুধু আনুষ্ঠানিকতানির্ভর বিজয় দিবস পালনের মাধ্যমে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনো অর্জিত হবে না। সামগ্রিক সুশাসন ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনা আমাদের বিজয়কে প্রকৃত অর্থে সার্থক করে তুলবে।
যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই বিজয়, তাদের জন্য এবং দেশের শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য এদিন দোয়া করি। জুমার মিম্বারে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ব্যক্তিগতভাবে সুযোগ হলে ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শোনাই। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদান এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ বিষয়ে আলোকপাত করি।
‘তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি’
—মুফতি মুহাম্মাদ হেদায়েতুল্লাহ
খতিব, মধ্য পাইকপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মিরপুর-১
দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির অকৃত্রিম ভালোবাসা ইসলামসম্মত বিশেষ সহজাত গুণ। যা আমরা শিখেছি আদর্শিক মহামানব রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে। একজন ঈমানদার তখনই প্রকৃত মুমিন হতে পারেন, যখন তিনি তার দেশকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসতে পারবেন।
একজন খতিব হিসেবে বিজয়ের মাসে আমি বিজয়ের শোকস্মৃতি ও রক্তক্ষয়ী দুঃখ-ব্যথাসংবলিত স্বাধীনতাকামী মহান মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনকথা মুসল্লিদের বয়স অনুপাতে তাদের সঙ্গে শেয়ার করি। কিশোরদের সঙ্গে কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প, যুবকদের সঙ্গে যুবক মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবীণদের সঙ্গে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথাগুলো শেয়ার করি।
মক্কা বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ রাসুলুল্লাহ (সা.) আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই সূত্র ধরে মহান এই মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, বিজয় যারা ছিনিয়ে এনেছেন, তাদের আত্মার মাগফেরাতের জন্য আমরা আট রাকাত নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করি, দোয়ার আয়োজন করে থাকি। মহান বিজয় ছিনিয়ে আনতে মুক্তিযুদ্ধে যারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, যারা সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, শহীদ পরিবারের প্রতি সান্ত্বনা প্রদর্শন—প্রয়োজনে তাদের আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য মুসল্লিদের উদ্বুদ্ধ করে থাকি। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করি।