অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের ছাত্রজনতা যেভাবে জীবন দিয়েছিলেন, তাতে আমরা বুঝি যে, পৃথিবীতে বাঙালি জাতিই প্রথম, যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রছাত্রী, সাধারণ জনতা যে রক্ত দিয়েছিলেন, এটি রাতারাতি ঘটেনি। এটার জন্য আমাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব সূচিত হয়।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ আমাদের জাতির পিতা সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রনেতা, আইন অনুষদের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার আন্দোলন করে কারাগারে গেলেন। যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, সেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস পরে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে গেলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু কারাগারে যাওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছরের অধিক সময় তিনি কারাগারেই কাটালেন। কেন তিনি কারাগারে কাটালেন? তার দাবি ছিল বাঙালির মাতৃভাষাকে মুক্ত করা এবং বাঙালির মাতৃভূমিকে মুক্তি করা। সেই মুক্তির সংগ্রামে তিনি এগিয়ে গেলেন দীর্ঘ ২৪ বছর। তার মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই তিনি কারাগারে কাটালেন। এতেই বোঝা যায়, পাকিস্তানের শাসকরা বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুকেই বারবার অত্যাচার করেছেন। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির প্রধান মিত্র এই ব্যক্তিটি। বাঙালির যেহেতু প্রধান মিত্র তিনি, তাহলে সে অবশ্যই পাকিস্তানের প্রধান শত্রু। তারা তা ভালোমতোই বুঝতে পেরেছিল।
আমারা দেখেছি যে, পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক আমলের শেষের দিকে এসে ’৬০-এর দশকে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে তথাকথিত একটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রায় পৌনে তিন বছর কারাগারে অবস্থান করেন। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি গ্রহণ করেন। সেই উপাধি গ্রহণকালে তিনি বলেছিলেন, আমাকে পৌনে তিন বছর কারাগারে রাখা হলো মিথ্যা অভিযোগ এনে। আমাকে যে ষড়যন্ত্র করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে তা হলো ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলে আমরা যা বলি, সেটাও কিন্তু ভুল। বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছেন, সেটা ছিল ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছেছে। আজকের দিনে সেই ২১শে ফেব্রুয়ারির তাপর্য কী? ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে আরও বেশি তাৎপর্য ও অনুসন্ধান করার প্রয়োজন আছে। আমরা জানি যে, আমাদের ২১শে ফেব্রুয়ারি আজকের সারা পৃথিবীর ২১শে ফেব্রুয়ারি। ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে প্রতি বছর আমরা সারা বিশ্বে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করি। পৃথিবীতে প্রায় ৫ লক্ষাধিক বছর আগে যে ভাষার উদ্ভব ঘটে, সেই ভাষার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বহু ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। পৃথিবীতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার ভাষা রয়েছে। কিন্তু সেই ভাষার মৃত্যু হারও অনেক বেশি। প্রতি ১৫ দিনে একটি ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যে ভাষায় মানুষ বেশি কথা বলে ও বেশি ব্যবহার করে, সেই ভাষা সজীব থাকে। অনেক ক্ষুদ্র বা নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা চর্চার অভাবে বা মাতৃভাষা হিসেবে পড়াশোনা করার সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ভাষার লিখিত রূপ পর্যন্ত নেই। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি সারা পৃথিবীর ভাষার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা দেওয়ার মূল তাৎপর্য হচ্ছে আমরা পৃথিবীবাসী যেন প্রতিটি ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে সেই ভাষাকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। ভাষার সঙ্গে জাতি, দেশ এবং পৃথিবীর একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই বাংলা ভাষাকে আমরা যে গর্ব করি তার মূল কারণ বাংলা ভাষায় আজকের সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা জড়িত রয়েছে।
সরকারের সব প্রজ্ঞাপন ও নথিপত্র বাংলায় লিখিত হয়। আমাদের দেশের সরকারপ্রধান তারা যখন বিদেশে যান, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। সেভাবেই বাংলা ভাষা এখনো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি বছরই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যখন ভাষণ দেন তখন বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। এভাবে ভাষণ দেওয়ার রীতিটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করে গেছেন ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। যখন তিনি জাতিসংঘের সদস্যপদ গ্রহণ করে বাংলায় ভাষণ দিয়ে জাতিসংঘ ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন।
পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা একই ধারা অনুসরণ করে প্রতি বছর বাংলায় ভাষণ দিয়ে আমাদের বাংলা ভাষাকে গৌরবান্বিত করছেন। আমরা সাধারণ মানুষ এ কারণেই গর্ব বোধ করি।
আজকে যদি বঙ্গবন্ধুর সেই ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের কথা চিন্তা করি, যখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, একমাত্র উর্দু।’ তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন ছাত্রনেতা। তিনি সেই সময় গর্জে উঠেছিলেন। পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ যেখানে বাংলা ভাষায় কথা বলে, সেখানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত বাংলা। কিন্তু বাঙালিরা খুবই সংবেদনশীল জাতি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের অংশে তারা যেকোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে পারে, তাতে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা।
গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তিনি কতটা অযৌক্তিক কথা বললেন যে, পাকিস্তানের জনসংখ্যার একেবারে নগণ্য সংখ্যক মানুষ উর্দু ভাষায় কথা বলে, সেই উর্দু ভাষাকেই তিনি রাষ্ট্রভাষা করতে চাচ্ছেন। অথচ বাঙলা ভাষাভাষী মানুষ প্রায় দেশের ৫৬ শতাংশ বাংলা ভাষায় কথা বলে। সেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কোনো মর্যদাই দেওয়া হচ্ছে না পাকিস্তানের অদ্ভুত কাঠামোর মাঝে। কিন্তু বাঙালির নেতা হিসেবে তরুণ একজন ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু বলেছেন যে, আমরা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে দেখতে চাই। তিনি কতটা যৌক্তিকভাবে কথাগুলো বলেছেন। এভাবে যৌক্তিকভাবে বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলন করে গেছেন বলেই আজকে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাস করি। এই স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি তা কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই সূত্রপাত ঘটেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বা শহিদ দিবস এবং পর্যায়ক্রমে আমরা বিভিন্নভাবে এগিয়ে এসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন। এভাবে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। দীর্ঘ এক রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বরে আমরা মহান স্বাধীনতা অর্জন করলাম।
পুরো প্রেক্ষাপটের পেছনে প্রতিটি পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের সেই অনুভূতি আমরা লক্ষ্য করি। একবিংশ শতাব্দীতে এই সময়ে এসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনেক বেড়ে গেছে। কারণ ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রাম করে বাঙালি তরুণরা জীবন দিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির বাস্তবতায় বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের তরুণ সমাজকে বাংলা ভাষার সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে সারা বিশ্ব এক জায়গায় চলে এসেছে। এক বিশ্বপল্লিতে আমরা রূপান্তরিত হয়েছি। বিশ্বপল্লিতে বসবাসের জন্য আমরা যেমন অন্য ভাষা শিখব, আমাদের ভাষাকেও বিশ্বপল্লির যোগাযোগের ভাষা হিসেবে উত্থাপন করব।
আমাদের নতুন প্রজন্মের তথ্যপ্রযুক্তিবিদ যারা আছেন, তারা এই কম্পিউটার প্রযুক্তি ও মোবাইলে বাংলা ভাষাকে যুক্ত করতে পারেন। বাংলা ভাষা সারা বিশ্বে বিচরণ করুক- সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়