রমজান শুধু আত্মসংযমের মাস নয়; এটি তাকওয়া অর্জনের মৌসুম। এই মাস শিশুদের মন-মানস গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ। যেমন কৃষক উর্বর মাটিতে বীজ বপন করে ফসলের আশায়, তেমনি শিশুর কোমল হৃদয়ে ইমানের আলো ছড়িয়ে দিতে রমজানের চেয়ে উত্তম সময় আর কী হতে পারে? আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুকাল থেকেই দ্বীনের শিক্ষা দিতেন এবং ধাপে ধাপে তাদের ইমানি জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করতেন। সাহাবিরাও শিশুদের রমজানের আদব-কায়দা শেখাতেন এবং রোজার অভ্যাস করাতেন। তাই আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের এই পবিত্র মাসের প্রকৃত শিক্ষা দেই, যাতে তারা বড় হয়ে সত্যিকারের মুত্তাকি হয়ে গড়ে ওঠে। নিম্নে রমজানের জন্য কীভাবে শিশুদের গড়ে তুলবেন সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা উপস্থাপন করা হলো—
শিশুদের রমজানের প্রস্তুতি
রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য আমাদের সন্তানদের সঙ্গে কিছু সুন্দর উদ্যোগ নেওয়া যায়। এর কিছু অংশ হলো আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে এই পবিত্র মাসের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেওয়া, আর কিছু হলো শিশুদের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করা এবং তাদের অন্তরে রমজানের মহিমা ও গুরুত্ব গেঁথে দেওয়া। এভাবে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর ইবাদতের প্রতি গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করা সম্ভব।
রমজানের সাজসজ্জা
রমজানের প্রস্তুতির অন্যতম আনন্দময় উপায় হলো ঘর সাজানো ও আলোকসজ্জা করা। এতে শিশুদের মনে এক অনন্য আনন্দের সঞ্চার হয় এবং তারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে রমজানকে স্বাগত জানায়। সেই সঙ্গে এটি তাদের মনে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়াও ঝলমলে আলোকমালা বা ঐতিহ্যবাহী রমজানের ফানুস ঝুলিয়ে রাখা যায়। এতে তারা রমজানের আনন্দে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এসব সাজসজ্জায় যেন অপচয় বা অতিরিক্ত ব্যয়ের আশ্রয় না নেওয়া হয়। কেননা ইসলাম অপচয়কে নিরুৎসাহিত করেছে। (কিতাবুল ফতওয়া, পৃষ্ঠা: ২৭৮)। আল্লাহতায়ালা বলেন—‘তোমরা আহার করো ও পান করো; কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। (সুরা আল আরাফ, আয়াত: ৩১)
ইবাদতের তালিকা তৈরি করা
রমজানের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো—শিশুদের সঙ্গে মিলে ইবাদতের একটি তালিকা তৈরি করা। এই তালিকায় সেসব নেক আমল ও সৎকর্ম অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা আমরা রমজানজুড়ে পালন করতে চাই এবং যার ধারাবাহিকতা রমজানের পরও বজায় রাখতে চাই। তালিকা প্রস্তুতের সময় শিশুদের কাছে প্রতিটি ইবাদতের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা। যাতে তারা বুঝতে পারে এগুলোর মর্যাদা ও সওয়াব এবং আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান কত বড়। এই তালিকায় রাখা যেতে পারে— প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াত করা বা মুখস্থ করা, নিয়মিত তারাবিহ পড়া, বিভিন্ন মসজিদে নামাজ আদায়ের পরিকল্পনা করা। এ ছাড়াও দোয়া ও জিকিরের একটি নির্দিষ্ট তালিকা বানানো যেতে পারে, যাতে সাহরি ও ইফতারের দোয়া, নামাজপরবর্তী দোয়া ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। (আল কাওয়ায়িদুল হিসান ফি আসরারিত তাআতি ওয়াল ইস্তিদাদি লি রমজান, পৃষ্ঠা: ৩০)
আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা
রমজানের অন্যতম শিক্ষা হলো— পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা। তাই শিশুদের সঙ্গে নিয়ে দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-ফুফু, মামা-খালাদের বাড়িতে যাওয়া যেতে পারে। এতে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে এবং শিশুরাও ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখবে।
সাহরি ও ইফতার
শিশুদের জন্য আরেকটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হতে পারে—রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও সামগ্রী কেনাকাটায় অংশ নেওয়া। এতে তারা রমজানের বিশেষ আয়োজন সম্পর্কে সচেতন হবে এবং এই মাসের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি একটি সুযোগ যে, তাদের শেখানো যাবে সাহরির ফজিলত ও বরকত, যার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সাহরি খাও, কেননা সাহরির মধ্যে বরকত রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯২৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৯৫)
এ ছাড়া, শিশুদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কুফল সম্পর্কে এবং তাদের শেখানো যেতে পারে রোজার মাহাত্ম্য ও বিশেষ পুরস্কারের কথা, যেমন জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজা, যা শুধু রোজাদারদের জন্য সংরক্ষিত। (ইয়াসআলুনাকা আন রমাজান,পৃষ্ঠা: ২৭৮)। হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে আটটি দরজা। তার মধ্যে একটি দরজার নাম হবে রাইয়ান। রোজাদার ছাড়া অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩২৫৭)। আল্লাহতায়ালা আমাদের শিশুদের এই পবিত্র মাসের তাৎপর্য বোঝানোর পাশাপাশি তাদের মনে রমজানের মূল সৌন্দর্য উপলব্ধি করানোর তাওফিক দান করুন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক